ফ্রিল্যান্সার, গিগ কর্মী থেকে অসংরক্ষিত ক্ষেত্রের কর্মীদের জন্য বড় সুখবর! এবার পিএফের সুবিধা পাবেন সকলে
ভারতে চাকরিজীবী বা বেতনভুক কর্মীদের সঞ্চয়ের প্রধান ভরসা হল এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড বা ইপিএফ। এতদিন এই আর্থিক সুবিধা কেবল সংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এবার সেই গণ্ডি পেরিয়ে ফ্রিল্যান্সার, গিগ ওয়ার্কার এবং স্বনির্ভর ব্যক্তিদের জন্যও প্রভিডেন্ট ফান্ডের দরজা খুলতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশন বা ইপিএফও একটি নতুন রূপরেখা তৈরির কাজ শুরু করেছে, যাতে যেকোনও সাধারণ পেশাজীবীও স্বেচ্ছায় পিএফ-এ সঞ্চয় করতে পারেন।
বর্তমানে প্রস্তাবিত এই নতুন সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ চলছে। যদি এই পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত রূপ পায়, তবে দেশের কোটি কোটি সাধারণ নাগরিক একটি সুসংগঠিত অবসরকালীন সঞ্চয় কাঠামোর আওতায় আসতে পারবেন। প্রাসঙ্গিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান নিয়মে ২০ জন বা তার বেশি কর্মী থাকা সংস্থাগুলিই কেবল ইপিএফের আওতায় আসে। এর ফলে দেশের শ্রমশক্তির একটি বিশাল অংশ সামাজিক সুরক্ষার বাইরেই থেকে যায়।

কারা পাবেন এই নতুন ইউনিভার্সাল পিএফের সুবিধা?
প্রস্তাবিত এই ইউনিভার্সাল বা সর্বজনীন প্রভিডেন্ট ফান্ড স্কিমটি এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে এটি পরিবর্তিত কর্মের ধরনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এর ফলে ফ্রিল্যান্সার বা কনসালট্যান্টদের পাশাপাশি ফুড ডেলিভারি পার্টনার এবং ক্যাব চালকরাও এর সরাসরি সুবিধা পাবেন। এছাড়া মাঝারি ও ছোট দোকানদার, ব্যবসায়ী বা পেশাদার স্বনির্ভর ব্যক্তিরা এই বিশেষ স্কিমের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যতের এক নির্ভরযোগ্য আর্থিক তহবিল গড়ে তোলার সুযোগ পাবেন।
এর পাশাপাশি যে সব হাজার হাজার দিনমজুর বা অসংগঠিত ক্ষেত্রের সাধারণ শ্রমিক রয়েছেন অথবা এমন সমস্ত ছোট সংস্থায় কর্মরত যেখানে ইপিএফও-র নিয়ম মেনে চলা বাধ্যতামূলক নয়, তারাও এই স্কিমে নিজেদের ইচ্ছামতো অংশ নিতে পারবেন। এর প্রধানতম উদ্দেশ্য হল, প্রথাগত চাকরির বাইরে থাকা দেশের এক বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে প্রভিডেন্ট ফান্ডের মতো নিরাপদ সরকারি সঞ্চয় কাঠামোর আওতায় আনা, যাতে বার্ধক্যে তাদের কোনও প্রকার আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে না হয়।
টাকা জমার ক্ষেত্রে থাকবে নমনীয়তা ও কর ছাড়ের সুবিধা
সাধারণ প্রভিডেন্ট ফান্ড ব্যবস্থার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, প্রতি মাসে কর্মী এবং নিয়োগকারী সংস্থা—উভয় পক্ষকেই একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা করতে হয়। কিন্তু ফ্রিল্যান্সার বা গিগ কর্মীদের মাসিক উপার্জন সবসময় একরকম থাকে না, তাই তাদের ক্ষেত্রে এই নির্দিষ্ট নিয়মে টাকা দেওয়া বেশ দুরূহ হতে পারে। এই বাস্তব জট কাটাতে প্রস্তাবিত স্কিমে আমানতকারীদের আমানত জমার ক্ষেত্রে বিশেষ নমনীয়তা বা ফ্লেক্সিবিলিটি দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
নিজের আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং সুবিধাজনক সময় অনুযায়ী গ্রাহক চাইলে প্রতিদিন, প্রতি মাসে অথবা বছরে মাত্র একবারও এই সঞ্চয় তহবিলে টাকা জমা করতে পারবেন। এর ফলে অনিয়মিত আয়ের মানুষদের সঞ্চয় করা অনেক সহজ হবে। শুধু তাই নয়, এই সঞ্চয় ব্যবস্থার কর কাঠামোটিও সাধারণ ইপিএফের মতোই আকর্ষণীয় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সূত্র মারফৎ জানা গেছে, এই স্কিমে প্রতি বছর আড়াই লক্ষ টাকা পর্যন্ত আমানতের ওপর সম্পূর্ণ আয়কর ছাড়ের সুবিধা মিলতে পারে।
এছাড়াও এই সঞ্চিত অর্থের ওপর অর্জিত সুদের পরিমাণটিকেও সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে উপভোক্তারা একদিকে যেমন ট্যাক্স বাঁচাতে পারবেন, তেমনই দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পরিমাণ রিটার্ন ঘরে তুলতে সক্ষম হবেন। এই দ্বিবিধ সুবিধার জন্য গিগ এবং স্বনির্ভর কর্মীরা সহজেই এই নির্ভরযোগ্য ভবিষ্যৎ সঞ্চয় তহবিলে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন বলে অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ মনে করছেন।
সম্পূর্ণ সেলফ-ফান্ডেড এই তহবিল কীভাবে চলবে?
সাধারণত অসংগঠিত ক্ষেত্রের জন্য তৈরি প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকার নিজে আর্থিক অনুদান দেয়। উদাহরণস্বরূপ, প্রধানমন্ত্রী শ্রম যোগী মান-ধন যোজনার কথাই ধরা যাক, যেখানে উপভোক্তার পেনশন তহবিলের সমপরিমাণ বা অর্ধেক অর্থ কেন্দ্রীয় সরকার নিজে বহন করে। তবে ইপিএফও-র এই প্রস্তাবিত নতুন সামাজিক সুরক্ষার স্কিমটি হবে সম্পূর্ণ সেলফ-ফান্ডেড। অর্থাৎ, এই প্রকল্পে সরকারের তরফ থেকে কোনো সরাসরি ভর্তুকি বা ম্যাচিং কন্ট্রিবিউশন দেওয়া হবে না।
এর অর্থ হলো, এই স্কিমের আওতায় আসা প্রত্যেক আমানতকারীকে একমাত্র নিজেদের জমাকৃত উপার্জনের ওপর ভিত্তি করেই অবসরকালীন সঞ্চয় স্কিম গড়ে তুলতে হবে। তবে সরকারের কোনো আর্থিক অংশীদারিত্ব না থাকলেও, প্রভিডেন্ট ফান্ডের নিরাপত্তা এবং স্থির সুদের হারের কারণে এটি বাজারে উপলব্ধ অন্যান্য ব্যক্তিগত অসংগঠিত সঞ্চয় পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি সুরক্ষিত বলে বিবেচিত হচ্ছে। দেশের প্রতিটি কোনার মানুষের কাছে এই ফান্ডের বিশ্বস্ততা অত্যন্ত গভীর।
তথ্যপ্রযুক্তি কাঠামো উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি
প্রস্তাবটি এখনও সরকারি অনুমোদনের প্রাথমিক স্তরে রয়েছে এবং বেশ কয়েকটি চূড়ান্ত ছাড়পত্রের প্রয়োজন। তা সত্ত্বেও ইপিএফও কিন্তু এই প্রকল্পের প্রস্তুতিতে বিন্দুমাত্র ঢিলেমি দিচ্ছে না। বিশাল অসংগঠিত সেক্টরের কর্মীদের মসৃণভাবে এই পরিষেবার সাথে যুক্ত করতে শক্তিশালী তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি অবকাঠামো প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও অনলাইন সিস্টেম তৈরি করার লক্ষ্যে সংস্থা ইতিমধ্যেই একটি জাতীয় স্তরের বিশেষ দরপত্র বা আইটি টেন্ডার আহ্বান করেছে।
এই নতুন সামাজিক নিরাপত্তা পরিকাঠামোটি দেশে প্রস্তাবিত লেবার কোড বা নতুন শ্রমবিধির সাথেও বেশ ভালোভাবে মানিয়ে যাবে। নতুন নিয়মানুযায়ী অ্যাপ-ভিত্তিক ফুড ডেলিভারি বা ট্যাক্সি চালকদের তথ্য নথিবদ্ধ করা বাধ্যতামূলক প্রমাণের কথা বলা হয়েছে। এই সময় যদি ইপিএফও-র তরফ থেকে এমন একটি সার্বিক ব্যবস্থা চালু করা হয়, তবে বিশাল সংখ্যক অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রের মানুষ অনায়াসেই একটি সংগঠিত পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামোর অংশ হয়ে উঠবেন।
বর্তমানে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্পকে নিখুঁত করতে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের সামাজিক সুরক্ষার মডেল ও আন্তর্জাতিক পদ্ধতি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই গবেষণার ফলাফল দেখেই চূড়ান্ত রূপরেখা ঠিক করা হবে। গিগ ইকোনমি এবং স্বনির্ভরতার যুগে এই অভিনব পদক্ষেপ ভারতের অসংগঠিত ক্ষেত্রের কোটি কোটি শ্রমিকের শেষ বয়সের দিনগুলোকে নিশ্চিতভাবে নিরুপদ্রব ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ করে তোলার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক দিগন্ত উন্মোচন করতে চলেছে।












Click it and Unblock the Notifications