৪৪ বছরের অজেয় দুর্গ ধসে পড়ল বোস্টনে, বিশ্বকাপে জার্মানির প্রথম পেনাল্টি হার! শেষ ১৬-য় প্যারাগুয়ে
ফুটবল ইতিহাসে জার্মানির পেনাল্টি শুটআউট বা টাইব্রেকার ছিল এক অভেদ্য দুর্গের মতো। গ্যারি লিনেকারের সেই বিখ্যাত উক্তি—"ফুটবল একটি সহজ খেলা, যেখানে ২২ জন খেলোয়াড় ৯০ মিনিট ধরে একটি বলের পিছনে দৌড়য় এবং দিনশেষে জার্মানরাই জেতে"—যেন টাইব্রেকারের ক্ষেত্রে আরও বেশি সত্যি ছিল। কিন্তু এদিন বোস্টন স্টেডিয়ামে ঘটল সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা, যা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এক মিথের অবসান ঘটাল।
ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে গেল চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। নির্ধারিত ১২০ মিনিটের খেলা ১-১ গোলে ড্র থাকার পর ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে। সেখানেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এবং শক্তিশালী রেকর্ডের পতন ঘটল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম পেনাল্টি শুটআউটে পরাজয়ের স্বাদ পেল জার্মানি।

বিশ্বকাপে জার্মানির টাইব্রেকার মানেই ছিল প্রতিপক্ষের অবধারিত পরাজয়। গত ৪৪ বছর ধরে এই ধারা বজায় রেখেছিল তারা। ১৯৮২ সালের স্পিন বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সেই বিখ্যাত সেমিফাইনাল দিয়ে শুরু হয়েছিল জার্মানির এই জয়যাত্রা। সেবার অতিরিক্ত সময়ের পর ম্যাচ ৩-৩ গোলে ড্র হলে টাইব্রেকারে জার্মানি ৫-৪ ব্যবধানে জয়ী হয়। ওই ম্যাচে উলি স্টিলিকের নেওয়া শটটি ফরাসি গোলরক্ষক আটকে দিয়েছিলেন, যা ছিল গত চার দশকে বিশ্বকাপে কোনও জার্মান খেলোয়াড়ের একমাত্র মিস।
এরপর প্রতিটি পেনাল্টি শুটআউটেই নিখুঁত নিশানা বজায় রেখেছে জার্মানি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে স্বাগতিক মেক্সিকোকে ৪-১ ব্যবধানে, ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ৪-৩ ব্যবধানে এবং সবশেষ ২০০৬ সালে ঘরের মাঠে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৪-২ ব্যবধানে টাইব্রেকার জিতেছিল তারা। ১৯৮২ সালের সেই একটি মাত্র মিস বাদ দিলে, ২০২৬ সালের এই ম্যাচের আগে বিশ্বকাপে নেওয়া জার্মানির প্রতিটি পেনাল্টি শটই জালে জড়িয়েছিল।
বিশ্বকাপের মঞ্চে পেনাল্টি শুটআউটে জার্মানি কতটা প্রভাবশালী ছিল, তা তাদের অতীতের রেকর্ড বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। ১৯৮২ সাল থেকে শুরু হওয়া তাদের এই ঐতিহাসিক যাত্রার জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যানটি নিচে রইল।
| সাল | প্রতিপক্ষ | ফল (টাইব্রেকার) | ম্যাচের পর্যায় |
|---|---|---|---|
| ১৯৮২ | ফ্রান্স | ৫-৪ (জয়) | সেমিফাইনাল |
| ১৯৮৬ | মেক্সিকো | ৪-১ (জয়) | কোয়ার্টার ফাইনাল |
| ১৯৯০ | ইংল্যান্ড | ৪-৩ (জয়) | সেমিফাইনাল |
| ২০০৬ | আর্জেন্টিনা | ৪-২ (জয়) | কোয়ার্টার ফাইনাল |
| ২০২৬ | প্যারাগুয়ে | ৩-৪ (পরাজয়) | শেষ ৩২ |
প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে ছিল হুলিয়ান নাগেলসম্যানের শিষ্যরা। পুরো ম্যাচে ৭৫ শতাংশ সময় বল নিজেদের দখলে রেখেছিল জার্মানি। ৯২ শতাংশ নিখুঁত পাসে মোট ৭৫৩টি পাস খেলেছিল তারা। প্যারাগুয়ের সাতটি শটের বিপরীতে জার্মানরা নিয়েছিল ২১টি শট। কিন্তু প্যারাগুয়ের জমাট রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স বারবার হতাশ করেছে জার্মানির আক্রমণভাগকে।
ম্যাচের ৪২ মিনিটে মাতিয়াস গালারজার ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে প্যারাগুয়েকে এগিয়ে নেন হুলিও এনসিসো। পিছিয়ে পড়ে আক্রমণের ধার বাড়ায় জার্মানি। অবশেষে ৫৪ মিনিটে কাই হাভার্টজের চমৎকার হেডে সমতা ফেরায় তারা। অতিরিক্ত সময়ে ১০২ মিনিটে কর্নার থেকে জোনাথন তা ডেডলক ভেঙে প্যারাগুয়ের জালে বল জড়ালেও ভিএআর প্রযুক্তির সাহায্যে রেফারি গোলটি বাতিল করেন। রেফারি জানান, গোলরক্ষক গিলকে অবৈধভাবে বাধা দিয়েছিলেন ভালদেমার আন্তন।
১২০ মিনিটের লড়াই শেষে অতিরিক্ত সময়েও সমতা না ভাঙায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। আর সেখানেই মুখ থুবড়ে পড়ে জার্মানির এত বছরের অহংকার। প্রথম শট নিতে এসে জার্মানির কাই হাভার্টজের শট রুখে দেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক গিল। এরপর প্যারাগুয়ের মাউরিসিও গোল করতে ভুল করেননি। জোশুয়া কিমিচ, জামাল মুসিয়ালা এবং নাদিয়েম আমিরি জার্মানির পক্ষে গোল করলেও নিক ভোল্টমেডের শট আবারো আটকে দেন গিল।
সাডেন ডেথে জোনাথন তা গোল করতে ব্যর্থ হওয়ার পর প্যারাগুয়ের হোসে কানালে ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে দেন। ৪-৩ ব্যবধানে প্যারাগুয়ের জয় নিশ্চিত হতেই মাঠ জুড়ে শুরু হয় বুনো উদযাপন। অন্যদিকে স্তব্ধ হয়ে মাঠেই বসে পড়েন জার্মান ফুটবলাররা। এই হারের মাধ্যমে জার্মানির নিখুঁত পাঁচ ম্যাচে পাঁচ জয়ের স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গেল, যেখানে তাদের বিশ্ব রেকর্ড এখন চার জয় ও এক পরাজয়ের খতিয়ানে গিয়ে ঠেকল।
পরাজয় সত্ত্বেও পেনাল্টি স্পট থেকে জার্মানির সামগ্রিক পরিসংখ্যান এখনও বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা। বিশ্বকাপে পাঁচবার টাইব্রেকারে অংশ নিয়ে মোট ২৪টি পেনাল্টি শট নিয়েছে জার্মান ফুটবলাররা, যার মধ্যে ২০টিই সফল হয়েছে। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে এই এক ম্যাচেই তাঁরা তিনটি মিস করেছে, যা তাদের ইতিহাসের অন্য সব পেনাল্টি শুটআউটের চেয়ে বেশি। অন্যদিকে জার্মান গোলরক্ষকদের পারফরম্যান্সও প্রশংসনীয়। ২৪টি প্রতিপক্ষ পেনাল্টটির মধ্যে তারা দশটি শট রুখতে ভূমিকা রেখেছেন।
অন্যদিকে, এই লড়াই জিতে প্যারাগুয়ে বিশ্বকাপে তাদের নিজেদের একটি অনন্য রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রাখল। বিশ্বকাপে খেলা যেকোনও পেনাল্টি শুটআউটে এখন পর্যন্ত অপরাজিত রয়েছে এই লাতিন আমেরিকান দলটি। এর আগে ২০১০ সালের বিশ্বকাপে জাপানের বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে ৫-৩ ব্যবধানে জিতে ইতিহাস গড়েছিল তারা। জার্মানিকে হারিয়ে এখন বিশ্বকাপে দুটি টাইব্রেকারের দুটিতেই জয়ের শতভাগ রেকর্ড ধরে রাখল প্যারাগুয়ে, যা ক্রোয়েশিয়া ছাড়া আর খুব কম দেশেরই রয়েছে।
জার্মানির জন্য এই বিদায় শুধুমাত্র একটি টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়া নয়। এটি এমন এক মানসিক শ্রেষ্ঠত্বের অবসান, যা কয়েক দশক ধরে বিশ্বের যেকোনো প্রতিপক্ষের মনে ভীতি ছড়াত। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে যে মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা জার্মান খেলোয়াড়েরা পেয়ে আসছিলেন, তা বোস্টনের মাঠে এসে বিলীন হয়ে গেল। এই ম্যাচ আবারও প্রমাণ করল, ফুটবলের দীর্ঘতম ও গৌরবময় রেকর্ডও একদিন না একদিন ভেঙে যায়।












Click it and Unblock the Notifications