২০২৬ বিশ্বকাপেও মেসি ম্যাজিক! আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিকে গড়লেন নতুন রেকর্ড
বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসি বিশ্বকাপের মঞ্চে আরও একবার নতুন ইতিহাস রচনা করলেন। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নেমেই একাধিক অনন্য রেকর্ড নিজের নামে করে নিলেন এই কিংবদন্তি। কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে শুধু মাঠে নামাই নয়, প্রথমার্ধে করা এক দর্শনীয় গোল করে নীল-সাদা গ্যালারিকে উৎসবে মাতালেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
এই বছরের বিশ্বকাপটি মেসির জন্য যেমন আবেগের, তেমনই রেকর্ড বইয়ের পাতা নতুন করে লেখারও একটি মাধ্যম। আলজেরিয়ার বিপক্ষে করা এই গোলের সুবাদে তিনি হয়ে উঠলেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর্জেন্টিনার প্রবীণতম গোলদাতা। অত্যন্ত মজার বিষয় হল, আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বকাপের ইতিহাসে কনিষ্ঠতম খেলোয়াড় হিসেবে গোল করার অনন্য নজিরটিও কিন্তু লিওনেল মেসির দখলেই রয়েছে।

ম্যাচের শুরুর দিকে মেসির একটি চোখধাঁধানো গোল অফসাইডের কারণে বাতিল করে দেন রেফারি। তবে এই সিদ্ধান্ত মেসির মনোবলে ফাটল ধরাতে পারেনি। ম্যাচের প্রথমার্ধেই আলজেরিয়ার রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের বোকা বানিয়ে পেনাল্টি বক্সের একেবারে বাইরে থেকে একটি বাঁকানো শটে বল জালে জড়ান তিনি। আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদানের পক্ষে সেই চোখের পলকে নেওয়া বুলেট গতির শট প্রতিহত করা অসম্ভব ছিল।
আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে এই ম্যাচে প্রথম একাদশে সুযোগ পেয়েই প্রথম পুরুষ ফুটবলার হিসেবে কেরিয়ারে মোট ছয়টি বিশ্বকাপ খেলার অবিশ্বাস্য এক রেকর্ডের মালিক হলেন লিওনেল মেসি। ঠিক দুই দশক আগে, অর্থাৎ ২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে মাত্র ১৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রেখেছিলেন তিনি। তারপর থেকে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে তিনি তাঁর আধিপত্য বজায় রেখেছেন।
ছয়টি বিশ্বকাপ খেলার গৌরব অর্জনের পাশাপাশি আলজেরিয়া ম্যাচটি ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ২০০তম ম্যাচ। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় পুরুষ ফুটবলার হিসেবে আন্তর্জাতিক স্তরে ২০০টি ম্যাচ খেলার কীর্তি গড়লেন তিনি। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এবং কুয়েতের বিখ্যাত স্ট্রাইকার বদর আল-মুতাওয়া। ২০০তম ম্যাচে গোল করে মেসি তাঁর এই অর্জনকে আরও স্মরণীয় করে রাখলেন।
কাতারে ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ঐতিহাসিক চ্যাম্পিযন করার পর মেসি ঘোষণা করেছিলেন যে মধ্যপ্রাচ্যের সেই টুর্নামেন্টটিই হতে চলেছে দেশের হয়ে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। তবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীদের বড় উপহার দিয়ে তিনি সেই অবসরের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন। এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বেও তিনি অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স করেন এবং দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসন নিজের দখলে রাখেন।
আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে করা গোলটির মধ্য দিয়ে লিওনেল মেসি বড় টুর্নামেন্টে নিজের ১৪তম বিশ্বকাপ গোলটি পূর্ণ করলেন। এর ফলে তিনি ফ্রান্সের তরুণ তারকা কিলিয়ান এমবাপের সমসংখ্যক বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ডে ভাগ বসালেন। উল্লেখ্য, এই বিশ্বকাপের আগেই এমবাপে গোল সংখ্যায় মেসিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু মেসি তাঁর চিরপরিচিত ক্ষিপ্রতায় আবারও কিলিয়ান এমবাপের সমকক্ষ হলেন।
ডিবক্সের দূর থেকে নেওয়া শটে গোলের নিরিখেও ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের পর ব্রাজিলের কিংবদন্তি রিভেলিনোর রেকর্ডে ভাগ বসালেন আটবারের ব্যালন ডি'অর জয়ী তারকা। বিশ্বকাপে দূরপাল্লার শট থেকে এটি ছিল লিওনেল মেসির পঞ্চম গোল। ২০০৬ সালের ১৭ জুন সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে মেসির বিশ্বকাপে অভিষেক হয়েছিল, আর ঠিক ২০ বছর পর ২০২৬ সালের ১৭ জুনেই এই নজির গড়লেন তিনি।
আগামী সপ্তাহে ৩৯ বছরে পা দিতে যাওয়া এই কিংবদন্তি খেলোয়াড় যেভাবে আলজেরিয়ার পুরো রক্ষণভাগকে চাপের মুখে রাখলেন, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। দীর্ঘ ২০ বছরের ফুটবল কেরিয়ারে লিওনেল মেসির ফিটনেস এবং ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা যে একটুও কমেনি, বরং বয়সের সাথে সাথে তা আরও ধারালো হয়েছে, এই ম্যাচটি ছিল তারই উজ্জ্বল প্রমাণ।
যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলার সময় হঠাৎ একটি হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে পড়েছিলেন লিওনেল মেসি। এই চোটের কারণে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্স এবং ফিটনেস নিয়ে ভক্তদের মনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সকল সংশয় তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আলজেরিয়ার বিপক্ষে অত্যন্ত সতেজ এবং উজ্জ্বলভাবে মাঠে ফেরেন এই বাঁ-পায়ের জাদুকর।
চলতি ২০২৬ ফুটবল মরসুমে মার্কিন ক্লাব ইন্টার মায়ামির হয়ে অসাধারণ ফর্মে ছিলেন লিওনেল মেসি। মেজর লিগ সকারে মাত্র ১৬টি ম্যাচ খেলে ১৩টি গোল ও বেশ কয়েকটি অ্যাসিস্ট নিজের ঝুলিতে পুরেছিলেন তিনি। দেশের হয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলতে নামার আগে তাঁর এই দুর্দান্ত ক্লাব ফর্ম আর্জেন্টিনা শিবিরের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা আলজেরিয়া ম্যাচে প্রমাণিত হয়েছে।
বার্সেলোনার প্রাক্তন এই ফুটবলার কিছুদিন আগেই নিজের খেলা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একটি বিশেষ মন্তব্য করেছিলেন। সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, আমি ফুটবল খেলাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি এবং যতদিন আমার শরীর সায় দেবে, আমি এই সবুজ মাঠের যুদ্ধ চালিয়ে যাব। আলজেরিয়ার বিপক্ষে তাঁর শারীরিক ভাষা এবং খেলার প্রতিটি মুহূর্ত প্রমাণ করে যে তাঁর মনের ভেতর ফুটবলের সেই আদিম খিদে এখনও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
কানসাসের অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারে হাজারে নীল-সাদা জার্সি পরা সমর্থকেরা মেসির গোল দেখে বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠেন। আমেরিকার মাটিতে চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়নের মুকুট ধরে রাখার লড়াইয়ে নামা আর্জেন্টিনার প্রধান চালিকাশক্তি যে এখনও লিওনেল মেসিই, তা এই একটি ম্যাচেই পরিষ্কার হয়ে গেল।












Click it and Unblock the Notifications