রূপকথা লিখল আয়ারল্যান্ড, বেলফাস্টে সিরিজ হোয়াইটওয়াশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারত
টি-২০ ফর্ম্যাটের বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারতীয় ক্রিকেট দলকে হোয়াইটওয়াশ করে ক্রিকেট ইতিহাসে এক নতুন রূপকথার জন্ম দিল আয়ারল্যান্ড। বেলফাস্টে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে এক শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে টিম ইন্ডিয়াকে মাত্র ১ রানে হারিয়ে দিল আইরিশরা। প্রথম ম্যাচে ৩৪ রানের হতাশাজনক হারের পর ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে মাঠে নেমেছিল ভারতীয় দল। কিন্তু এদিনের ম্যাচের শেষ ওভারের তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে জয় ছিনিয়ে নিল সেই আয়ারল্যান্ডই। এর ফলে দীর্ঘ তিন বছর পর টি-২০ ক্রিকেটে কোনও দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হারল ভারত।
২০২৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হারের পর এই প্রথম ভারতীয় দল এই ফরম্যাটে পরাজিত হল। গত তিন বছরে টানা ১১টি দ্বিপাক্ষিক টি-২০ সিরিজে ভারতের অপরাজেয় থাকার যে অবিশ্বাস্য রেকর্ড ছিল, তা বেলফাস্টে মুখ থুবড়ে পড়ল। দলের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর এবং নতুন অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ারের জুটির জন্য এটি অত্যন্ত বড় ধাক্কা। আয়ারল্যান্ডের কাছে এমন অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর আগামী সপ্তাহে শুরু হতে চলা ইংল্যান্ড সফর টিম ইন্ডিয়ার জন্য বেশ কঠিন হবে।

ভারতীয় ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা এই সিরিজেও অত্যন্ত বাজেভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দুই ওপেনার সঞ্জু স্যামসন ও অভিষেক শর্মার অফ-ফর্ম ভারতের পরাজয়ের অন্যতম কারণ। গত ম্যাচের মতো এই ম্যাচেও প্রথম বলেই শূন্য বা গোল্ডেন ডাক করে প্যাভিলিয়নে ফেরেন সঞ্জু স্যামসন। প্রথম ওভারেই তাঁকে ক্লিন বোল্ড করে ধাক্কা দেন আয়ারল্যান্ডের পেসার জয় মুন্দ্রা। স্যামসনের আউটের পর ভারতের শুরুটাই পুরোপুরি ভেস্তে যায়।
অভিষেক শর্মাও রানের খাতা খোলার আগেই সেই একই বোলার জয় মুন্দ্রার বলে সাজঘরে ফিরে যান। এরপর ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপকে ম্যাচে ফেরানোর দায়িত্ব ছিল যার কাঁধে, সেই অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ারও মুন্দ্রার সুইংয়ে ধরা পড়েন। প্রথম সারির তিন উইকেট তুলে নিয়ে ভারতকে শুরুতেই ম্যাচ থেকে ছিটকে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করেন মুন্দ্রা। ম্যাচ ও সিরিজ বাঁচানোর ভারতীয় আশা ধুলোয় মিশিয়ে মুন্দ্রাই ম্যান অফ দ্য ম্যাচ এবং সিরিজ সেরার পুরস্কার পেয়েছেন।
টানা দুই ম্যাচে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের দল নির্বাচন নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়েছে ক্রিকেট মহলে। আইপিএলে সাড়া জাগানো ১৫ বছর বয়সী তরুণ প্রতিভা বৈভব সূর্যবংশীকে এই ম্যাচেও রিজার্ভ বেঞ্চে বসিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত সবাইকে অবাক করেছে। টপ অর্ডার যখন রানের জন্য ধুঁকছে, তখন এই তরুণ ব্যাটারকে সুযোগ কেন দেওয়া হল না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সূর্যবংশীর পরিবর্তে অলরাউন্ডার সূর্যাংশ শেডগে এবং ফাস্ট বোলার প্রিন্স যাদবকে অভিষেক করায় ভারত।
এর আগে বেলফাস্টের মেঘলা ও বৃষ্টিবিঘ্নিত আবহাওয়ায় টসে জিতে আয়ারল্যান্ডকে ব্যাট করতে পাঠিয়েছিল ভারত। শুরুতে ভারতীয় বোলাররা বেশ নিয়ন্ত্রিত সুইং বোলিং ডমিনেশন দেখিয়েছিলেন। মাত্র ২১ রান তুলতেই প্রথম সারির ২ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে শুরু করেছিল আইরিশরা। তবে উইকেটে থিতু হয়ে ম্যাচ ঘোরানোর কাজ ধরেন হ্যারি টেক্টর এবং বেন ক্যালিৎজ। ভারতের অভিজ্ঞ বোলারদের আক্রমণ সামলিয়ে তাঁরা অসাধারণ এক পার্টনারশিপ গড়ে তোলেন।
তৃতীয় উইকেটে ব্যাট করতে নেমে হ্যারি টেক্টর মাত্র ৪৪ বলে অনবদ্য ৫৩ রানের মূল্যবান ইনিংস খেলেন। অন্যদিকে অন্য প্রান্ত থেকে তাঁকে চমৎকারভাবে সঙ্গ দেন বেন ক্যালিৎজ, যিনি খেলেন ৩৭ রানের এক দায়িত্বশীল ইনিংস। টেক্টর ও ক্যালিৎজের এই লড়াকু জুটিতে মাত্র ৪৪ বল খেলে আসে মূল্যবান ৬৫ রান। ১৫ ওভারের মাথায় আয়ারল্যান্ডের রান ছিল ৪ উইকেটে ১১৩, যা তাদের একটি নিরাপদ স্কোরের দিকে নিয়ে যায়।
ভারতীয় বোলাররা শেষ ওভারগুলিতে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও আয়ারল্যান্ডকে দেড়শো রানের গণ্ডি পার করা থেকে আটকাতে পারেনি। বৃষ্টি বিঘ্নিত এই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৫৪ রানের এক লড়াকু ইনিংস দাঁড় করায় আয়ারল্যান্ড। বেলফাস্টের মন্থর পিচ এবং মেঘলা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ভারতীয় ব্যাটারদের জন্য এই পুঁজি রক্ষা করা আইরিশ বোলারদের জন্য এক দারুণ সুযোগ এনে দিয়েছিল।
১৫৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ে ভারত। শেষ দুই ওভারে ভারতের জয়ের জন্য প্রয়োজন দাঁড়িয়েছিল প্রায় অসম্ভব মনে হতে থাকা ৩৪ রান, হাতে ছিল মাত্র ২টি উইকেট। এই কঠিন মুহূর্তে রুখে দাঁড়ান হর্ষিত রানা। ১৯তম ওভারে একটি বাউন্ডারি এবং পরের বলেই বিশাল একটি ছক্কা মেরে ম্যাচের দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে দিয়ে ভারতের জয়ের প্রবল আশা জাগিয়ে তোলেন তিনি।
শেষ ওভারে জয়ের জন্য ভারতের প্রয়োজন ছিল ১৪ রান। হর্ষিত প্রথম কয়েকটি বলের মধ্যে আরেকটি চার মেরে ব্যবধান কমিয়ে আনেন মাত্র ২ বলে ৮ রানে। ঠিক তখনই অতি আগ্রাসী শট খেলতে গিয়ে শেষ ওভারের পঞ্চম বলে প্যাভিলিয়নে ফেরেন হর্ষিত। শেষ বলে জয়ের জন্য ৮ রান দরকার ছিল এবং ক্রিজে ছিলেন অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামা পেসার প্রিন্স যাদব। প্রিন্স শেষ বলে একটি দর্শনীয় ছক্কা মারলেও ম্যাচ বাঁচানোর জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।
এই রোমাঞ্চকর জয়ের মাধ্যমে আয়ারল্যান্ড তাদের দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এক নতুন গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টি করল। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারতকে ২-০ ব্যবধানে পরাজিত করা আয়ারল্যান্ড দলের খেলোয়াড়দের কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের ফলেই সম্ভব হয়েছে। এই পরাজয় ভারতীয় দলের সামনে অনেক প্রশ্ন রেখে গেল। বিশেষ করে টপ অর্ডারের এই ব্যর্থতা এবং দল নির্বাচন নিয়ে আগামী দিনে কোচ গৌতম গম্ভীর ও থিঙ্ক ট্যাঙ্ককে নতুন পরিকল্পনা করতে হবে।












Click it and Unblock the Notifications