সোনম ওয়াংচুকের পর এবার আমরণ অনশনে সিজেপি প্রধান দিপকে, এবার পদত্যাগ দাবি প্রধানমন্ত্রীর
জাতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট (NEET)-এ বিস্তর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দেশের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান ছাত্র আন্দোলন এবার আরও তীব্র ও নাটকীয় রূপ ধারণ করেছে। প্রখ্যাত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে অনশন মঞ্চ থেকে পুলিশ জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার পরেই সেখানে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদের পরেই আন্দোলনকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমরণ অনশনের ঘোষণা করেছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে।
সোনম ওয়াংচুককে বিক্ষোভস্থল থেকে সরানোর পরপরই ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ একটি বার্তার মাধ্যমে নিজের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, আন্দোলনকে দমন করার যে কোনও চক্রান্ত রুখে দিতেই তিনি "এই মুহূর্ত থেকে" নিজের অনশন শুরু করছেন। আন্দোলনকারীদের মনোবল বজায় রাখার বার্তা দিয়ে তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যন্তর মন্তরের দিকে এগিয়ে আসার আবেদন জানান এবং তাঁদের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

উল্লেখ্য, নিট-ইউজি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই সারা দেশে যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তার আঁচ এসে পড়েছে দিল্লির বুকেও। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যন্তর মন্তরের অনশন মঞ্চে সোনম ওয়াংচুকের প্রতিবাদ অনশন ২১তম দিনে পা দিয়েছিল। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পূর্বনির্ধারিত সংসদ অভিযানের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে দিল্লি পুলিশ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাঁকে অনশন মঞ্চ থেকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে দিল্লির হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশের এই দমনপীড়নের তীব্র সমালোচনা করে সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দিপকে দাবি করেন যে, সোনম ওয়াংচুককে যখন বেআইনিভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন পুলিশ প্রতিবাদী পড়ুয়াদের ওপর চরম দমননীতি প্রয়োগ করে। তাঁকে নিজেও পুলিশের লাঠির মার সহ্য করতে হয়েছে এবং জোর করে দীর্ঘ সময় ধরে আটক করে রাখা হয়েছিল। এই ঘটনা আন্দোলনকারীদের ক্ষোভকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে এবার সরাসরি দেশের প্রধানমন্ত্রীর ইস্তফার দাবি উঠতে শুরু করেছে।
দিল্লি পুলিশের পদক্ষেপ ও আন্দোলনকারীদের পাল্টা হুঁশিয়ারি
যন্তর মন্তর চত্বরে তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই আন্দোলনকারী ছাত্রদের উদ্দেশে অভিজিৎ দিপকে বলেন, প্রশাসন যদি মনে করে থাকে যে সোনম ওয়াংচুককে জোর করে অনশন মঞ্চ থেকে সরিয়ে দিয়ে তাঁরা এই বিরাট গণআন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে পারবেন, তবে তারা মস্ত বড় ভুলের স্বর্গে বাস করছেন। এই লড়াই দেশের লক্ষ লক্ষ বঞ্চিত ও প্রতারিত ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতের অধিকারের লড়াই, যা কোনও রক্তচক্ষু বা দমনপীড়নের কাছে মাথা নত করবে না।
আন্দোলনের সুর আরও আক্রমণাত্মক করে সিজেপি প্রধান বলেন, এতদিন পর্যন্ত তাঁদের প্রধানতম এবং স্বাভাবিক দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নৈতিক ইস্তফা। কিন্তু আন্দোলনরত পড়ুয়াদের ওপর যেভাবে নির্মম ও অনৈতিক হামলা চালানো হয়েছে, তারপর থেকে আন্দোলনের মোড় ঘুরে গেছে। এখন সিজেপি এবং সহযোগী ছাত্র সংগঠনগুলি সম্মিলিতভাবে সরাসরি দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকবে এবং এই দাবিতেই আন্দোলন চলবে।
উল্লেখ্য, গত ২০ জুন থেকে নতুন দিল্লির যন্তর মন্তরে লাগাতার অবস্থান বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেছে ককরোচ জনতা পার্টি। মূলত দেশের চিকিৎসা শিক্ষায় প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-এর ফলাফল ঘিরে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও দুর্নীতিগ্রস্ত পরীক্ষা পরিচালন ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের লক্ষ্যেই এই আন্দোলন শুরু হয়। পরবর্তীতে গত ২৮ জুন থেকে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়ে সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক নিজে যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন আন্দোলনে বসেন।
২০ জুলাইয়ের 'চলো সংসদ’ অভিযানের রূপরেখা
পুলিশি তৎপরতা, ব্যাপক ধরপাকড় এবং প্রধান আন্দোলনের মুখ সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও পড়ুয়ারা কোনওভাবেই রণে ভঙ্গ দিতে রাজি নন। ককরোচ জনতা পার্টির অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে ইতিমধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, পূর্বঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ২০ জুলাইয়ের 'চলো সংসদ’ মার্চ বা সংসদ অভিযান সম্পূর্ণ বলবৎ থাকবে। এই পদযাত্রায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে ছাত্রসমাজ ও সংবেদনশীল সাধারণ মানুষ অংশ নেবেন।
আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের একাংশের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার নিট পরীক্ষার এই কেলেঙ্কারির সত্যটি ঢাকতে প্রথম থেকেই নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে এবং মূল অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা দেওয়ার যৌক্তিক দাবিকে ধামাচাপা দিতেই বারবার পুলিশের জুলুমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সোনম ওয়াংচুকের মতো একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বকে যেভাবে বলপ্রয়োগ করে তুলে দেওয়া হল, তা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক বড় আঘাত বলে তাঁরা দাবি করেন।
যন্তর মন্তরের এই নজিরবিহীন ও সংবেদনশীল পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সমগ্ৰ জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে এবং যন্তর মন্তর সংলগ্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী। এই পরিস্থিতির মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার দিকে যেমন সকলেই নজর রাখছেন, অন্য দিকে অভিজিৎ দিপকের আমরণ অনশন শুরুর ঘটনা ছাত্র আন্দোলনকে জাতীয় রাজনীতিতে আরও বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।












Click it and Unblock the Notifications