মাঝ নদীতে পড়ে যাওয়া শিশুকে ফেলে চলে গেল লঞ্চ, উদ্ধার করলেন জেলেরা

পটুয়াখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া একটি লঞ্চ থেকে মাঝ নদীতে পড়ে যায় শিশুটি। পরে স্থানীয় জেলেরা নদী থেকে তাকে উদ্ধার করেন।

বাংলাদেশে চলন্ত লঞ্চ থেকে একটি শিশু মাঝ নদীতে পড়ে যাবার অনেক পরে স্থানীয় জেলেরা নদী থেকে তাকে উদ্ধার করেছেন। তার অভিযোগ, তাকে উদ্ধারের কোন চেষ্টা না করেই লঞ্চটি চলে যায়।

ঘটনাটি ঘটেছে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার আগুনমুখা নদীতে। বিকেল তিনটে নাগাদ রওনা দিয়ে পটুয়াখালী থেকে ঢাকা যাচ্ছিল জাহিদ-৩ নামের লঞ্চটি।

নদীতে পড়ে যাওয়া ১২ বছরের শিশুটির নাম মোঃ ওসমান গনি, বাড়ি শরিয়তপুর । সে লঞ্চটির রান্নাঘরে বাবুর্চির সহকারী হিসেবে কাজ করতো।

যাত্রা শুরুর ঘণ্টাখানেক পর লঞ্চটি গলাচিপা উপজেলার কাঁকড়ার চরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর ওসমান গনি লঞ্চের পেছনদিকে গোসল করার সময় হঠাৎ মাঝ নদীতে পড়ে যায়।

তার অভিযোগ, লঞ্চটি তাকে পানি থেকে তোলার জন্য থামেনি এবং তাকে ফেলেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় জাহিদ-৩।

তবে লঞ্চটির সুপারভাইজার বিবিসিকে বলেন, তাদের একজন কর্মী যে নদীতে পড়ে গেছে সে খবর তারা পেয়েছেন ঘণ্টাখানেক পর।

আগুনমুখার পানিতে হাবুডুবু

টেলিফোনে কথা হচ্ছিল মোঃ ওসমান গনির সাথে। তার গায়ে জ্বর এসেছে, কণ্ঠস্বর দুর্বল শোনাচ্ছিল।

"লঞ্চের পেছন দিকে যেখান থেকে পানি তোলে ওইখানে গোসল করছিলাম" - ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ওসমান গনি বলছিল, "বালতি দিয়ে পানি তুলছিলাম, বালতিটা ছিল দড়ি দিয়ে বাঁধা, আর আমার হাতে দড়িটা পেঁচানো - যাতে বালতি ভেসে না যায়।"

"হঠাৎ বালতিটা স্রোতের টানে ওজন হয়ে গেল, দুরে চলে গেল আর আমি বালতির সাথে এক টানে পানিতে পড়ে গেলাম" - কাঁপা কাঁপা গলায় বলছিল ওসমান গনি।

লঞ্চের পেছনে থাকা প্রপেলারের কারণে পানির স্রোত আর দ্রুতগামী দোতলা লঞ্চের তৈরি বড় ঢেউয়ের মধ্যে হাবুডুবু খেতে থাকে সে।

ওসমান গনি অভিযোগ করে যে লঞ্চের বাবুর্চি - যার সে সহকারী ছিল - এবং আরও একজন তাতে পড়ে যেতে দেখেছে।

"তারা নিজেরা কথা বলাবলি করছিল, কিন্তু কিছু করতে দেখি নাই" - বলছিল সে।

ওসমান গনি জানায়, সে সাঁতার কাটতে পারে - কিন্তু এভাবে পড়ে যাওয়া এবং স্রোতের কারণে ভালোভাবে সাঁতরাতে পারছিল না।

লঞ্চ
Getty Images
লঞ্চ

সাধারণত এমন ঘটনা ঘটলে পরিচিতদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে যাওয়ার কথা। কিন্তু তার অভিযোগ, "আমি ভেসে থাকতে পারছি না। হাবুডুবু খাচ্ছি আর দেখতে পাচ্ছি যে লঞ্চটা চলে যাচ্ছে।"

যে বালতির কারণে সে নদীতে পড়ে গেছে - সেটাকেই উপুড় করে ধরে সে ভেসে থাকার চেষ্টা করে অনেকক্ষণ।

চার ভাইয়ের মধ্যে সবচাইতে ছোট ওসমান গনি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছে। মাসখানেক আগে সে জাহিদ-৩ নামের লঞ্চটিতে বাবুর্চির সহকারী হিসেবে কাজ নেয়। থাকা, খাওয়া, ঘুম সবই লঞ্চের মধ্যেই।

কি সমস্যার কারণে পালিয়ে এসেছে জানতে চাইলে সে বলে, "আমার লেখাপড়া করতে ভালো লাগে না।"

যেভাবে উদ্ধার হলো

কতক্ষণ নদীতে ভেসে ছিল মনে করতে পারেনি ওসমান গনি। তবে সে বলছে, মৃত্যুর সাথে আজ সাক্ষাত হবে এমনটাই মনে হয়েছিল তার।

তাকে উদ্ধার করেন নিকটবর্তী একটি মাছধরা নৌকার জেলে, গলাচিপার পানপট্টি ইউনিয়নের চুলারাম গ্রামের মোঃ জুয়েল ইসলাম।

জুয়েল ইসলামের সাথে যখন কথা হয় - তখন তার কণ্ঠস্বরও দুর্বল শোনাচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, স্রোতের বিপরীতে কুড়ি মিনিটের মতো সাঁতার কেটে ওসমান গনিকে উদ্ধার করতে গিয়ে তিনি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

জুয়েল ইসলাম বলেন, "আমরা নদীতে জাল পেতেছিলাম। সেই জাল তোলার যখন সময় হয়েছে তখন জাল তোলার জন্য টানতেছি। হঠাৎ খুব নিচু কিন্তু মানুষের ডাক শুনতে পেলাম। চারদিকে তাকাই, ডাক শুনি - কিন্তু কাউকে দেখি না।"

"কিছুক্ষণ পর আবার শুনি কেউ ক্ষীণ স্বরে ডাকতেছে। তখন খুব মনোযোগ দিলাম। দেখি দুরে কালো ফুটবলের মতো একটা মাথা ভেসে আছে। সেদিক থেকেই শব্দটা আসতেছে।"

ইংরেজির 'ফেরি বোট' বাংলায় কীভাবে 'লঞ্চ' হলো?

লঞ্চে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন, কী বলছে মালিক ও কর্তৃপক্ষ?

লঞ্চে নানা ত্রুটি আর অব্যবস্থাপনায় নৌযাত্রা কতটা নিরাপদ আছে?

মাছ ধরা নৌকা।
Getty Images
মাছ ধরা নৌকা।

পাতানো জালসহ নৌকাটি নিয়ে যেতে গেলে আরও দেরি হয়ে যেত বলছিলেন তিনি। তাই তিনি নিজেই পানিতে ঝাঁপ দেন।

"নৌকায় একটা বড় একটা খালি প্লাস্টিকের পানির কন্টেইনার ছিল। সাথে করে সেটা নিয়ে গিয়েছিলাম। নদীতে পানির বেশ স্রোত ছিল। সাঁতার কাটা বেশ কঠিন লাগতেছিল। কাছে যাওয়ার পর কন্টেইনারটা তাকে দিলাম। বললাম, ভয়ের কিছু নাই। আল্লাহ তোমাকে বাঁচাবে।"

"আমি তাকে তারপর আবার কন্টেইনার সহ টেনেটেনে নৌকা পর্যন্ত নিয়ে আসি। নৌকায় পৌঁছানোর পর আমরা দুইজনেই কতক্ষণ টানা শুয়ে হাঁপিয়েছি বলতে পারবো না।", বলছিলেন মোঃ জুয়েল ইসলাম।

লঞ্চটি কেন চলে গেল

জাহিদ-৩ লঞ্চটির সুপারভাইজার কামরুল ইসলাম বিবিসিকে জানিয়েছেন, একজন কর্মী নদীতে পড়ে যাওয়ার খবর তার কাছে এসেছে ঘটনার ঘণ্টাখানেক পর।

তিনি বলছেন, "শোনার সাথে সাথে দৌড়ে পিছনে গেলাম। জানতে চাইলাম কি হয়েছে। কেউ পড়ে গেছে সেটা না জানলে কিভাবে লঞ্চ থামাবো?"

তিনি দাবি করছেন, লঞ্চের কর্মচারীদের কেই ছেলেটিকে পড়ে যেতে দেখেনি।

"যাত্রীরা দেখেছে। একে অপরের সাথে বলাবলি করছে। একঘণ্টা পর আমি জানতে পারছি। তখনই ঘাটে ফোন দিয়েছি। আমাকে জানানো হয়েছে জেলেদের নৌকা একটা ছেলেকে উদ্ধার করেছে।"

উদ্ধারের পর ওসমান গনিকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার মোঃ জুবায়ের খানের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

মি. খান বলছেন, "রাতে ছেলেটার জ্বর আসার পর তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেছি। ছেলেটা এমনিতেই ছোটখাটো। ভয়ে আরও একেবারে চুপসে গেছে।"

এখন উদ্ধারকারীর বাসাতেই অবস্থান করছেন ওসমান গনি।

গলাচিপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম আর শওকত আনোয়ার বিবিসিকে বলেছেন, "আমরা জানতে পেরেছি যে ছেলেটা বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে। তার বাবাকে খবর দেয়া হয়েছে। তিনি শরীয়তপুর থেকে রওয়ানা দিয়েছেন ছেলেকে নিয়ে যেতে।"

ওসমান গনি বলেছে, "এমন ভয় আমি জীবনে কোনদিন পাইনি। আর কোনদিন লঞ্চে উঠতে পারবো বলে মনে হচ্ছে না।"

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+