প্রযুক্তি বিশ্বে ভারতের বড় চমক! এআই হার্ডওয়্যার তৈরিতে আদানি-জাবিলের পার্টনারশিপে আরও এগোবে দেশ
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির জয়জয়কারের মধ্যে ভারতের প্রযুক্তি ক্ষেত্রের জন্য এক বড় খবর সামনে এসেছে। দেশের মাটিতে অভিনব এআই হার্ডওয়্যার এবং ডেটা সেন্টার পরিকাঠামো তৈরির লক্ষ্যে বৈশ্বিক উৎপাদনকারী সংস্থা জাবিল ইনকরপোরেটেডের (Jabil Inc.) সঙ্গে কৌশলগত জোট বাঁধার ঘোষণা করেছে আদানি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড (AEL)। মূলত দেশের ভিতরে গিগাস্কেল ডেটা সেন্টার ও হার্ডওয়্যার উৎপাদনের ভিত মজবুত করতেই এই বিশালাকার যৌথ উদ্যোগ।
আদানি এন্টারপ্রাইজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই সংহতি বা 'ভার্টিক্যালি ইন্টিগ্রেটেড’ এআই হার্ডওয়্যার প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার মূল লক্ষ্য ভারতকে বিশ্বমানের এআই হার্ডওয়্যার উৎপাদন এবং দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানির কেন্দ্রবিন্দু করে তোলা। সাম্প্রতিক সময়ে এআই প্রযুক্তির ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই বড় মাপের চুক্তিটি আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের প্রযুক্তিগত প্রভাবকে অনেকখানি বাড়িয়ে দেবে।

এই প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা হবে নেক্সট-জেনারেশন বা পরবর্তী প্রজন্মের সব অত্যাধুনিক প্রযুক্তিপণ্য। ডেটা পরিচালন ব্যবস্থা সহজ করার লক্ষ্য নিয়ে এখানে তরল-শীতল বা লিকুইড-কুলড এআই র্যাক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন সার্ভার এবং জটিল নেটওয়ার্কিং গিয়ার তৈরি করা হবে। এই উন্নত পণ্যগুলি মূলত বিশ্বের তাবড় হাইপারস্কেলার এবং এন্টারপ্রাইজ ডেটা সেন্টারগুলোর ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকা চরম চাহিদা মেটাতে কাজ করবে।
তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী, আগামী মাত্র সাত বছরের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এআই সংক্রান্ত সামগ্রিক পরিকাঠামো খাতের বাজার মূল্য রেকর্ড তিন ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আদানি ও জাবিলের এই পরিকল্পনা সরাসরি সেই মহাজাগতিক বাণিজ্যিক ক্ষেত্রকেই টার্গেট করছে। দেশীয় ও বৈশ্বিক বাজারের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত থার্মাল ম্যানেজমেন্ট বা তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকেই এখানে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
শুধুমাত্র কম্পিউটিং ইউনিট নয়, এই প্ল্যাটফর্মের আওতায় তৈরি হবে একাধিক প্রয়োজনীয় উপাদান। এর মধ্যে থাকবে অত্যন্ত ক্ষমতার পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন ইউনিট (PDU), কুল্যান্ট ডিস্ট্রিবিউশন ইউনিট (CDU), ট্রান্সফরমার, সুইচগিয়ারস এবং বাসবার্স। ফলে কোনো বহিরাগত প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়াই বৃহৎ আকারের ডেটা সেন্টার পুরোপুরি সচল করার মতো শতভাগ এন্ড-টু-এন্ড হার্ডওয়্যার সমাধান দেওয়া সম্ভব হবে ভারতের মাটি থেকেই।
এই বিশালাকার পদক্ষেপ আদানি গ্রুপের সেই ১০০ বিলিয়ন ডলারের মহৎ বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির সাথে সরাসরি যুক্ত। আদানি গ্রুপ ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতে ৫ গিগাওয়াট সম্পন্ন, সম্পূর্ণরূপে সবুজ বিদ্যুৎ চালিত এবং এআই সুবিধার হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার পরিকাঠামো তৈরি করার লক্ষ্য সামনে রেখেই এগোচ্ছে। জাবিল এর সাথে এই নতুন জোট এই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পথে সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট হতে চলেছে।
মার্কিন প্রতিষ্ঠান জাবিল ইনক ইতিমধ্যেই বিশ্বমানের পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট এবং ডেটাসেন্টারের থার্মাল সলিউশন প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করে বিশ্ববাজারে তাদের অবস্থান খুব শক্ত করেছে। ২০২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি প্রায় ২৯.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বার্ষিক রেভিনিউ অর্জন করেছে। ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও প্রকৌশল ক্ষেত্রে জাবিলের দীর্ঘ ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অর্জিত কারিগরি দক্ষতা স্বাভাবিকভাবেই এই নতুন উদ্যোগকে বড় গতি সরবরাহ করবে।
আদানি গ্রুপের কর্ণধার গৌতম আদানি এই যুগান্তকারী চুক্তির লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ স্পষ্ট করে বলেছেন, পৃথিবী ইন্টেলিজেন্স রেভোলিউশন-এর মধ্যে প্রবেশ করছে। এমতাবস্থায় যে সমস্ত দেশ নিজেদের বিদ্যুৎ বা জ্বালানি শক্তির সাথে আধুনিক কম্পিউটিং পরিকাঠামোর গতিশীল মেলবন্ধন ঘটাতে পারবে, তারাই বিশ্বজুড়ে আগামীদিনের বড় পরিবর্তনগুলোর চালিকাশক্তি হবে। এই মেলবন্ধন ভারতের প্রযুক্তি অর্থনীতিকে অবিশ্বাস্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
তাঁর মতে, এই দুর্দান্ত ও সুচিন্তিত জোট কেবল প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারকারী হিসেবে ভারতকে সীমাবদ্ধ রাখবে না। বরং ভারতকে বিশ্বমঞ্চে বিশ্বমানের এআই প্রযুক্তি অবকাঠামো নির্মাণকারী এবং প্রথম সারির রপ্তানিকারকদের আসনে মর্যাদার সাথে বসাবে। এই পুরো কর্মযজ্ঞ সম্পূর্ণভাবে ভারতের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা প্রদর্শন করবে এবং এশিয়ার সামগ্রিক সরবরাহ লাইনে এক সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
সহমত পোষণ করেছেন জাবিলের সিইও মাইক দস্তুরও। তিনি তাঁর বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ভারতের সুনিপুণ এবং দক্ষ যুবসমাজ এই ধরণের উচ্চ প্রযুক্তির বিনিয়োগের জন্য বেশ আদর্শ ও সম্ভাবনাময়। আদানির সুবিশাল ডেটা সেন্টার বেসের সাথে জাবিলের ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা জুড়লে তা বিশ্বব্যাপী অতুলনীয় সমাধান সরবরাহ করতে পারবে। একইসাথে এই প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অন্যতম সেরা স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেবে।
আসলে এই কৌশলগত উদ্যোগ ভারত সরকারের 'মেক ইন ইন্ডিয়া' মূল মন্ত্রকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে দারুণ সহায়ক হবে। দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করার ফলে বাইরে থেকে প্রযুক্তি আমদানির খরচ অনেক কমবে, যা ভারতের দীর্ঘকালীন স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করবে। এর হাত ধরেই দেশে শক্তিশালী ডিজিটাল সরবরাহ ব্যবস্থার বিকাশ ঘটবে এবং স্থানীয় স্তরে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে অসংখ্য প্রযুক্তি কর্মীদের বিপুল নতুন সুযোগ মিলবে।
বর্তমানে ভারতে এআই ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের প্রসারের দরুন ডেটা স্থানীয়করণের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেড়েছে। বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতীয় বাজারে ডেটা সেন্টারের ক্ষমতা ৫ গিগাওয়াট থেকে বেড়ে ৮ গিগাওয়াট ছোঁবে। গ্লোবাল জায়ান্ট কোম্পানিগুলি ভারতে ডেটা স্টোরেজ গড়ে তোলার তাগিদ অনুভব করছে আর ঠিক এই মুহূর্তেই আদানি ও জাবিল ভারতের এই উদীয়মান সম্ভাবনাকে নিজেদের অনুকূলে আনতে চলেছে।
বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে ভারত ক্রমশ সেমিকন্ডাক্টর ও গ্লোবাল সাপ্লাই চেনের বিশ্বস্ত অংশীদার হয়ে উঠছে। আদানি ও জাবিলের এই ঐতিহাসিক কৌশলগত হাত মেলানো ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তি সার্বভৌমত্ব ও বিশ্ব জয় করার লক্ষ্য অর্জনের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে গণ্য হবে। এই যৌথ প্রয়াস কেবল ব্যবসায়িক সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি দরবারে ভারতের যোগ্যতাকে কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দেবে।












Click it and Unblock the Notifications