'ও আমার মতো, ঘুমায় না!' মোদীকে ভোরবেলা ট্রাম্পের ফোন করতে চাওয়ার অজানা কাহিনি শোনালেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত
বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় হল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পারস্পরিক সমীকরণ। সাধারণ কূটনৈতিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁদের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা বারবার আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ কেড়েছে। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের এই গভীর ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্পর্কের এক অজানা গল্প সামনে এসেছে।
ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর সম্প্রতি 'ইউএস-ইন্ডিয়া স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ ফোরাম' (USISPF) লিডারশিপ সামিটে এই মনোগ্রাহী ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ফ্লোরিডার মায়ামিতে একটি আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ (UFC) ইভেন্টের নেপথ্যে মঞ্চের পিছনে বসে হঠাৎই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ফোন করার কথা ভেবেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন রাষ্ট্রপতির এই স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত তাঁর গভীর বন্ধুত্বেরই প্রতিফলন।

রাষ্ট্রদূত গোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ট্রাম্পের এই আকস্মিক ইচ্ছার পর তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ট্রাম্পকে নিরস্ত করতে চেয়েছিলেন। গোর ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, এই মুহূর্তে ভারতে তখন ভোর ছ’টা বাজছে, তাই ফোন করার উপযুক্ত সময় নয়। কিন্তু ট্রাম্প তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। ট্রাম্প পাল্টা উত্তর দিয়ে বলেন যে, মোদী নিশ্চয়ই জেগে আছেন। ট্রাম্পের কথায়, "ও জেগে থাকবে, ও একদম আমার মতো, ও ঘুমায় না।"
তবে ঠিক সেই মুহূর্তে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অত্যন্ত দ্রুত মঞ্চে উঠতে হওয়ায় সেই ফোনালাপ আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পরদিন প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে কথা বলার। এই ঘটনার উল্লেখ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট করে দেন যে, যখন কারও সঙ্গে সত্যিকারের গভীর বন্ধুত্ব তৈরি হয়, তখন সব ক্ষেত্রে আগে থেকে সময় নির্ধারণ বা কঠোর নিয়ম মেনে চলার কড়াকড়ি থাকে না। ট্রাম্পের কাছে মোদী একজন বিশেষ বন্ধু।
আমেরিকার রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন, ট্রাম্প ভারতকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদায় রাখেন এবং প্রধানমন্ত্রী মোদীকে তাঁর অন্যতম সেরা বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করেন। এই বিশেষ সমীকরণটি ট্রাম্পের সঙ্গে অন্য অনেক বিশ্বনেতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে খাটে না। গোর বলেন, এমন অনেক বিশ্বনেতা আছেন যাঁদের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কড়া সময়সূচি অনুসরণ করতে হয়, কারণ তাঁদের মোদীর সমকক্ষ মনে করেন না ট্রাম্প।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম শাসনকাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর এই চমৎকার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ভারতের সঙ্গে ট্রাম্পের জড়িয়ে রয়েছে অজস্র উষ্ণ স্মৃতি। মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরও উল্লেখ করেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও তাঁর বিগত ভারত সফরের অভিজ্ঞতা ভীষণভাবে মনে রাখেন এবং প্রায়শই সেই সফরের গল্প করেন। ভবিষ্যতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আবারও ভারতে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী।
দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্কের এই খতিয়ানের পাশাপাশি মার্কিন রাষ্ট্রদূত দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একটি বড় খবর দিয়েছেন। তিনি জানান, বহু প্রতীক্ষিত ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তিটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর প্রায় ৯৯ শতাংশ কাজ ইতিবাচকভাবে শেষ হয়েছে এবং বাকি থাকা মাত্র ১ শতাংশ সম্পন্ন হলেই চুক্তিটির চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ করা হবে।
এই চুক্তি স্বাক্ষর হতে কেন এত দীর্ঘ সময় লাগছে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রদূত গোর বলেন, অনেকে প্রশ্ন করেন যে দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে কেন এই আলোচনা চলছে। বিষয়টি পরিষ্কার করতে তিনি একটি আন্তর্জাতিক তুলনা টেনে বলেন, ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে সময় লেগেছিল প্রায় ২০ বছর। সেই তুলনায় মাত্র দেড় বছরে ভারত ও আমেরিকার মধ্যেকার এই বাণিজ্যিক অগ্রগতি অসাধারণ।
রাষ্ট্রদূত আরও যোগ করেন যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটিকে অতি দ্রুত একটি সফল সমাপ্তির দিকে নিয়ে যেতে অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দীর্ঘদিনের এই জটিল বিষয়টির অবসান হলে দুই দেশের শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে নতুন জোয়ার আসবে বলে কূটনৈতিক মহলের বিশ্বাস। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শী নেতৃত্ব এই প্রক্রিয়াটিকে অনেকটাই মসৃণ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আমেরিকা ও ভারতের মধ্যের এই নিবিড় অংশীদারিত্ব কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্ব রাজনীতিতেও এক বড় ভারসাম্য বজায় রাখছে। গত বছরে প্রধানমন্ত্রী মোদীর মার্কিন সফর এবং তার পরবর্তী ঘটনাক্রম এটি প্রমাণ করে যে দুই দেশ প্রতিরক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং মহাকাশ গবেষণার মতো কৌশলগত ক্ষেত্রগুলিতে যৌথভাবে কাজ করতে অত্যন্ত আগ্রহী।
আগামী ডিসেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী মোদীর আবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সম্মেলনে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা। এর আগে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদী ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে তাঁদের পারস্পরিক রসায়নের বিষয়টি আরও একবার বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আগামী দিনে আরও দৃঢ় হতে চলেছে। এই ব্যক্তিগত রসায়ন দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গতিপথকে অনেক সহজ করে দেবে। ভারত এবং আমেরিকার এই পারস্পরিক সহযোগিতা বিশ্বের ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক ও সুদূরপ্রসারী বার্তা নিয়ে আসবে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা।












Click it and Unblock the Notifications