হরমুজ প্রণালী এবার ট্রাম্পের কবজায়? ইরানকে রুখতে কী পরিকল্পনা মার্কিন প্রেসিডেন্টের?
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। এরই মধ্যে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে নতুন বিতর্ক উসকে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবার নিজেদের হাতে নিতে চলেছে আমেরিকা। শুধু তাই নয়, এই আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথ সুরক্ষিত রাখার বিনিময়ে ওয়াশিংটনের বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত বলেও দাবি করেছেন তিনি।
ট্রাম্প মার্কিন প্রশাসনকে এই জলপথের রক্ষাকর্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, মার্কিন বাহিনী এই প্রণালীটি পরিচালনা করবে এবং এর নতুন নাম দেবে 'গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল অব দ্য স্ট্রেট’। ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন পারস্য উপসাগরে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে তীব্র সামরিক সংঘাত চলছে। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে পারষ্পরিক দাবি-পাল্টা দাবি তুঙ্গে উঠেছে।

পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই, এই রুটে যেকোনও ধরনের সামরিক অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যায়। ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন সেনার পাহারার কারণেই এতদিন এই রুট নিরাপদ ছিল, তাই বিশ্ববাসীর উচিত এর খরচ মেটানো।
ইরানের পক্ষ থেকে অবশ্য ট্রাম্পের এই পরিকল্পনাকে সরাসরি খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। তেহরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড সাফ জানিয়ে দিয়েছে, রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে মার্কিন হস্তক্ষেপ কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। অনুমতি ছাড়া কোনও মার্কিন যুদ্ধজাহাজ বা সেনাদল হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার চেষ্টা করলে তাদের কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
ইরান একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলিকেও মার্কিন বাহিনীর পাশে না দাঁড়াতে সতর্ক করেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনও ধরনের সামরিক বা কৌশলগত সহযোগিতা সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা বলে গণ্য করা হবে। এই সংঘাত যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে, তবে তার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী থাকবে আমেরিকা এবং তার মিত্র দেশগুলি। এই হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যেখানে মার্কিন ও ইরানি বাহিনী একে অপরের ওপর দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনা টেবিলে ইরানের মনোভাব নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি তেহরানকে একহাত নিয়ে বলেন যে, তারা বারবার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে। ট্রাম্পের কথায়, "ওরা পেশাদার আলোচক ছাড়া আর কিছুই নয়।" তিনি বিগত মার্কিন প্রশাসনগুলিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে অভিযোগ করেন যে, বারাক ওবামা, জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং বিল ক্লিনটনের মতো প্রাক্তন প্রেসিডেন্টরা ইরানের শক্তি বাড়াতে পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছেন।
বিশেষ করে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক ইরান পরমাণু চুক্তির কঠোর সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি এই চুক্তিকে আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম নিকৃষ্ট চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তি ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে থামানোর বদলে তাদের আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল। উল্লেখ্য, নিজের প্রথম টার্মেই ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে আমেরিকাকে বের করে নিয়ে এসেছিলেন এবং ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ থাকার কারণে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলি যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লড়াই করছে, তখন এই নতুন জ্বালানি সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে বড়সড় ধাক্কা দিতে পারে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের এই অনড় অবস্থান এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই বড় চিন্তার বিষয়।












Click it and Unblock the Notifications