সুইজারল্যান্ডে চরম নাটক! ট্রাম্পের হুমকির জবাবে মাঝপথেই বৈঠক ছাড়ল ইরান

সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসর্টে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে বহুল চর্চিত কূটনৈতিক বৈঠক শুরু হতেই চরম নাটকীয়তার সৃষ্টি হল। ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনও যৌথ ছবি তুলতে অস্বীকার করল তেহরান। শুধু তাই নয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হুমকির প্রতিবাদে মাঝপথেই বৈঠক বয়কট করে বেরিয়ে গেলেন ইরানি প্রতিনিধিরা। ফলে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (MoU) অনুযায়ী শুরু হওয়া এই ত্রিপাক্ষিক তথা বহুপাক্ষিক আলোচনা গোড়াতেই বড় ধাক্কা খেল।

রবিবারের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আলোচনা টেবিলে মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও কাতারের প্রতিনিধিদের। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই বৈঠক সৌহার্দ্যের বদলে চরম উত্তেজনার সাক্ষী থাকল। একদিকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মহম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি। অন্যদিকে মুখোমুখি অবস্থানে ছিল মার্কিন ও ইরানি পক্ষ।

Iranian delegates walking out of diplomatic summit in Switzerland

সূত্রের খবর, আলোচনার শুরুতে আয়োজক এবং মার্কিন প্রতিনিধি দল একটি যৌথ করমর্দন এবং ছবি তোলার পর্বের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ইরানের প্রধান আলোচক মহম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সাফ জানিয়ে দেন, তাঁরা এই কর্মসূচিতে অংশ নেবেন না। ইরানি কর্মকর্তারা বিষয়টিকে ওয়াশিংটনের একটি সস্তা 'মিডিয়া শো' বা সংবাদমাধ্যমের সামনে সাজানো নাটক হিসেবে আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

বৈঠকস্থলের একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই এই কূটনৈতিক টানাপড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে দেখা যায়, ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কাছে এসে নিচু গলায় কিছু একটা বললেন। এর পরই তিনি ঘরের অন্যান্য ইরানি প্রতিনিধি দলের সদস্যদের নিয়ে গটগট করে বাইরে বেরিয়ে যান। এই আচমকা ঘটনায় চরম হকচকিয়ে যান শাহবাজ শরিফ। তিনি পাশের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের দিকে তাকিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন।

এই পুরো পরিস্থিতি যখন তৈরি হচ্ছিল, তার থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে তা দেখছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ঘটনার আকস্মিকতায় তাঁর মুখেও চরম বিস্ময় ফুটে ওঠে। তিনি দ্রুত শাহবাজ শরিফ এবং জেনারেল আসিম মুনিরের দিকে এগিয়ে যান। এই তিন শীর্ষ ব্যক্তিত্বের মধ্যে ইরানি প্রতিনিধিদের আকস্মিক প্রস্থান এবং আরাঘচির দিয়ে যাওয়া বার্তাটি নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ নিবিড় আলোচনা হতে দেখা যায়।

যৌথ ছবি তোলার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের জেরে। ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ইরানকে চরম সতর্কবার্তা দেন। তিনি লেখেন, "লেবাননে নিজেদের বিপুল অর্থপুষ্ট প্রক্সি বাহিনীকে (হিজবুল্লা) অশান্তি ছড়ানো থেকে অবিলম্বে বিরত রাখুক ইরান। যদি তারা না থামে, তবে আমরা আবারও ইরানের উপর চরম আঘাত হানব। গত সপ্তাহের চেয়েও বহুগুণ শক্তিশালী হবে সেই হামলা।"

ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য সামরিক হুমকির খবর বৈঠকস্থলে পৌঁছতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ইরানি শিবির। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই উস্কানিমূলক বার্তার কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে আলোচনার টেবিল ছেড়ে উঠে যান ইরানি প্রতিনিধিরা। সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, ইরানি কূটনৈতিক দল মার্কিন পক্ষের কাছে তাদের তীব্র আপত্তি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিবদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের এই হুমকির যোগ্য জবাব দেওয়ার বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে পর্যালোচনা করছে তারা।

ইরানি প্রতিনিধি দল আলোচনার টেবিল থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার আগে বৈঠকটি প্রায় ৮০ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, এই সভার মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাতে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করে তা নিশ্চিত করা। মূল আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা এবং তেহরানের আটকে থাকা বিদেশি তহবিল পুনরুদ্ধার করা।

কূটনৈতিক টানাপড়েন এবং সাময়িক অচলাবস্থার সৃষ্টি হলেও, এই আলোচনার ইতিবাচক কিছু দিকও সামনে এসেছে। ইরানের প্রতিনিধি দলের এক সদস্য দেশের সরকারি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কাতারের সক্রিয় সহযোগিতায় বিভিন্ন বিদেশি ব্যাঙ্কে আটকে থাকা ইরানি অর্থ ছাড়ের আইনি ও টেকনিক্যাল প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের বকেয়া অর্থ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ইরানের সামনে।

এর পাশাপাশি ইরানের তেল রফতানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে শীঘ্রই এই সংক্রান্ত ছাড়পত্র বা নোটিফিকেশন জারি করা হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার এবং স্টিভ উইটকফের নেতৃত্বাধীন মার্কিন দল এই প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত নরম মনোভাব দেখায় কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

সুইজারল্যান্ডের এই বৈঠক একদিকে মার্কিন-ইরান চিরবৈরী সম্পর্কের কঠিন বাস্তবতা যেমন তুলে ধরল, তেমনই পাকিস্তান ও কাতারের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলির মধ্যস্থতার ক্ষমতাকেও পরীক্ষার মুখে দাঁড় করাল। ইসলামাবাদ চুক্তির শর্তাবলী শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে নাকি ট্রাম্পের সামরিক হুঁশিয়ারি এই উদ্যোগকে পুরোপুরি ভেস্তে দেবে, আগামী দিনগুলিতে ভূরাজনীতির গতিপ্রকৃতিই তা নির্ধারণ করবে।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+