নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে শেষ ১৬-য় মরক্কো, বিশ্বকাপে আরও এক অঘটন!
ফুটবল বিশ্বকাপের মহানাটকীয় মঞ্চে আরও একটি অবিশ্বাস্য রূপকথা লিখল মরক্কো। ২০২৬ বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে শেষ ১৬-তে নিজেদের জায়গা পাকা করে নিল অ্যাটলাস লায়ন্সরা। মেক্সিকোর মনটেরির স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ডাচদের টাইব্রেকারে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়েছে মরক্কো। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে নির্ধারিত হয় এই ম্যাচের ভাগ্য।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে মেতে উঠেছিল। নেদারল্যান্ডসের পক্ষে তারকা স্ট্রাইকার কোডি গাকপো গোল করে দলকে এগিয়ে দিলেও, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায় মরক্কো। ম্যাচের একেবারে শেষ লগ্নে, ইনজুরি টাইমে ইসা দিওপের অসাধারণ গোলে সমতায় ফেরে মরক্কো। এরপর অতিরিক্ত সময়ে কোনও গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে, যেখানে শেষ হাসি হাসে মরক্কোই।

ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের ফুটবলারদের মধ্যে বারুদ ঠাসা ফুটবলের ইঙ্গিত মিলছিল। ডাচরা শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক কৌশল বেছে নিয়ে মরক্কোর রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ম্যাচের শুরুর দিকেই কোডি গাকপো নেদারল্যান্ডসকে লিড এনে দেন। গাকপোর চোখধাঁধানো ফিনিশিংয়ে ডাচ গ্যালারি যখন উৎসবে মেতে উঠেছিল, তখন মরক্কো শিবিরে সাময়িক নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
গোল হজম করার পর অবশ্য মরক্কো খুব দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নেয়। তারা মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং একের পর এক ধারালো আক্রমণ শানাতে শুরু করে। কিন্তু প্রথমার্ধে ডাচদের রক্ষণভাগ শক্ত হাতে প্রতিহত করে সব আক্রমণ। নেদারল্যান্ডসও ব্যবধান বাড়ানোর জন্য বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেছিল, তবে মরক্কোর গোলরক্ষক তা দারুণভাবে নস্যাৎ করে দেন।
মরক্কোর মধ্যমাঠের খেলোয়াড়রা অত্যন্ত চতুরতার সাথে ছোট ছোট পাসে আক্রমণ তৈরির চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ডাচ ডিফেন্ডারদের কড়া মার্কিংয়ের কারণে পেনাল্টি বক্সের ভেতরে বল নিয়ে ঢোকা কঠিন হয়ে পড়ছিল। ডাচ ফুটবলের প্রথাগত পাওয়ার ফুটবল এবং মরক্কোর ডিফেন্সিভ ট্যাকটিকসের এই লড়াই মাঠে উপস্থিত হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমীকে বেশ আনন্দ দিচ্ছিল। প্রথমার্ধ শেষ হয় নেদারল্যান্ডসের ১-০ ব্যবধানে আধিপত্য দিয়ে।
দ্বিতীয়ার্ধে মরক্কো সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে। মরক্কোর কোচ বেশ কয়েকটি কৌশলগত পরিবর্তন আনেন, যা তাদের খেলায় আরও বেশি গতি এনে দেয়। তবে ডাচ রক্ষণভাগের দৃঢ়তা এবং গোলরক্ষকের চমৎকার নৈপুণ্য মরক্কোকে বারবার গোলবঞ্চিত করছিল। ম্যাচের সময় যতই গড়াচ্ছিল, মাঠের বাইরে থাকা ডাচ ফুটবলার ও সমর্থকদের মনে হচ্ছিল জয় কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
কিন্তু ফুটবলের রোমাঞ্চ যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চলে, তা আরও একবার প্রমাণিত হলো মেক্সিকোর মাটিতে। ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হয়ে যখন যোগ করা সময়ের (স্টপেজ টাইম) খেলা চলছিল, ঠিক তখনই একটি কর্নার পায় মরক্কো। উড়ে আসা নিখুঁত ক্রসে অসাধারণ এক হেডে বল নেদারল্যান্ডসের জালে জড়িয়ে দেন ডিফেন্ডার ইসা দিওপ, যা ডাচদের হতভম্ব করে দেয়।
অবিশ্বাস্য এই গোলের পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। নাটকীয়ভাবে সমতায় ফেরা মরক্কো অতিরিক্ত সময়ে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলতে থাকে। অন্যদিকে শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়া ডাচরা নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করে। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে দুই দলই সাবধানে খেলে বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও আর গোল করতে পারেনি কোনো পক্ষই।
ম্যাচের ১২০ মিনিট শেষে স্কোরলাইন ১-১ থাকায় ফুটবলের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং স্নায়ুক্ষয়ী অধ্যায় টাইব্রেকারে গড়ায় খেলা। পেনাল্টি শুটআউট মানেই ভাগ্যের খেলা এবং চরম মানসিক চাপ সহ্য করার কঠিন পরীক্ষা। দুই দলের গোলরক্ষকই নিজের দেশের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখাতে চূড়ান্ত ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছিলেন। মাঠের ভেতরের উত্তেজনা তখন স্টেডিয়াম গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল চরমভাবে।
পেনাল্টি শুটআউটে দুই দলের ফুটবলাররাই স্নায়ুর চাপে ভুল করতে থাকেন। বেশ কয়েকটি সেভ এবং মিসের পর টাইব্রেকারের টানটান উত্তেজনা তুঙ্গে পৌঁছায়। স্নায়ুর এই ভয়াবহ লড়াইয়ে মরক্কোর গোলরক্ষক তার অসাধারণ প্রতিভা প্রদর্শন করেন। ডাচদের শট রুখে দিয়ে তিনি মরক্কোকে জয়ের খুব কাছে নিয়ে যান। পুরো স্টেডিয়াম তখন নিঃশব্দে পরবর্তী মুহূর্তের দেখার অপেক্ষায় ছিল।
অবশেষে মরক্কোর পক্ষে ভাগ্য নির্ধারণী চূড়ান্ত শটটি নিতে আসেন তারকা তরুণ ফরোয়ার্ড ইসমায়েল সাইবারি। কোটি কোটি মানুষের চোখ তখন আটকে ছিল টেলিভিশনের পর্দায়। অবিশ্বাস্যভাবে সব চাপ দূরে ঠেলে দিয়ে সাইবারি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ডাচ গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান। এর সাথেই ৩-২ ব্যবধানে টাইব্রেকার নিশ্চিত করে বুনো উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো মরক্কো দল।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফুটবল খেলে সেমিফাইনালে পৌঁছে রূপকথা সৃষ্টি করেছিল মরক্কো। তারা যে কোনো আকস্মিক দল নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের নতুন পরাশক্তি, তা ডাচদের বিদায় করে আরও একবার প্রমাণ করল মরক্কো. আফ্রিকান এই দলটির সংহতি, হার না মানা মানসিকতা এবং লড়াকু ফুটবলই তাদের আজ বৈশ্বিক ফুটবলে অন্যতম জনপ্রিয় দলে পরিণত করেছে।
ডাচদের বিদায় করার পর শেষ ১৬ বা প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কো মুখোমুখি হবে শক্তিশালী কানাডার। উত্তর আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী এই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নামার আগে মরক্কো যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। আফ্রিকান সিংহদের ডাচ বধের এই ঐতিহাসিক জয় অবশ্যই তাদের পরবর্তী লড়াইয়ে বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগাবে। বিশ্বজুড়ে মরক্কোর ফুটবলপ্রেমী সমর্থকেরা এখন নতুন এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
ডাচ বধের এই ঐতিহাসিক জয় কেবল মরক্কো ফুটবলকেই সমৃদ্ধ করবে না, বরং বিশ্ব ফুটবলে আফ্রিকান দেশগুলোর আধিপত্যকে আরও সুদৃঢ় করবে। শেষ ১৬-র লড়াইয়ে নামার আগে মরক্কো এখন আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে। ফুটবলপ্রেমীরা এখন মুখিয়ে আছেন দেখার জন্য যে, মেক্সিকোর মাটিতে মরক্কোর এই জয়যাত্রা ঠিক কতদূর পর্যন্ত এগিয়ে যায় এবং তারা ফের নতুন কোনও ইতিহাস গড়তে পারে কি না।












Click it and Unblock the Notifications