বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থায় বদল আনতে বড় পদক্ষেপ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা পরিকাঠামোয় আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে চলেছে রাজ্য সরকার। সল্টলেকের বিকাশ ভবনে রাজ্যের উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী, স্কুল শিক্ষামন্ত্রী এবং একাধিক উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিকের উপস্থিতিতে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সারলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এদিনের বৈঠক থেকে রাজ্যের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়ন এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জাতীয় শিক্ষানীতি (এনইপি) চালুর বিষয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানান, রাজ্যের ৮১ হাজার বিদ্যালয়কে বিশ্বমানের করে তোলাই এই নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শিক্ষাকে কোনওভাবেই পণ্য করতে দেওয়া হবে না। শিক্ষা ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ রোখার পাশাপাশি প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ফেরানোর বড়সড় আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। মূলত বিদ্যালয়গুলির সামগ্রিক পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পঠনপাঠনের পরিবেশ উন্নত করাকেই বর্তমান প্রশাসনের শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এদিনের বৈঠকে সরকারি স্কুলগুলির দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের প্রশাসনিক ও ব্যবহারিক সংস্কারের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এতদিন রাজ্যের বহু প্রত্যন্ত এলাকার সরকারি স্কুলে কাঠ বা কয়লার উনুনের ধোঁয়ায় মিড ডে মিলের রান্না করা হতো, যা পরিবেশের পাশাপাশি রন্ধনকর্মী ও খুদে পড়ুয়াদের স্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত ক্ষতিকর ছিল। এবার থেকে সেই প্রথা বদলে রাজ্যের প্রতিটি সরকারি স্কুলেই মিড ডে মিলের রান্না করা হবে আধুনিক এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারে।
এর ফলে রান্নার মানোন্নয়ন ও স্কুল চত্বরের পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মহল। রান্নার পদ্ধতিতে এই পরিবর্তনের পাশাপাশি পড়ুয়াদের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখে বিকাশ ভবনের বৈঠকে বিশেষ গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি সরকারি বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য অ্যাকোয়া গার্ড বা আধুনিক ওয়াটার পিউরিফায়ার যন্ত্র বসানোর নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। স্কুলগুলিতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা নিশ্চিত করতে জোর দেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট এড়াতে এবং পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী শক্তির ব্যবহার বাড়াতে স্কুলগুলিতে পর্যায়ক্রমে সোলার সিস্টেম বা সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে স্কুলগুলির নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদাও মিটবে এবং বিদ্যুৎ বিলের খরচও একধাক্কায় অনেকটা কমবে। স্কুল চত্বর ও শৌচাগার নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য প্রতিটি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ম ঠিকঠাক মানা হচ্ছে কিনা, তাও নজরদারি করা হবে।
রাজ্যে বিগত কয়েক বছর ধরে আটকে থাকা সর্বভারতীয় জাতীয় শিক্ষানীতি (এনইপি) কার্যকর করার বিষয়ে চূড়ান্ত স্তরের প্রশাসনিক প্রস্তুতি শেষ করার কথা জানানো হয়েছে। আগের জমানায় আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতায় এই নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক থমকে ছিল। তবে বর্তমান রাজ্য সরকার শিক্ষার গুণগত মান বাড়িয়ে বাংলার পড়ুয়াদের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা বৃদ্ধির স্বার্থে এই নীতি দ্রুত চালু করতে অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
কম্পিউটার ও ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তার ঘটিয়ে গ্রামীণ এলাকার স্কুলগুলির রূপান্তর সাধনের ওপর জোর দেবে নবান্ন। এর ফলে স্কুলছুট বা মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা একধাক্কায় রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী প্রশাসন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, উন্নত শৌচাগার বা পরিচ্ছন্ন পানীয় জলের অভাবে ছাত্রছাত্রীরা স্কুলমুখী হতে চায় না। কিন্তু এবার প্রতিটি বিদ্যালয়ে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে তাদের স্কুলে ফিরিয়ে আনা হবে।
পশ্চিমবঙ্গে পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে শিক্ষা দফতরে একের পর এক পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির নজিরবিহীন ঘটনা রাজপথে ঝড় তুলেছিল। শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে মিড ডে মিলের বরাদ্দে কোটি কোটি টাকার গরমিলের জেরে গোটা রাজ্য তথা দেশের দরবারে বাংলার মুখ পুড়েছিল। আগের শাসক দলের একাধিক মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতা বর্তমানে জেলে রয়েছেন। এর জেরে সাধারণ মানুষের মন থেকে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি ভরসা উঠে গিয়েছিল।
রাজ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাই শিক্ষা ক্ষেত্রকে সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত করতে বড় ধরনের কোমর বেঁধে নেমেছে। শুভেন্দু অধিকারীর সরকার স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, নিয়োগ দুর্নীতিতে যারা যুক্ত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি মেধার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ উপায়ে শিক্ষক নিয়োগ ত্বরান্বিত করবে। যুব সমাজের কাছে হারানো মর্যাদা ও শিক্ষার আস্থা ফিরিয়ে দেওয়াই এই মুহূর্তে নবান্নের সামনে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষা দফতরের খোলনলচে বদলে ফেলতে এদিনের বৈঠকে প্রতিটি জেলার বিদ্যালয় পরিদর্শকদের (ডিআই) প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে আর শুধু ফাইল ও খাতা-কলমে কাজ করা চলবে না। প্রতিটি জেলা স্তরের শিক্ষাদফতরের আধিকারিকদের নিয়মিত এলাকাভিত্তিক স্কুলগুলি নিজে গিয়ে পরিদর্শন করতে হবে। পরিকাঠামোয় কোনও ত্রুটি ধরা পড়লে বা পড়ুয়াদের মিড ডে মিলের গুণগত মান নিয়ে কোনও গরমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিককেই সরাসরি দায়ী করা হবে।
আধিকারিকদের স্কুল রিপোর্টিং প্রক্রিয়া আরও আধুনিক করা হচ্ছে। স্কুলগুলির পরিচ্ছন্নতা ও পঠনপাঠনের লাইভ ডেটা সরাসরি বিকাশ ভবনের সেন্ট্রাল ড্যাশবোর্ডে পাঠাতে হবে। এর পাশাপাশি, উচ্চ শিক্ষার মান বাড়াতে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও একাধিক নতুন সংস্কার আসতে চলেছে। জাতীয় শিক্ষানীতি মেনেই তৈরি হচ্ছে সেমিস্টার ব্যবস্থা ও উন্নতমানের ক্রেডিট সিস্টেম, যা বাংলার যুব সমাজকে দেশবিদেশের চাকরির বাজারে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও দক্ষ করে তুলতে সক্ষম বলে আশা রাখা হচ্ছে।












Click it and Unblock the Notifications