বইমেলার নামে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি তৃণমূল আমলে! মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু দিলেন বড় নির্দেশ
তৃণমূল জমানার কাজ নিয়ে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। এবার কোটি কোটি টাকার বেনিয়মের অভিযোগ উঠল সরকারি বইমেলাকে কেন্দ্র করে। বুধবার সল্টলেকের বিজেপি কার্যালয়ে আয়োজিত 'জনতার দরবার’ কর্মসূচিতে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি সামনে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় পড়ে গিয়েছে। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং এই অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
জনতার দরবারে সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ শোনার পাশাপাশি দলের পদাধিকারীদের সঙ্গেও বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই আলোচনা চলাকালীন তাঁর হাতে বইমেলা সংক্রান্ত দুর্নীতির একাধিক চাঞ্চল্যকর নথিপত্র তুলে দেওয়া হয়। জেলা স্তরের বিভিন্ন বইমেলায় সরকারি অনুদানের অর্থ দিয়ে তৃণমূল ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের থেকে বই কেনা হয়েছিল বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। এই বিপুল আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা রাজ্যের গ্রন্থাগারমন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ মুখ্যমন্ত্রীকে জানান, জেলা বইমেলাগুলিতে কোন কোন প্রকাশকের কাছ থেকে বই কেনা হবে, তা সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক মদতে ঠিক করা হতো। নির্দিষ্ট কিছু শাসকদল ঘনিষ্ঠ বৃত্তের প্রকাশকদের থেকে নিম্নমানের বই চড়া দামে কিনে সরকারি তহবিলের টাকা নয়ছয় করার অভিযোগ ওঠে। এতে গ্রামীণ গ্রন্থাগারগুলির যেমন চরম ক্ষতি হয়েছে, তেমনই সাধারণ করদাতাদের অর্থের অপচয় হয়েছে।
তৃণমূল জমানার এই পরিকল্পিত কাটমানি ও আর্থিক দুর্নীতির খতিয়ান বিশদে জানার পর শুভেন্দু অধিকারী বলেন যে, এই ধরনের ঘটনার শিকড় খুঁজে বের করা দরকার। মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশে জানিয়েছেন, আগের আমলে বইমেলা পরিচালনা ও বই ক্রয়ের সমস্ত সরকারি টেন্ডার কীভাবে বণ্টন করা হয়েছিল, তার প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দিতে হবে। দুর্নীতিতে সাধারণ মানুষের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করার জন্য প্রশাসন পিছপা হবে না।
পালাবদলের পরই রাজ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে চরম কঠোর অবস্থান নিয়েছে নবগঠিত বিজেপি সরকার। প্রশাসন সূত্রের খবর, শুধু শিক্ষা বা শিল্প ক্ষেত্রে নয়, সংস্কৃতির মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও যে গভীর অনিয়ম বাসা বেঁধেছিল, তা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে চিহ্নিত করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইতিপূর্বে বারবার ঘোষণা করেছেন যে, অপরাধীরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, কাউকেই রেয়াত করা হবে না।
রাজ্যে শাসনভার গ্রহণের পর প্রাতিষ্ঠানিক স্তরের যাবতীয় অনিয়ম, তছরুপ এবং কাটমানির তদন্ত করার জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বে এই দুর্নীতি দমন কমিশন ইতিমধ্যেই বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে পেয়েছে। এই তদন্তকারী কমিটিতে রয়েছেন আইপিএস পদমর্যাদার আধিকারিক জয়রামন, যিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন।
বিশেষ কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আগের তৃণমূল সরকারের একের পর এক বড়সড় কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে এনেছে। বাণিজ্য সম্মেলনের নামে বিপুল অঙ্কের সরকারি টাকার উৎস ও খরচের বেনিয়ম নিয়ে তদন্ত চরমে উঠেছে। তার মধ্যেই নতুন বিষফোঁড়া হিসেবে দেখা দিল বইমেলার এই কোটি কোটি টাকার কারচুপি।
তদন্তকারীদের মতে, বিভিন্ন জেলায় নামসর্বস্ব বইমেলা করে কেবল মাত্র সরকারি ভাতা হাতিয়ে নেওয়ার একটি অলিখিত চক্র সক্রিয় ছিল। এমনকী সরকারি তহবিল থেকে প্রকাশকদের অগ্রিম টাকা পাইয়ে দিয়ে সেই বই আদৌও গ্রন্থাগারে পৌঁছেছে কিনা, তাও কখনও যাচাই করা হয়নি। জানা গিয়েছে, দুর্নীতির অঙ্ক কোটি কোটি টাকা। মোট ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, মেলা প্রাঙ্গণে বইপ্রেমীদের উপস্থিতির আড়ালে মূলত সরকারি টাকা হাতানোর খেলা চলেছে। প্রকৃত প্রকাশক ও লেখকেরা সুযোগ পাননি, অথচ সুযোগসন্ধানী চক্র সরকারি অর্থের যথেচ্ছ অপব্যবহার করেছে। গ্রন্থাগারমন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ জানিয়েছেন যে, তাঁদের দফতর ইতিমধ্যেই প্রতিটি গ্রন্থাগারের বর্তমান পরিস্থিতি ও পুরনো কেনাকাটার ফাইল পর্যালোচনা করা শুরু করে দিয়েছে। এই ঘটনার সম্পূর্ণ তদন্তের পর দোষীদের তালিকা প্রস্তুত করা হবে। সরকারি কোষাগারের পয়সা লোপাট রুখতে এবং বাংলার সাধারণ পাঠকদের হাতে সুস্থ ও বিশ্লেষণধর্মী বই পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর নতুন সরকার।












Click it and Unblock the Notifications