ব্যাংককে পাবে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড! মৃত্যু অন্তত ২৭ জনের, থাইল্যান্ডে শোকের ছায়া!
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পাবে এদিন সোমবার ভোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের জেরে থাইল্যান্ডে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার ব্যাপকতায় এবং ক্ষয়ক্ষতি দেখে হতবাক স্থানীয় বাসিন্দারা। দমকল বাহিনী ও উদ্ধারকারীরা দ্রুত ব্যবস্থা নিলেও আগুনের তীব্রতা এবং মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো ভবনটি ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়ার কারণে হতাহতের সংখ্যা এত বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে অনেকের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।
স্থানীয় পুলিশ এবং দুর্যোগ মোকাবিলা দল সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তর ব্যাংককের 'না লাডপ্রাও' (Na Ladprao) নামক একটি ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় পাবে স্থানীয় সময় রাত বারোটার কিছু পরেই এই বিপর্যয় ঘটে। সেই সময় পাবটিতে প্রচুর তরুণ-তরুণী এবং পর্যটকদের ভিড় ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আগুন ও ধোঁয়া এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে ভিতরে থাকা সাধারণ মানুষের পক্ষে বের হওয়ার ন্যূনতম সুযোগও মেলেনি। প্রথম উদ্ধারকারী দল মাঝরাতের পরপরই দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথে উদ্ধারকাজ শুরু করে।

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল সোমবার নিজেই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দুর্ঘটনাস্থলটি স্বচক্ষে পরিদর্শনে যান এবং সার্বিক পরিস্থিতির তদারকি করেন। তিনি সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে জানান, পাবের মূল মঞ্চের পিছনে থাকা একটি বৈদ্যুতিক সার্কিট ব্রেকার থেকে প্রথমে ধোঁয়া নির্গত হতে দেখা গিয়েছিল। সে সময় মঞ্চে পারফর্ম করা সঙ্গীতশিল্পীরা বিষয়টি লক্ষ্য করেন। তারা ধোঁয়া দেখতে পাওয়ার প্রায় সাথেই সাথেই পাবের সমগ্র বিদ্যুৎ সংযোগ আকস্মিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং চারপাশ অন্ধকারে ডুবে যায়।
মঞ্চের পারফর্মারদের মতে, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরমুহূর্তেই সেখানে একটি প্রচণ্ড জোরে বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিটিপুন্ট এই বিষয়ে বিশদ বিবরণ দিয়ে বলেছেন যে, পাবের ছাদ ও ভিতরের সাজসজ্জার জন্য ব্যবহৃত সিলিং ডেকোরেশন সামগ্রীগুলো অত্যন্ত দাহ্য প্রকৃতির ছিল। এর ফলেই আগুন লাগার সাথে সাথে তা পুরো ভবনকে গ্রাস করে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো পাবটি ক্ষতিকারক কার্বন মনোক্সাইড এবং বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ভরে যায়।
এই তীব্র বিষাক্ত ধোঁয়া ফুসফুসে প্রবেশ করার কারণেই সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলে চিকিৎসকদের প্রাথমিক রিপোর্টে জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল উল্লেখ করেছেন যে, বেশিরভাগ মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে পাবের পিছনের অংশে অবস্থিত গণশৌচাগার বা ওয়াশরুমের কাছ থেকে। আগুন এবং দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য ধোঁয়া থেকে রেহাই পেতে এবং নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে ভুক্তভোগীরা হয়তো ওই কোণঠাসা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। তীব্র দমবন্ধ করা ধোঁয়া তাঁদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।
দমকল বাহিনীর কর্মীরা প্রায় আধ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অবিরাম লড়াই করে অবশেষে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। কিন্তু ততক্ষণে পাবের ভিতরের সমস্ত পরিকাঠামো ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও চিত্রে দেখা গিয়েছে, আগুনের শিখা প্রধান দরজা দিয়ে আছড়ে পড়ছে এবং ভয়াবহ কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশকে ঢেকে ফেলেছে। ঘটনার পর পর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ৬৩ জন আহত মানুষকে নিয়ে যাওয়া হয়, যাদের মধ্যে ২২ জনের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর ও সংকটজনক।
ব্যাংককের এই অতি সংবেদনশীল নাইটক্লাব ট্র্যাজেডি থাইল্যান্ডের বিনোদন কেন্দ্রগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আরও একবার বিশ্ববাসীর সামনে উদঘাটিত করে দিল। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে থাইল্যান্ডে ঘটে যাওয়া অন্যতম সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ড এটি, যা দেশের পর্যটন ও বিনোদন মহলে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। এর আগেও থাইল্যান্ডে এই ধরনের ভয়াবহ বিপর্যয় মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। দেশের পুরোনো নিরাপত্তা ত্রুটিগুলো নিয়ে নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক মহলে এখন জোরদার আলোচনা শুরু হয়েছে।
২০২২ সালে পূর্ব থাইল্যান্ডের একটি পাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৪ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছিলেন এবং অনেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভুগেছেন। আর থাইল্যান্ডের ইতিহাসে অন্যতম নিকৃষ্ট নাইটক্লাব ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে ২০০৯ সালের ইংরেজি নববর্ষের রাতের ঘটনাটি। ব্যাংককের সান্তিকা নাইটক্লাবে নববর্ষের জমকালো পার্টি চলাকালীন ঘরের ভেতরের আতসবাজি প্রদর্শনীর সময় আগুন লেগে ৬৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল এবং প্রায় দুই শতাধিক মানুষ ভয়াবহভাবে জখম হয়েছিলেন।












Click it and Unblock the Notifications