ওয়েনাড়ে ফের ভয়াবহ বিপর্যয়! ভয়াবহ ধসে মাটির নিচে চাপা পড়লেন শ্রমিকেরা, ফের ঘটল বড় বিপদ

কেরলের পাহাড়ি জেলা ওয়েনাড়ে আবার এক বড়সড় বিপর্যয় নেমে এল। জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ টানেল বা সুড়ঙ্গ নির্মাণ প্রকল্পের ঠিক কাছেই ঘটে যাওয়া এই আকস্মিক ধসের ঘটনায় অন্তত সাতজন মাটির নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে তীব্র আশঙ্কা করা হচ্ছে। মেঘভাঙা বৃষ্টির মতো অনবরত বর্ষণের মাঝে ঘটে যাওয়া এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ইতিমধ্যেই অন্তত ছয়জন শ্রমিক গুরুতর জখম হয়েছেন।

স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, মীনাক্ষী ব্রিজের কাছাকাছি এলাকায় যখন আনাক্কামপোয়িল-কাল্লাডি-মেপ্পাডি টুইন টানেল নির্মাণের কাজ চলছিল, ঠিক তখনই পাহাড়ের বিশাল এক অংশ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। এই সুড়ঙ্গ প্রকল্পটির কাজ সম্পূর্ণ হলে কেরলের মালাপ্পুরম এবং ওয়েনাড জেলার দূরত্ব অনেকটাই কমে যাবে বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই এই ভয়াবহ বিপর্যয় পরিকাঠামো নির্মাণ পদ্ধতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল।

Emergency rescue teams operating at Wayanad tunnel landslide site

সাম্প্রতিক এই ধসের ধাক্কা স্বভাবতই স্থানীয় মানুষকে ২০২৪ সালের সেই অভিশপ্ত বর্ষার দিনগুলির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। সে বছরই ওয়েনাড়ের মুণ্ডাক্কাই এবং চুরুলমালায় ঘটে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ভূমিধসের জেরে তিনশোর বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। এবারের ধসটি যে মীনাক্ষী ব্রিজ এলাকায় ঘটেছে, তা সেই দুর্গত মুণ্ডাক্কাইয়ের ঠিক কাছেই অবস্থিত হওয়ায় নতুন করে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ভয় গ্রাস করছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

উন্নয়ন বনাম পরিবেশ: উসকে উঠল বিতর্ক

কেরলের এই পরিবেশগত সংবেদনশীল অঞ্চলে বিশাল সুড়ঙ্গ প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে পরিবেশবিদরা প্রথম থেকেই সন্দিহান ছিলেন। এই মারাত্মক ধসের ঘটনার পর কেরলের এক মন্ত্রী এটিকে শুধুমাত্র একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলতে রাজী হননি। তাঁর স্পষ্ট দাবি, এটি আসলে একটি 'মানুষের তৈরি বিপর্যয়' বা ম্যান-মেড ডিজাস্টার, যা পাহাড়ি এলাকায় অতিরিক্ত খনন ও অবৈজ্ঞানিক উন্নয়নমূলক কাজের ফলেই আজ দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মতো অতি সংবেদনশীল পার্বত্য এলাকায় যখন ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার মতো কাজ করা হয়, তখন পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ শিলাস্তর দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের দেওয়া পূর্বের একাধিক সতর্কবাণীকে পুরোপুরি তোয়াক্কা না করেই এই সুড়ঙ্গ পথ তৈরির কাজ জোরকদমে চালানো হচ্ছিল। অতিবৃষ্টির জল যখন সেই আলগা ফেটে যাওয়া স্তরে প্রবেশ করে, তখনই তা বিপর্যয়ের রূপ ধারণ করে।

পশ্চিমঘাট অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র এতটাই ভঙ্গুর যে সামান্যতম মানবিক হস্তক্ষেপ বা অবৈজ্ঞানিক কাজকর্ম এখানে বিশাল প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কেরল সরকার অবশ্য পর্যটন ও আন্তঃজেলা যোগাযোগের প্রসারে এই দ্বৈত সুড়ঙ্গ নির্মাণের কাজকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানের এই রোমহর্ষক ধসের পর কেরলের পরিবেশপ্রেমীরা এই টানেল প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের ছাড়পত্র নিয়ে নতুন করে তদন্তের দাবি তুলেছেন।

পাহাড়ি ঢাল কেটে সুড়ঙ্গ পথের মতো জটিল পরিকাঠামো গড়ে তোলার জেরে স্থানীয় জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয় বলে ভূবিজ্ঞানীদের অভিমত। ভূগর্ভস্থ অনেক পার্বত্য ঝর্ণার গতিপথ বদলে যাওয়ায় মাটির নিচে এক অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি হয়, যা প্রচণ্ড বৃষ্টির জলে আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ওয়েনাড়ের এই অতি ধসপ্রবণ এলাকায় ভারী বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্তই এই সংকটে ঘি ঢেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের হাত ধরেই প্রথম শুরু উদ্ধারকাজ

ধস নামার পর অত্যন্ত প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও স্থানীয় সাধারণ মানুষ সবার আগে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় ওই এলাকায় বেশ কিছু পর্যটকদের থাকার হোমস্টে গড়ে উঠেছে। ফলে দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা কোনো সরকারি সাহায্যের অপেক্ষা না করে নিজেরা মাটি ও পাথরের বড় চাঙড় সরিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের রক্ষা করতে তৎপর হন।

পাহাড়ি ঢাল বেয়ে অনবরত কাদা ও পাথর গড়িয়ে আসার কারণে প্রথম দিকে সাধারণ মানুষের উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছিল। তবে স্থানীয় যুবকদের তৎপরতাতেই বেশ কয়েকজন চাপা পড়া শ্রমিককে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ঘটনাটি ঘটার সাথে সাথেই কালপেট্টা থেকে ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিসের প্রশিক্ষিত জওয়ানরা প্রয়োজনীয় আধুনিক উদ্ধার সামগ্রী ও অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে অকুস্থলে এসে পৌঁছন।

ঘটনাস্থলে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বিভাগ দ্রুত জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর (NDRF) একাধিক দলকে এই বিপজ্জনক পার্বত্য পরিমণ্ডলে মোতায়েন করেছে। এনডিআরএফ জওয়ানরা কাদা ও পাথরের নিচে আটকে থাকা আনুমানিক সাতজন শ্রমিকের অবস্থান জানার চেষ্টা করছেন। ভারী বৃষ্টির কারণে উদ্ধারকাজ চালাতে বেগ পেতে হলেও উদ্ধারকারীরা অনবরত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

অতিবৃষ্টি এবং আগামী কয়েকদিনের সতর্কতা

কেরল আবহাওয়া দফতরের সাম্প্রতিক বুলেটিনে ওয়েনাড় জেলা সহ আশেপাশের পার্বত্য অঞ্চলগুলিতে আরও কয়েকদিন অত্যন্ত ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে মাটি অতিরিক্ত জল শোষণ করায় তা অত্যন্ত ভারী ও নরম হয়ে রয়েছে। ফলে নতুন করে ধসের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে, যা উদ্ধারকারী ও স্থানীয় বাসিন্দা উভয়ের জন্যই বড় উদ্বেগের বিষয়।

ওয়েনাড়ের জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যেই পাহাড়ের বিপজ্জনক ঢালে বসবাসকারী সাধারণ পরিবারগুলিকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরিত করতে শুরু করেছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা কবলিত সুড়ঙ্গ প্রকল্পের সমস্ত নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে পুরোপুরি স্থগিত রাখার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এই দুর্যোগের দিকে লক্ষ্য রেখে প্রশাসন চারপাশের পাহাড়ি পিচ রাস্তায় সমস্ত ধরণের ভারী যান চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে।

ভৌগোলিক অতি-সংবেদনশীলতাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে এবং পাহাড়ের ধারণক্ষমতা বিচার না করে পরিকাঠামোগত আগ্রাসন চালানোর কুফল কেরালা বারবার প্রত্যক্ষ করছে। প্রকৃতির এই ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর দাবি প্রশাসনকে আগামী দিনে এই ধরনের অতি-উচ্চাভিলাষী প্রকল্পগুলির পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করবে। বর্তমানে আটকে থাকা প্রতিটা মানুষের প্রাণ বাঁচানোই উদ্ধারকারী দলের একমাত্র লক্ষ্য।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+