শেয়ার বাজারে বড় ধস, অ্যাকসেঞ্চারের সিদ্ধান্তের জেরে কাঁপছে ইনফোসিস-টিসিএস সহ গোটা আইটি সেক্টর!

ভারতীয় শেয়ার বাজারে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) সেক্টরের শেয়ারগুলিতে আচমকাই বড়সড় বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক আইটি জায়ান্ট কোম্পানি অ্যাকসেঞ্চার তাদের বার্ষিক রাজস্ব বৃদ্ধির ঊর্ধ্বসীমা হ্রাস করার পর থেকেই ঘরোয়া বাজারে এই তীব্র ধস শুরু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় বিদেশি বাজারগুলিতে নতুন করে মন্দা ও আইটি পরিষেবা ক্রয়ের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

শুক্রবার বাজার খোলার পরপরই ঘরোয়া বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়। যার জেরে নিফটি আইটি সূচক ৫ শতাংশের বেশি নিচে নেমে যায়। এর ফলে আইটি খাতটি সপ্তাহের অন্যতম খারাপ পারফর্ম করা সেক্টরে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ঘরোয়া বাজারে যে স্থিতিশীলতার ভাব তৈরি হয়েছিল, বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারের এই ধাক্কাটি তাকে এক লহমায় তছনছ করে দিয়েছে।

Indian IT stocks crashing following Accenture revenue forecast cuts

বাজারের এই আকস্মিক পতনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আইটি জায়ান্ট ইনফোসিস। এদিন লেনদেনের শুরুতেই ইনফোসিসের শেয়ারের দর প্রায় ৮ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়ে ১,০৩৬.৭০ টাকায় নেমে আসে। একই সাথে টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস) ও এইচসিএল টেকনোলজিসের দরও আশঙ্কাজনকভাবে নামতে শুরু করায় পুরো শেয়ার বাজারে আতঙ্কের আবহ তৈরি হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে আইটি পরিষেবার সামগ্রিক গতিপ্রকৃতির মূল দিশারী ধরা হয় অ্যাকসেঞ্চারকে। সম্প্রতি সংস্থাটি তাদের বার্ষিক রাজস্বের বৃদ্ধির হার ১ থেকে ৩ শতাংশ সংশোধন করে পূর্বাভাসের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলেই বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি সংস্থায় বিনিয়োগকারীদের মনে আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সমৃদ্ধ বাজারে ক্লায়েন্টদের অপ্রয়োজনীয় বার্ষিক বাজেট সংকোচনই এই সামগ্রিক অস্থিরতার প্রধান উৎস।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভারতীয় আইটি সংস্থাগুলির সিংহভাগ বার্ষিক রাজস্ব অর্জিত হয় আমেরিকা ও ইউরোপের বাজার থেকে। ফলে আমেরিকার বাজারে যেকোনো ক্ষুদ্র প্রযুক্তিগত সংকোচন সরাসরি এদেশীয় কোম্পানিগুলির বৈদেশিক আয়ে কোপ বসায়। গতকাল মার্কিন শেয়ার বাজারে ভারতীয় আইটি সংস্থাগুলির আমেরিকান ডিপোজিটরি রিসিট বা এডিআর-এ যে ব্যাপক বিপর্যয় ঘটেছিল, তারই মারাত্মক প্রতিফলন ঘটল ভারতীয় বাজারেও।

আইটি ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিকগুলিতে বড় বড় ডিল বা কাজ হস্তগত হলেও বাস্তব মূলধনে তা রূপান্তরিত করার গতি অত্যন্ত মন্থর। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শ্লথতা এবং সুদের হারের জটিলতার কারণে বিভিন্ন বহুজাতিক ক্লায়েন্ট তাদের প্রযুক্তিগত রূপায়নের পরিকল্পনা কিছুটা ধীর গতিতে চালাচ্ছেন। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির সুফল এখনও ভারতীয় কোম্পানিগুলির লাভজনক বইয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতে পারেনি।

আইটি খাতের এই ধস কেবল লার্জ-ক্যাপ কোম্পানিগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মাঝারি সারির বা মিড-ক্যাপ আইটি কোম্পানিগুলির ওপরও এটি চাবুকের মতো প্রভাব ফেলেছে। ইনফোসিস এবং উইপ্রো তাদের সাম্প্রতিক রেকর্ড ভেঙে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন সীমায় নেমে গিয়েছে। একইভাবে দেশের শীর্ষ আইটি জায়ান্ট টিসিএস প্রায় ছয় বছরের সর্বনিম্ন দরে লেনদেন করেছে।

মিড-ক্যাপ কোম্পানিগুলির মধ্যে এমফাসিসের শেয়ারের দর আজ প্রায় ৫.১৪ শতাংশ কমে বাজারে মন্দাভাব বাড়িয়েছে। অন্যদিকে এলটিআইমাইন্ডট্রি এবং পারসিস্টেন্ট সিস্টেমস যথাক্রমে ৪.৪৩ শতাংশ ও ৩.৮৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই পথে হেঁটে কোফোর্জের শেয়ারের দাম কমেছে ২.৭৮ শতাংশ। এই দীর্ঘ পরিসংখ্যান পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে পতনের থাবা শেয়ার বাজারে প্রযুক্তি ব্যবসার সর্বস্তরেই প্রভাব বিস্তার করেছে।

বর্তমানে ভারতীয় আইটি সেক্টর কেবল ক্লায়েন্টদের বাজেট সংকোচনের অভিজ্ঞতাই মোকাবিলা করছে না, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর রূপান্তর নিয়েও ধোঁয়াশায় রয়েছে। সনাতন আউটসোর্সিং ব্যবস্থার কার্যকারিতা আগামী দিনে এআই ও নতুন অটোমেশনের আগ্রাসনে কতটা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা নিয়ে বড় সংশয় রয়েছে। সংস্থাগুলি এআই ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাজারে তার বৈপ্লবিক প্রভাব দেখা এখনও বাকি রয়েছে。

এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচন এবং বিশ্বজুড়ে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। ক্লায়েন্টরা এখন দীর্ঘমেয়াদী ও খরচসাপেক্ষ প্রজেক্টগুলির চেয়ে জরুরি কাজে স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন। ফলস্বরূপ, ভারতীয় আইটি সংস্থাগুলির পাইপলাইনে জমে থাকা কাজগুলির বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটকে আরও একটু বাড়িয়ে তুলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে এই সাময়িক ধসের মধ্যেও সম্ভাব্য আশার আলো দেখছেন কয়েকজন বাজার বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ববাজারের প্রতিক্রিয়ায় ঘরোয়া শেয়ারে যে সংশোধন ঘটেছে, তা দীর্ঘমেয়াদে বাজারের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে সাহায্য করতে পারে। শেয়ারের দাম বর্তমান স্তরে নিচে নেমে যাওয়ায় পোর্টফোলিওকে নতুন করে ভালো মানের আইটি স্টক দিয়ে সাজানোর আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আইটি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় লাল সতর্কতা ও সুদূরপ্রসারী শিক্ষা। আসন্ন ত্রৈমাসিকের আর্থিক ফলাফল, কোম্পানিগুলির পরিচালন কমিটির গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার সংক্রান্ত স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেখার পরেই সতর্ক পদক্ষেপে বিনিয়োগের গতি স্থির করা উচিত। সংকটের এই সাময়িক কালো মেঘ কেটে বাজার কত দ্রুত স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে, তা লাখ টাকার প্রশ্ন।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+