জি৭ সম্মেলনের মঞ্চেও ট্রাম্প-ম্যাক্রোঁর সঙ্গে মধ্যমণি নরেন্দ্র মোদী!

ফ্রান্সে আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও কূটনৈতিক সাফল্যের এক অভূতপূর্ব ছবি সামনে এসেছে। শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক ছবি তথা 'ফ্যামিলি ফোটো’ তোলার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আন্তর্জাতিক কূটনীতির আঙিনায় এই ছবিটিকে শুধুমাত্র একটি প্রথাগত সৌজন্যমূলক মুহূর্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে নয়াদিল্লির জোরালো প্রভাবেরই এক জোরালো বহিঃপ্রকাশ এটি।

ফ্রান্সের সবুজ পর্বতঘেরা প্রাকৃতিক শহর ইভিয়ানে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তিগুলির এক জোট হতে দেখা গেছে। আমন্ত্রিত সহযোগী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি এবং গ্রুপ ছবিতে আয়োজক দেশ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঠিক মাঝখানে প্রথম সারিতে অবস্থান নেওয়া বিশেষভাবে নজর কেড়েছে কূটনৈতিক বিশ্বের। বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির আদানপ্রদান, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিশ্বব্যাপী সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের মতো বিষয়গুলিতে ভারতের মতামত এখন কতটা জরুরি, এই ছবি তারই স্পষ্ট বার্তা দেয়।

PM Modi with world leaders at G7 summit

জি-৭ সম্মেলনে এই বিশেষ মুহূর্তের আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নিজে এগিয়ে এসে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে মূল সম্মেলন প্রাঙ্গণে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। ভারত ও ফ্রান্সের এই সময়োপযোগী কৌশলগত অংশীদারিত্বকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য মর্যাদা অর্পণ করে ম্যাক্রোঁ তাঁর ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হ্যান্ডেলে মোদীকে স্বাগত জানানোর দৃশ্য সংবলিত একটি বিশেষ ভিডিও ক্লিপ জনসমক্ষে শেয়ার করেন। এই ভিডিও বার্তার মাধ্যমে নতুন দিল্লি ও প্যারিসের মধ্যকার চিরন্তন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রগাঢ় গভীরতা ও বহুমাত্রিক যৌথ বোঝাপড়া আবারও বিশ্ববাসীর সামনে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে উন্মোচিত হলো।

এই শীর্ষ সম্মেলনের অন্যতম মূল আকর্ষণ ছিল দীর্ঘ প্রায় ১৬ মাস পর প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম মুখোমুখি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। কেবল ছবি তোলার পর্বেই নয়, সম্মেলনের মূল আলোচনা চলাকালীনও দুই বিশ্বনেতা একে অপরের পাশাপাশি আসন গ্রহণ করেন এবং আন্তর্জাতিক নানা সংকটের সমাধান নিয়ে গভীর আলোচনায় নিমগ্ন থাকেন। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ওয়াশিংটন ও নতুন দিল্লির একযোগে কাজ করার ইচ্ছা এই আলোচনায় স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

দুই নেতার এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মূলত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা খাতের পারস্পরিক সহযোগিতা, উদীয়মান ও অত্যন্ত সুরক্ষামূলক ক্রিপ্টোগ্রাফিক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো জটিল প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়ে বিশদে কথা হয়। বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খল তথা সাপ্লাই চেইনকে আরও বেশি স্থিতিস্থাপক করে তোলার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত যে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে চাইছে, নেতৃদ্বয়ের আলোচনায় তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রাধান্য পায়। বিশ্ব কূটনীতির অঙ্গনে এই আলোচনা ভারত-মার্কিন মৈত্রীর এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

আসলে, এটি ছিল আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি দেশ হিসেবে জি-৭ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রেকর্ড টানা সপ্তমবারের মতো অংশগ্রহণ। কোনও অ-সদস্য রাষ্ট্রের প্রধানের পক্ষে আন্তর্জাতিক এই শক্তিশালী ফোরামে এতবার ডাক পাওয়া বর্তমান সময়ে একটি বিরল ঐতিহাসিক নজির। আন্তর্জাতিক মহলে একে ভারতের বিশাল অর্থনৈতিক ঊর্ধ্বগতি, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক নানা সংকটজনক পরিস্থিতিতে একটি নিরপেক্ষ অথচ জোরালো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের অনন্য সক্ষমতার সরাসরি মর্যাদাপূর্ণ ফসল হিসেবেই মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

বিগত বছরগুলির মতো এই বছরও নরেন্দ্র মোদী জি-৭-এর এই গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চকে বিশ্বের পিছিয়ে পড়া তথা উন্নয়নশীল দেশগুলির নানাবিধ দাবি ও আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলির অর্থায়ন বৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী কার্যকর ডিজিটাল শাসন কাঠামো গড়ে তোলা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বিশ্বজুড়ে সমতাভিত্তিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সকলের সহযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। বহুপাক্ষিক নীতিনির্ধারণী পর্ষদে আরও বেশি প্রতিনিধিত্বের জোরালো দাবি জানিয়েছেন তিনি।

জি-৭-এর অত্যন্ত ব্যস্ত ও পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির মাঝেই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাইডলাইন বৈঠকের অংশ হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সমবেত বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রের প্রধানদের সঙ্গে ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসেন। তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রভাবশালী শাসক ও সম্মানীয় রাষ্ট্রপতি শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সাথে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে নিবিড় মতবিনিময় করেন। এই পৃথক আলোচনাগুলির মূল লক্ষ্য ছিল পারস্পরিক অর্থনৈতিক প্রগতি, তথ্যপ্রযুক্তির আদানপ্রদান, বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি খাতের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটানো।

সম্মেলনের চূড়ান্ত দিনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ কর্তৃক আয়োজিত একটি রাজকীয় গালা ডিনারে যোগ দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানে ঘরোয়া আবহে বিশ্বনেতাদের সাথে মতবিনিময়ে আন্তর্জাতিক স্তরে অংশীদারিত্বের সুরক্ষাকে পুনরায় ঝালিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। সব মিলিয়ে, এভিয়ানের এই জি-৭ সম্মেলন শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতির কারণে ভারতের বিশ্বনেতৃত্বের এক নতুন এবং সাহসী ভাবমূর্তি বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করেনি, বরং জলবায়ু ও ডিজিটাল ভবিষ্যতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণেও ভারতের অপরিহার্যতাকে চূড়ান্ত সিলমোহর দিল।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+