মুর্শিদাবাদে রেল দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য রেলের, তদন্ত কমিটি গড়ে কড়া পদক্ষেপ

মুর্শিদাবাদের বহরমপুর মহকুমার অন্তর্গত কর্ণসুবর্ণ স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় লেভেল ক্রসিং সম্পূর্ণভাবে খোলা থাকার সুযোগে রেলওয়ে ট্র্যাক অতিক্রম করার সময় দ্রুতগতির ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ গিয়েছে দুই শিশু এবং এক বৃদ্ধ-সহ মোট তিন জনের। এই মর্মান্তিক ঘটনার পিছনে সরাসরি রেলের গেট কোয়ার্টারে কর্মরত গেটম্যানের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও ডিউটি চলাকালীন মারাত্মক অবহেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে রেল বোর্ড।

শুক্রবার সাতসকালে এই মর্মান্তিক বিপর্যয়টি ঘটে মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণ এবং গোবিন্দপুর স্টেশনের মধ্যবর্তী আপ রেল লাইনে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের থেকে জানা গিয়েছে, ওই লাইনে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটে আসছিল কাটোয়াগামী নিমতিতা-কাটোয়া ডাউন প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি। কিন্তু তখন ক্রসিংয়ের ইন্টারলকিং গেটটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী বন্ধ করা হয়নি। গেট অনায়াসে খোলা দেখে স্কুল পুলকার ও একজন বয়স্ক সাইকেল আরোহী লাইন পার হতে যান, যার ফলেই এই মারাত্মক ওভারল্যাপিং পথ দুর্ঘটনা ঘটে।

Aftermath of the tragic Karnasubarna level crossing accident

দুর্ঘটনার খবর মুহূর্তের মধ্যে চাউর হতেই সংলগ্ন এলাকার পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। অত্যন্ত মর্মান্তিক এই রেল দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা লাইনে নেমে পড়েন। তাঁরা মৃতদেহগুলি ঘিরে রেখে রেল ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। বিক্ষুব্ধ জনতার প্রাথমিক ক্ষোভের আঁচ আছড়ে পড়ে রেল কেবিনে কর্মরত গেটম্যানের ওপর এবং ক্ষুব্ধ জনতা তাঁকে টেনে নিয়ে গেট কেবিনের ভিতরেই আটকে বাইরে থেকে দরজায় বিশাল তালা ঝুলিয়ে দেয়।

বিক্ষোভে শামিল স্থানীয় নাগরিকেরা গেটম্যানের পূর্ব আচরণ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের দাবি, ওই গেটম্যান প্রায় প্রতিদিনই মদ কিংবা গাঁজার নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে দায়িত্ব পালন করতেন। মত্তাবস্থায় থাকার ফলেই কাজের প্রতি তাঁর এই চরম উদাসীনতা। আগে বহুবার দেখা গিয়েছে, একবার রেলগেট বন্ধ করার পর নিজের খেয়ালে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা তা খুলতে ভুলে যেতেন, যা নিত্যযাত্রীদের চরম দুর্ভোগের কারণ হতো।

এদিন যখন মত্ত গেটম্যানকে কেবিন থেকে উদ্ধার করে থানার হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখনও অভিযুক্তের আচরণে এক ধরণের নির্লিপ্ততা ও অস্বাভাবিক ভাব লক্ষ্য করা যায়। পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও তিনি কোনও উত্তর দেননি। শেষ পর্যন্ত বহরমপুর থানার পুলিশ উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করে অভিযুক্তকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয় ও স্থানীয়দের শান্ত করে গ্রেফতার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

অরক্ষিত রেল ক্রসিংয়ের কারণে প্রাণ হারিয়েছে মাত্র ৯ বছরের জেসিকা ইয়াসমিন এবং ৬ বছর বয়সের ছোট্ট ফারহানা সুলতানা। এছাড়াও তাদের সঙ্গে লাইনে থাকা ৬৫ বছরের প্রবীণ সাইকেল আরোহী জামশেদ আলির জীবনও কেড়ে নিয়েছে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ফুটফুটে দুই শিশুর এমন আকস্মিক অকালমৃত্যু দেখে গোটা এলাকা জুড়ে স্বজনহারা পরিবারের কান্নায় এক ভারাক্রান্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য দেহগুলি স্থানীয় মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ।

দুর্ঘটনার গভীরতা টের পেয়ে পূর্ব রেলের উচ্চপদস্থ রেল আধিকারিকরা পরিস্থিতি সামলাতে দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছন। পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শিবরাম মাঝি এই আশঙ্কাজনক ঘটনার প্রেক্ষিতে জানান, কর্ণসুবর্ণ ও গোবিন্দপুর স্টেশনের মধ্যবর্তী কিলোমিটার পয়েন্টের সিগন্যালিং সিস্টেমে টেকনিক্যাল দিক দিয়ে কোনওরকম যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়েনি। নিমতিতা-কাটোয়া প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি সংকেত মেনেই স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে আসছিল এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

রেলের তরফ থেকে সরাসরি জানানো হয়েছে যে, ওই ক্রসিংয়ে রেলগেট সচল রাখার দায়িত্বে কর্মরত গেটম্যান ও সুপারভাইজারের চরম খামখেয়ালিপনা এবং কর্তব্যে অবহেলা ছিল। ইতিমধ্যে ঘটনার প্রাথমিক রিপোর্ট খতিয়ে দেখে অভিযুক্ত গেটম্যান এবং গেটের তদারকিতে থাকা সুপারভাইজারকে রেলের চাকরি থেকে সাময়িকভাবে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পূর্ব রেল প্রশাসন।

ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো নিরীহ মানুষের ক্ষতি কখনওই পূরণযোগ্য নয়, তবুও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়াতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করেছে রেল প্রশাসন। ভারতীয় রেলওয়ের তরফে এক ঘোষণায় জানানো হয়েছে, এই দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে নিশ্চিত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে। তার পাশাপাশি এই মারাত্মক দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার স্বার্থে আড়াই লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

একইভাবে রাজ্য সরকারের তরফ থেকেও হতাহত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোর সব ধরনের মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান রাজ্য সরকারের প্রতিনিধি এবং রাজ্যের মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ। তিনি ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়েই রাজ্য সরকারের পক্ষে ক্ষতিপূরণ প্রদানের ঘোষণা করে জানান, নিহতদের পরিবার পিছু নগদ ৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হবে এবং দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার সব খরচ সরাসরি বহন করবে রাজ্য সরকার।

দুঃখজনক এই দুর্ঘটনাটি আরও একবার লেভেল ক্রসিং সুরক্ষা ব্যবস্থার নজরদারির অভাবকে জনসমক্ষে নিয়ে এল। রেলের কর্মীদের ব্যক্তিগত গাফিলতির বড় খেসারত দিতে হল সাধারণ মানুষকে। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও এবং সংশ্লিষ্ট রুটে প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু করা সম্ভব হলেও কর্ণসুবর্ণ স্টেশন চত্বরে এক থমথমে উত্তেজনা রয়েছে। অনভিপ্রেত ঘটনা এড়াতে রেললাইনের আশেপাশে বাড়তি নজরদারি রাখছে রেল পুলিশ ও প্রশাসন।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+