বড় দুর্গা সহস্র মাথার অসুরের দিন শেষ, এবার তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বড় সিংহ
বড় দুর্গা সহস্র মাথার অসুরের দিন শেষ, এবার তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বড় সিংহ
তিনি সবসময়েই সৃষ্টি করেছেন অনবদ্য দেবী মূর্তি। বিখ্যাত ব্যক্তির স্মরণে তৈরি মূর্তিও হয়ে উঠত জীবন্ত। তাঁর পুত্ররাও এখন তৈরি করেন দারুন সব দেবী মূর্তি। এই বছর তাঁদের চমক হতে চলেছে সবথেকে বড় সিংহ। মানুষ সবথেকে বড় দুর্গা দেখেছে। দেখেছে ১০০০ মাথাওয়ালা অসুর। এবার বাংলা দেখবে সবথেকে বড় সিংহ। সৌজন্যে শিল্পী যামিনী পাল শিল্পীর পরিবার।

দ্য লায়ন কিং
হাতে রয়েছে আর ২৪ টি দিন। একটা একটা করে দিন এগিয়ে আসছে। মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রথমবার সবচেয়ে বড় সিংহ "দ্য লায়ন কিং"-র । যার প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। তৈরি করছেন শিল্পী অসীম পাল। থিম সৃজনে লোয়ার কড়াই সর্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটি। স্থান বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ।

যামিনী পালের গল্প
বহু আগের কথা। কলকাতার পোস্তা বাজারের সরস্বতী পুজো মানেই ছিলেন বিখ্যাত শিল্পী রমেশ পাল। কিন্তু একবছর ঘটে যায় ব্যতিক্রম, পুজো কমিটির এক বিশেষ সদস্যের অনুরোধকে প্রাধান্য দিয়ে সে বছরের ঠাকুরের বায়না দেওয়া হয় মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরের এক শিল্পীকে | তারপরেই ঘটে যায় সেই আশ্চর্য ঘটনা। অসাধারণ শিল্পনৈপূণ্যের ছটায় আলোকিত হয় পোস্তার পুজো মন্ডপ।
বহু দর্শনার্থীদের পাশাপাশি প্রতিমা দর্শনে আসেন শিল্পী রমেশ পালও। আর প্রতিমা দর্শনে এসে একটা জায়গায় খটকা লাগে তাঁর, তিনি নিশ্চিতভাবে মনে করেছিলেন যে প্রতিমার কাপড় মাটির হতেই পারে না, এগুলি সিল্কেরই কাপড়। এরপর কমিটির লোকের কথা পরখ করার জন্য স্পর্শ করে দেখতে চান রমেশ বাবু। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যিই যে সেটি মাটির কাপড়ই ছিল। বিখ্যাত শিল্পী রমেশ পালকে যে শিল্পী চমকে দিয়েছিলেন, তিনি আর কেউই নন মুর্শিদাবাদের গর্ব শিল্পশ্রী যামিনী পাল।
এবার এই মহান শিল্পীর জীবনের আলোচনা শুরু করা যাক প্রথম থেকে। ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ২৩ শে মাঘ বাবা দেবেন্দ্রনাথ পাল ও মা রজবালা পালের ঘরে জন্ম নেন যামিনী পাল। আর্থিক সঙ্কট ও তার ফলে জীবিকা অন্বেষণের তাগিদে চতুর্থ শ্রেণিতেই তাঁর প্রথাগত শিক্ষার অবসান ঘটে ।

শৈশবকাল
িন্তু যে প্রতিভা সে জন্ম থেকেই প্রাপ্ত হয়েছিল তার সাক্ষী আজ বহু মানুষ। শৈশব থেকেই মাটির কাজ ও আঁকার প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল। মাত্র ১৪বছর বয়সে তিনি শিক্ষাগুরু বিভূতিভূষণ মল্লিকের কাছে শিক্ষার পাঠ নেন | এর পর জল রঙের কাজ নিয়ে তিন বছর কঠোর অনুশীলনের পর হঠাৎ শিক্ষক হিসেবে কৃষ্ণনাথ কলেজের চারুকলার শিক্ষক বজেন্দ্রনাথ পাল মহাশয়ের সহযোগিতায় এগিয়ে চলেন তৈলচিত্রের পথে। কিছুদিন চলার পর আবার মাটির কাজের দিকেই আগ্রহ জেগে ওঠে যামিনী পালের। নতুন আস্তানার অন্বেষণ করতে করতে এক আত্মীয় মারফত পৌঁছে যান মৃৎশিল্পের আঁতুড়ঘর কৃষ্ণনগরে। যামিনী পালের শিল্পচর্চার ইতিহাস মূলত কৃষ্ণনগরকেন্দ্রিক। প্রথমে তিনি কৃষ্ণনগরের বৈদ্যনাথ পাল ও পরে সুধীর পালের কাছে মৃৎশিল্পের রীতিনীতি রপ্ত করেন। এর পর ২২বছর বয়সে পুনরায় ফিরে আসেন জন্মভিটে বহরমপুরে
শুধু মাটির মূর্তি নয়, শিল্পশ্রী যামিনী পালের অন্যতম গৌরবময় বিষয় হল তার অসাধারণ মর্মরমূর্তির নির্মাণ। তিনি হয়তো উপলব্ধি করেছিলেন মাটির মূর্তি তো স্বল্পস্থায়ী, এমন কিছু করতে হবে যাতে তাঁর শিল্প দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে
। এরপর সিমেন্ট,প্লাস্টার-প্যারিস,পাথরের মূর্তি তৈরীর কাছে মনোনিবেশ করলেন । বিখ্যাত ভাস্কর নিতাই চন্দ্র পালের সান্নিধ্যে এসে তাঁর স্বপ্নসফল হয়। মৃৎশিল্পের কাজ করার মধ্যে দিয়ে তিনি ভাস্কর্যের জগতে উপনিত হন | এরপর বিভিন্ন সংগঠনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নানা মনীষীর মূর্তিনির্মাণের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। যামিনী পালের প্রথম স্ট্যাচু তৈরির ভাবনা আসে একটি কালীমূর্তি দেখে |
।
অযোধ্যায় যামিনী পালের তৈরি রাম-সীতার মূর্তি তাঁর শৈল্পিক নৈপুণ্যতার ঐতিহ্য আজও বহন করে চলেছে । দেশের বাইরের রয়েছে তাঁর বহু অমরকীর্তি । তার মধ্যে রয়েছে জাপানে যিশুর মূর্তি,চিনে বুদ্ধমূর্তি,আমেরিকায় কাঁচে বাঁধানো দুর্গাপ্রতিমা ও সুইজারল্যান্ডে মা লক্ষ্মী প্রতিমা। তিনি শিল্পীজীবনে পেয়েছিলেন বহু পুরস্কার ও সম্মান। প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের কাছ থেকে ১৯৪৬ সালে প্রথম পুরস্কৃত হন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের নানা ক্লে-মডেলের কাজও করেছিলেন তিনি। ১৯৪৬ সালের মার্চে বাসন্তীর মূর্তি নির্মাণ করার জন্য তিনি খুলনায় প্রথম "স্বর্ণপদক" পান | ১৯৫২ সালে ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের হাত থেকে ত্রিহংসমূর্তি নির্মাণের জন্য পুরস্কার পান।

শিল্পশ্রী
১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত সারা বাংলা রবীন্দ্রমূর্তি নির্মাণ প্রতিযোগীতায় প্রথম স্থান অধিকার করে "শিল্পশ্রী' পুরস্কার তথা উপাধিতে ভূষিত হন |
যদিও শিল্পীর জীবনের শেষ অধ্যায় খুবই কষ্টের মধ্যে দিয়েই অতিবাহিত হয়েছিল। যে শিল্পীর হাতে গড়া শিল্পের আকর্ষণে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামতো, মৃত্যুর বছর দু'য়েক আগে ভাগ্যের চক্রে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর ডান হাত ও পা অসাড় হয়ে পড়ে। চলাফেরার একমাত্র সম্বল লাঠিটিকে পাশে রেখে মনের জোরে অশক্ত শরীরে চেয়ারে বসে তৈরি করেন তাঁর জীবনের শেষ কীর্তি স্বামী বিবেকানন্দের একটি মৃন্ময়ী মূর্তি | জীবনের শেষে কোনোরকম সরকারি আর্থিক সাহায্য, বা শিল্পী-ভাতা না পেয়ে অর্থনৈতিক সংকটের কালো ছায়া ক্রমশ গ্রাস করে বসে মহান শিল্পশ্রীকে। তাই জীবনের অপরাহ্নে আক্ষেপ করে তিনি বলেন,
এরপর অবশেষে দু'বছর রোগভোগের পর ১৯৯২ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি বহরমপুরের বড়কুঠি রোডের নিজস্ব "শিল্পশ্রী" বাসভবনে মহান এই ভাস্কর ও মৃৎশিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং রেখে যান তাঁর শিক্ষা ও সৃষ্টি | যার পরম্পরা পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র শিল্পী চন্দন পাল ও বর্তমানে পৌত্র অসীম পাল গর্বের সাথে বহন করে চলেছেন |












Click it and Unblock the Notifications