বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের পাশে বসেই মোদীর তীক্ষ্ণ বার্তা, বর্তমান বিশ্বের আসল সঙ্কট আসলে কী?
জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের অধিবেশনে বিশ্বমঞ্চে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে বসে তিনি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে সাফ জানালেন, বর্তমান সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট সম্পদের ঘাটতি নয়। আসল সংকট হল বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বিশ্বাসের গভীর ফাটল দূর করাই এখন আন্তর্জাতিক দুনিয়ার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ফ্রান্সের ইভিয়ানে আয়োজিত এই বিশেষ অধিবেশনের মূল আলোচনার বিষয় ছিল "নতুন অংশীদারিত্ব গঠন এবং আন্তর্জাতিক সংহতি পুনর্গঠন"। প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর বক্তৃতায় বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির টানাপোড়েন এবং সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থের সংঘাতকে অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে কাঠগড়ায় তোলেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ব্যাখ্যা করেন যে, কীভাবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংকীর্ণ স্বার্থ বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে প্রতিনিয়ত ব্যাহত করছে।

বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে বলেন, "আজকের দিনে বিশ্বজুড়ে সম্পদের কোনো ঘাটতি নেই, আসল অভাব হল পারস্পরিক বিশ্বাসের। আর ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বের সামগ্রিক সফলতা এই বিশ্বাস নতুন করে গড়ে তোলার ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছে।" তাঁর এই বার্তা কেবল সাধারণ কোনো বক্তব্য নয়, বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব কূটনৈতিক কাঠামোর একটি বড় নীতিগত দিকনির্দেশ।
বর্তমান বিশ্ব এমন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র কোনো না কোনোভাবে একে অপরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। খাদ্য নিরাপত্তা, তীব্র জ্বালানি সংকট থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন এবং উদীয়মান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো স্পর্শকাতর প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কোনো একক দেশের পক্ষে সমাধান সূত্র খুঁজে বের করা অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রী মোদী এই বাস্তবতাকে তুলে ধরে বলেন, পারস্পরিক আন্তরিক বিশ্বাস ছাড়া এই জটিল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলির কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বিশেষ করে প্রযুক্তি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অভূতপূর্ব রূপান্তর ঘটছে, তা অনেক সময় সুস্থ প্রতিযোগিতার সীমা ছাড়িয়ে তীব্র দ্বন্দ্বে রূপ নিচ্ছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে তুলছে বিভাজন। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, প্রযুক্তিকে যেন নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার না করে মানবজাতির সামগ্রিক কল্যাণে নিয়োজিত করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে বসে মোদীর এই তীক্ষ্ণ বার্তা দেওয়ার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একপাক্ষিক বাণিজ্যিক নীতি এবং বিভিন্ন দেশের অতিমাত্রায় সংরক্ষণবাদী সুরক্ষামূলক পদক্ষেপের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে এক ধরনের অনাস্থা এবং অনিশ্চয়তা দানা বেঁধেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের মনে করিয়ে দিলেন যে, পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া এককভাবে কারোর দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব।
ইভিয়ানের জি-৭ সম্মেলনের এই আউটরিচ অধিবেশনটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বিশ্বজুড়ে একাধিক নজিরবিহীন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহ বিদ্যমান। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বলন্ত পরিস্থিতি, অন্যদিকে পূর্ব ইউরোপের সংকটপূর্ণ যুদ্ধাবস্থা—সব মিলিয়ে বিশ্বমঞ্চ স্পষ্টতই বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই চরম মেরুকরণের আবহে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক সংহতি পুনর্গঠনের জোরালো ডাক দিয়ে ভারত পুনরায় বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় নিজের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীল ভূমিকাটি সকলের সামনে তুলে ধরল।
নয়া দিল্লি বিগত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে 'বসুধৈব কুটুম্বকম' বা 'গোটা বিশ্বই এক পরম পরিবার'—এই মহান ভারতীয় আদর্শকে সগৌরবে তুলে ধরছে। প্রধানমন্ত্রীর জি-৭-এর বক্তৃতায় সেই উদার এবং ভারসাম্যপূর্ণ ভারতীয় দর্শনেরই প্রতিফলন লক্ষ্য করা গেছে। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের যৌথ মোকাবিলা এবং দরিদ্র দেশগুলির জন্য সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি শক্তির সহজ লভ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশ্বনেতাদের আন্তরিক প্রচেষ্টার ওপর সবিশেষ জোর দিয়েছেন।
বিশ্বের একটি বড় অংশের সাধারণ মানুষকে আজ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মতো মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াতে হচ্ছে। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ গোলার্ধের উন্নয়নশীল দেশগুলি এর প্রধান শিকার। প্রধানমন্ত্রী মোদী জি-৭ নেতাদের অত্যন্ত আন্তরিকভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, যদি বিশ্বের একটি বড় অংশ মৌলিক মানবিক চাহিদার সংকটে দিন কাটায়, তবে উন্নত বিশ্বও দীর্ঘ মেয়াদে পুরোপুরি নিরাপদ ও সুস্থিত থাকতে পারবে না।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তৃতায় বর্তমানের ঝিমিয়ে পড়া বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যকারিতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘ বা জি-৭-এর মতো শক্তিশালী ঐতিহ্যবাহী আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলি যদি পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে না পারে, তবে তাদের প্রতি বিশ্বের সাধারণ মানুষের আস্থা দিন দিন আরও হ্রাস পাবে। আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব মজবুত করার মূল শর্তই হলো এই সংস্থাগুলির বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার।
বর্তমান বিশ্বে ভূ-অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদী পরোক্ষে মনে করিয়ে দেন যে, এই বিনিয়োগ যেন কোনো দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব কাড়তে না পারে এবং ঋণগ্রস্ত দেশকে অসম ঋণের ফাঁদে না ফেলে। আন্তর্জাতিক স্তরে একটি অত্যন্ত স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল এবং প্রগতিশীল সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার ব্যাপারে ভারত শুরু থেকেই বৈশ্বিক মঞ্চগুলিতে জোরালো সওয়াল করে আসছে।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এই গভীর বার্তা আগামী দিনের বহুপাক্ষিক কূটনীতির গতিপথ পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। ক্ষমতার প্রতিযোগিতা বা একতরফা আধিপত্য নয়, পারস্পরিক নিখাদ আস্থা ও সমঝোতার ভিত্তিতেই নতুন প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব। তীব্র বৈশ্বিক সংকটের এই ক্রান্তিলগ্নে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বিশ্বাসের ডাক নিঃসন্দেহে বিশ্ব রাজনীতির জন্য এক অত্যন্ত সময়োপযোগী পথপ্রদর্শক।












Click it and Unblock the Notifications