আদানি মামলার নয়া মোড়! কেন মার্কিন বিচারক মামলা খারিজের ব্যাখ্যা চাইছেন?
গৌতম আদানির বিরুদ্ধে আনা মার্কিন ফেডারেল মামলার ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ায় নিউইয়র্কের আদালতের সাম্প্রতিক পদক্ষেপটি মূলত একটি আইনি ও পদ্ধতিগত বিষয়। নিউইয়র্কের ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিচারক নিকোলাস গারাউফিস মার্কিন বিচার বিভাগের (ডিওজে) কাছে মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের সপক্ষে আরও স্পষ্ট এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন ফেডারেল বিচার প্রক্রিয়ায় এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি পদক্ষেপ এবং এর অর্থ এই নয় যে আদানির বিরুদ্ধে চলা মামলাটি পুনরায় গতি পেতে চলেছে।
আমেরিকার ফৌজদারি কার্যবিধির নিয়ম 'রুল ৪৮(এ)' অনুযায়ী, সরকারের বিচার বিভাগ নিজস্ব উদ্যোগে কোনও মামলা প্রত্যাহার করতে চাইলে আদালতের আনুষ্ঠানিক ও জুডিশিয়াল অনুমতির প্রয়োজন হয়। আদানির মামলা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ গত ১৮ মে একটি সংক্ষিপ্ত আবেদন পেশ করেছিল। কিন্তু বিচারপতি মন্তব্য করেছেন যে, ওই প্রাথমিক আবেদনে মামলাটি এত দ্রুত এবং সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করার পেছনে যথাযথ আইনি ও বাস্তব সম্মত যুক্তি সঠিকভাবে ব্যাখা করা হয়নি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী প্রসিদ্ধ এবং অভিজ্ঞ আইনজীবী ক্রিস ম্যান জানিয়েছেন, আদালতের এই নির্দেশটি পুরোপুরি আইনি পদ্ধতিগত এবং বিচারিক দায়বদ্ধতার অংশ। ফেডারেল আদালতের বিচারকদের পক্ষে মার্কিন প্রশাসনের নেওয়া কোনও মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করে সেই মামলা জোরপূর্বক চালু রাখার এক্তিয়ার অত্যন্ত সীমিত। মার্কিন শাসনতান্ত্রিক পরিকাঠামো অনুযায়ী, যেকোনও ফৌজদারি অপরাধের মামলা সচল রাখা বা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেশের নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকে।
মার্কিন আইনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, সরকারের প্রসিকিউটররা যখন কোনও মামলা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন ফেডারেল আদালত সেই সিদ্ধান্তকে সাধারণত চ্যালেঞ্জ করে না। বিচারক নিকোলাস গারাউফিস আগামী ১৩ জুলাই, ২০২৬ তারিখের মধ্যে বিচার বিভাগকে মামলা প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট কারণগুলি সংবলিত একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন পেশ করতে বলেছেন। আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মামলাটি কোনো দীর্ঘ শুনানি ছাড়াই সম্পূর্ণভাবে খারিজ বা ডিসমিস হয়ে যাবে।
এর আগে নিউইয়র্কের মেয়র এরিক অ্যাডামসের দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলাতেও প্রায় একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেখানেও বিচার বিভাগ মামলা প্রত্যাহারের আবেদন জানালে আদালত অতিরিক্ত ব্যাখ্যা দাবি করে এবং শুনানির ব্যবস্থা করে। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে বিচার বিভাগ বিচারকের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দেওয়ার পর মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। আদানির ক্ষেত্রেও এই একই আইনি ধারা অনুসরণ করা হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
আদানি গোষ্ঠীর অবলিগেশন ও বন্ড সংক্রান্ত এই দীর্ঘ বিতর্কে সংস্থার আইনি দল ২০২৬ সালের ২৪ জুন আদালতে একটি দীর্ঘ জবাব পেশ করে। সেখানে মূল যুক্তি হিসেবে মার্কিন আদালতের এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আদানির আইনজীবীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনগুলি সম্পূর্ণভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে সংগঠিত হয়েছিল এবং এই বন্ড ইস্যু ও ঋণ গ্রহণের নথিপত্রগুলি ব্রিটিশ আইনের আওতায় পরিচালিত।
বিচারকের সামনে উপস্থাপিত নথিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের 'মরিসন বনাম ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংক' মামলার দৃষ্টান্ত টেনে আদানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সিকিউরিটিজ আইন কোনো বহির্দেশীয় আর্থিক লেনদেনের ওপর প্রয়োগ করা যায় না। আদানির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, অভিযোগপত্রে উল্লিখিত অর্থপ্রদানের বিষয়টি মূলত ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে উৎসাহিত করতে দেওয়া বাণিজ্যিক ছাড় ছিল, কোনো বেআইনি ঘুষ নয়।
মার্কিন বিচার বিভাগ এই মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে আসার পেছনে দীর্ঘ কয়েক মাসের নথি ও প্রমাণ পরীক্ষা করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে আদানির আইনজীবীরা প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার বিচার বিভাগীয় যুক্তিপত্র, বিশেষজ্ঞ মতামত ও প্রতিবেদন পেশ করেন। এর মধ্যে হার্ভার্ড ল স্কুলের অধ্যাপক এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) প্রাক্তন কর্মকর্তাদের মূল্যবান পর্যবেক্ষণযুক্ত ১১৮ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত আইনি নথিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আদানির ডিফেন্স টিমের দেওয়া অন্যতম বড় যুক্তি হল, অভিযোগপত্রে উল্লিখিত চারটি প্রধান লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনও মার্কিন বিনিয়োগকারীর কোনো ধরনের ক্ষতি হয়নি। যে বন্ড ও লোনের ওপর ভিত্তি করে জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছিল, সেগুলি সম্পূর্ণরূপে পরিশোধিত বা তাদের কিস্তি নিয়মিতভাবে দেওয়া হচ্ছে। মার্কিন জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এই প্রতিটি বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং আদানির দাখিল করা প্রমাণাদি যাচাই করেই মামলা খারিজ করতে সম্মত হয়েছে।
এই লেনদেনগুলির বাস্তব পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য আদানির আইনজীবী দল আদালতে বন্ড এবং কর্জের বর্তমান খতিয়ান বিস্তারিত আকারে দাখিল করেছে। এই তথ্যগুলি নীচে দেওয়া হল।
| লেনদেনের ধরন | বর্তমান পরিস্থিতি (২০২৬ অনুযায়ী) |
|---|---|
| ২০২১ সালের বন্ড ইস্যু | বন্ডের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে এবং সমস্ত সুদের টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। |
| ২০২৪ সালের বন্ড ইস্যু | কোনও কিস্তি খেলাপি হয়নি, নিয়মিত অর্থ প্রদান চলছে। |
| ২০২১ সালের লোন (ঋণ) | সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ এবং অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে। |
| ২০২৩ সালের লোন (ঋণ) | নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ চলছে, সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। |
মার্কিন জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট আগামী ১৩ জুলাই বিচারকের প্রশ্নের উত্তর সংবলিত চূড়ান্ত ফাইল উপস্থাপন করার পর, ব্রুকলিনের আদালত মামলা খারিজের আবেদন নিষ্পত্তি করবে। বিচারিক ব্যবস্থার পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা ও আইনি অগ্রাধিকারের ওপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞরা একপ্রকার নিশ্চিত যে, প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা পাওয়ার পরই আদালত ভারতের শীর্ষ শিল্পপতি গৌতম আদানির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে খারিজ করে দেবে এবং এর মাধ্যমে এই হাই-প্রোফাইল মামলার চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটবে।












Click it and Unblock the Notifications