দিঘা-নন্দকুমার সড়কে ভয়াবহ লরি-বাস সংঘর্ষে ঝরে গেল ৪টি প্রাণ
রথযাত্রার ছুটির আমেজে হাজার হাজার পর্যটক মেতে ওঠেন দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র দিঘায় ঘোরার আনন্দে। কিন্তু সেই খুশির আমেজের মাঝেই নেমে এল এক স্তব্ধতা ও গভীর বেদনা। দিঘা-নন্দকুমার জাতীয় সড়কে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনা, যা মুহূর্তে তছনছ করে দিল কয়েকটি সাধারণ পরিবারকে। উৎসবের দিনের শুরুতেই ঝরে গেল চার-চারটি তাজা প্রাণ।
ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটেছে দিঘা-নন্দকুমার জাতীয় সড়কের হেঁড়িয়ার কাছে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গিয়েছে, একটি বেসরকারি যাত্রীবাহী বাস যাত্রী নিয়ে হাওড়া থেকে দিঘার দিকে আসছিল। বৃহস্পতিবার ভোররাতে চলন্ত অবস্থায় হঠাৎই বাসটির ইঞ্জিনে মারাত্মক যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। মাঝরাস্তায় বড় বিপদ এড়াতে চালক অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বাসটিকে জাতীয় সড়কের একপাশে দাঁড় করান।

গাড়ির সমস্যা ঠিক কোথায় হয়েছে এবং কীভাবে তা দ্রুত ঠিক করা যায়, তা খতিয়ে দেখতে বাস থেকে নিচে নামেন বাসের চালক, খালাসি এবং গাড়ির মালিক নিজে। গাড়িটির পিছনের দিকে দাঁড়িয়ে যখন তাঁরা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পরীক্ষা করছিলেন, ঠিক তখনই ঘটল চরম বিপর্যয়। অন্ধকার চিরে দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসা একটি লরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাসটির পিছনে সজোরে ধাক্কা মারে।
লরির ধাক্কা এতটাই জোরালো ছিল যে, বাসের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকেই সরাসরি গাড়ির নিচে চাপা পড়েন। প্রচণ্ড ধাতব সংঘর্ষের আওয়াজে কেঁপে ওঠে শান্ত ভোরবেলার জাতীয় সড়ক এলাকা। বিকট শব্দ শুনে আশেপাশের স্থানীয় বাসিন্দারা ঘুম থেকে উঠে রাজপথে ছুটে আসেন। তাঁরা এসে দেখেন রক্তাক্ত অবস্থায় রাজপথের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছেন বেশ কয়েকজন মানুষ।
দুর্ঘটনা ঘটার পরপরই খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে আসে খেজুরি থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী। পুলিশ ও স্থানীয় যুবকদের তড়িৎ প্রচেষ্টায় ও যৌথ উদ্যোগে উদ্ধারকাজ শুরু করা হয়। রক্তাক্ত ও মারাত্মক জখম হওয়া মানুষদের দ্রুত উদ্ধার করে তমলুক জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা চারজনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই খবর হাসপাতালে পৌঁছনো মাত্রই শোরগোল শুরু হয়ে যায়।
পুলিশ সূত্রের খবর, নিহতদের মধ্যে অন্যতম হলেন বাসের মালিক তপন দাস (৪৪)। তিনি উত্তর মেদিনীপুরের বাজকুলের বাসিন্দা ছিলেন। রথযাত্রার বাড়তি ভিড়ে যাত্রী পরিষেবা এবং বাসের পরিস্থিতি নিজে তদারকি করার জন্য তিনি নিজেই গাড়িতে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবরে বাজকুলের পুরো ব্যবসায়ী মহলে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
তপনবাবুর সঙ্গেই এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বাসের অভিজ্ঞ চালক শিবব্রত পট্টনায়েক (৫৯)। শিবব্রতর নিজের বাড়ি ছিল দিঘাতেই। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী মানুষের এই অকাল প্রয়াণে তাঁর ও বাসের অন্যান্য সহকর্মীদের পরিবার সম্পূর্ণ বিলীন এবং দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তাঁর মতো একজন শান্ত ও দক্ষ চালকের এই পরিণতি সহকর্মীরাও মেনে নিতে পারছেন না।
মৃতদের মধ্যে বাকি দুজন হলেন বাসের খালাসি। তাঁদের পরিচয় মিলেছে অশোক মাইতি ও শুভদীপ মণ্ডল হিসেবে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁদেরও হাসপাতালে আনা হয়েছিল। এদের মধ্যে অশোকের বাড়ি ভূপতিনগর এলাকায় এবং শুভদীপ বাজকুলেরই বাসিন্দা ছিলেন। তাঁরা প্রতিদিনের মতো নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই ভোররাতে এই মারাত্মক বিপদের মুখে পড়েন।
তমলুক জেলা হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনায় আরও তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁদের শরীরের বিভিন্ন অংশে গভীর ক্ষত ও হাড় ভেঙে গিয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে আহতদের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। হাসপাতালের চিকিৎসকদের একটি বিশেষ মেডিক্যাল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে তাঁদের জরুরি বিভাগে অতি সতর্কতার সঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি কেবল একটি সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, এটি রাতের বেলায় জাতীয় সড়কে চলমান দূরপাল্লার গাড়িগুলির সামগ্রিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বড়সড় অবহেলার দিকটিকে সামনে নিয়ে এল। দিঘা-নন্দকুমার ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক পশ্চিমবঙ্গ তথা দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম অত্যন্ত ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। সাধারণ পণ্য পরিবহণ এবং দীঘাগামী পর্যটকদের প্রতিনিয়ত এই রুটে যাতায়াত থাকে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতের অন্ধকারে হাইওয়েতে কোনও গাড়ি বিকল হয়ে পড়লে চালকদের প্রাথমিক সতর্কবার্তা ব্যবহার করা উচিত। নিয়মানুযায়ী গাড়ির হ্যাজার্ড লাইট অন রাখা এবং গাড়ি থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে রিফ্লেক্টিভ ট্রায়াঙ্গেল বা সঙ্কেত বোর্ড বসানো উচিত। কিন্তু অনেক সময়ই তাড়াহুড়ো বা অসচেতনতার কারণে এই অতিপ্রয়োজনীয় নিয়মগুলি এড়িয়ে যাওয়া হয়, যা পরবর্তীকালে মারাত্মক ভুল হিসাবে বিবেচিত হয়।
এর পাশাপাশি ভোররাতের দিকে জাতীয় সড়কে চলাচলকারী দূরপাল্লার লরিগুলির অনিয়ন্ত্রিত গতিবেগও এক্ষেত্রে সমান দায়ী। চালকদের একটানা গাড়ি চালানোজনিত ক্লান্তি অথবা মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এই ধরনের দুঃখজনক দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। হেঁড়িয়া মোড় ও তার সংলগ্ন এলাকাগুলিতে রাতের পুলিশি টহলদারি এবং গতি নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর কড়াকড়ির দাবি তুলছেন স্থানীয় নাগরিকেরা।
দুর্ঘটনার তদন্তে নেমে ইতিপূর্বেই খেজুরি থানার পুলিশ ঘাতক লরিটিকে বাজেয়াপ্ত করে থানায় নিয়ে গিয়েছে। লরির চালকের খোঁজে আশেপাশের এলাকায় পুলিশ তল্লাশি শুরু করেছে। পুলিশ খতিয়ে দেখছে দুর্ঘটনার সময় লরিচালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কিনা এবং বাসের পিছনে পার্কিং সতর্কবার্তা সচল ছিল কি না। মৃতদেহগুলি ময়নাতদন্তের জন্য জেলার মূল মর্গে পাঠানো হচ্ছে।
রথযাত্রার উৎসবের মরশুমে জাতীয় সড়কের পিচেই এভাবে চারজনের প্রাণ চলে যাওয়ার ঘটনা মেদিনীপুর জুড়ে এক নিস্তব্ধ শোকের পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রশাসন 'সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ' প্রচার চালালেও, হাইওয়ের বাস্তব পরিস্থিতি যে কতটা অনিরাপদ, তা এই মর্মান্তিক ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।












Click it and Unblock the Notifications