ভাইরাল আইআইটি রুরকির গোমূত্র গবেষণা! বিজ্ঞান নাকি বিতর্কিত দাবি? নেটপাড়ায় উত্তাল আলোচনা

আইআইটি রুরকির (IIT Roorkee) একটি সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ভারতের বিজ্ঞানচর্চা ও প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যকার টানাপোড়েনকে নতুন করে উস্কে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এক্স হ্যান্ডেল থেকে গোমূত্রের নির্যাস বা 'গোমূত্র অর্ক'-এর ভাইরাস প্রতিরোধী ক্ষমতা সংক্রান্ত একটি উচ্চ-পর্যায়ের গবেষণার খবর সামনে আনা হয়েছে। এরপরই নেটপাড়ায় বিজ্ঞান ও আদর্শের লড়াই তীব্র আকার ধারণ করেছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গবেষকেরা গোমূত্র অর্কের মধ্যে এমন কিছু বায়োঅ্যাক্টিভ বা জৈব-সক্রিয় যৌগের সন্ধান পেয়েছেন, যা গবেষণাগারে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। এই যৌগগুলি মূলত চিকনগুনিয়া ভাইরাসের কার্যকারিতা হ্রাস করতে সক্ষম বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই খবর চাউর হতেই দেশের বৈজ্ঞানিক মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

Scientific laboratory research on traditional cow urine extract

গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন আইআইটি রুরকির বায়োসায়েন্সেস অ্যান্ড বায়োইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ডঃ শৈলী তোমর এবং তাঁর গবেষক দল। তাঁদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ উপায়ে তৈরি গোমূত্রের নির্যাস ভাইরাসের আক্রমণাত্মক ক্ষমতা প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে। অন্যদিকে আধুনিক ও পরিশীলিত প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তৈরি বিশেষ ফর্মুলেশন ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি প্রায় ৯৯.৮৫ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে।

গবেষণার সম্পূর্ণ ফলাফল এবং এর পেছনের পদ্ধতি বিজ্ঞান বিষয়ক আন্তর্জাতিক স্বীকৃত জার্নাল 'এসিএস এগ্রিকালচারাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি' (ACS Agricultural Science & Technology)-তে বিশদভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। আইআইটি রুরকি এই প্রচেষ্টাকে আধুনিক জৈবপ্রযুক্তির সাহায্যে প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের কার্যকারিতা প্রমাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস হিসেবে বর্ণনা করেছে।

এই গবেষণার খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসে পৌঁছনো মাত্রই 'ঐতিহ্য বনাম বিজ্ঞান'-এর লড়াইটি আবারও সামনে চলে এসেছে। একদল নেটিজেন এই গবেষণালব্ধ ফলাফলকে ভারতের সনাতন জ্ঞান এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার অভূতপূর্ব জয় হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, দেশের প্রাচীন জ্ঞান কখনই ভিত্তিহীন ছিল না এবং এই গবেষণা তারই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

উচ্ছ্বসিত বহু ব্যবহারকারী সোশ্যাল মিডিয়ায় মন্তব্য করেছেন যে, যাঁরা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি এবং আয়ুর্বেদকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিতে চান, তাঁদের যোগ্য জবাব দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই ধরনের প্রাচীন উপাদানগুলির বৈজ্ঞানিক সত্যতা যাচাইয়ের কাজ আরও দ্রুত করা উচিত বলে তাঁরা দাবি জানান। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা অবহেলা থেকে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যকে এবার মুক্ত করার সময় এসেছে বলে তাঁরা মনে করেন।

তবে এর বিপরীতে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ ও সমাজ সমালোচকেরা। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভারতের প্রথম সারির একটি শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক মানের সর্বাধুনিক বিজ্ঞানচর্চা। কোনো সুনির্দিষ্ট মতাদর্শের অনুসারী হয়ে কাজ করা স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের আত্মমর্যাদার জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বৈজ্ঞানিক নীতি অপেক্ষা ভাবাবেগের প্রাধান্য নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন।

গবেষণার অগ্রাধিকার এবং তহবিলের বণ্টন নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। বহু ব্যবহারকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, বর্তমান বৈজ্ঞানিক পরিস্থিতিতে ক্যানসার, যক্ষ্মা বা অন্যান্য মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধির গবেষণায় দেশের সীমিত সম্পদ বেশি বরাদ্দ হওয়া প্রয়োজন ছিল। ভারতের জাতীয় স্তরের মেধাকে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার ঘোর বিরোধিতা করেছেন তাঁরা।

আইআইটি রুরকির পক্ষ থেকে চালানো এই গবেষণাটি কিন্তু দেশের বৈজ্ঞানিক মহলে হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়। এই জাতীয় ঐতিহ্যবাহী গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। বিশেষত ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের তত্ত্ববধানে 'সূত্র-পিক' (SUTRA-PIC) নামের একটি সুনির্দিষ্ট ও বৃহৎ জাতীয় কর্মসূচির সূচনা করা হয়।

৯৮ কোটি টাকার বিশাল বাজেট নিয়ে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মূল উপজীব্য ছিল দেশীয় গরুর গুণাগুণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খতিয়ে দেখা। এই প্রকল্পের আওতায় দেশীয় গরুর মূত্র, গোবর ও দুগ্ধজাত সামগ্রীর ব্যবহারে স্বাস্থ্য, কৃষি এবং পুষ্টি ক্ষেত্রের ব্যাপক উন্নয়ন কী উপায়ে সম্ভব, তা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণা চালানো হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য ছিল ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও স্বাস্থ্যচর্চাকে প্রমাণ-ভিত্তিক বিজ্ঞানের মোড়কে প্রতিষ্ঠিত করা।

এই প্রকল্পের অধীনে দেশের একাধিক আইআইটি এবং কেন্দ্রীয় গবেষণাগার নানাবিধ কাজে যুক্ত রয়েছে। গোবর থেকে সুপারক্যাপাসিটরের ইলেকট্রোড তৈরি, গোমূত্র ব্যবহার করে কঠিন জল পরিশোধন বা দেশীয় গরুর মূত্রের সঠিক রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করার মতো গবেষণাও করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের কাজ ছিল এই সমস্ত চিরাচরিত উপাদানের বাণিজ্যিক বা শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োগের সপক্ষে কঠোর বৈজ্ঞানিক যুক্তি এবং তথ্যপ্রমাণ দাঁড় করানো।

চিকনগুনিয়া ভাইরাসজনিত একটি অত্যন্ত কষ্টদায়ক রোগ, যার কোনো একক নির্দিষ্ট টিকা বা সাকুল্যে নিরাময়কারী ওষুধ এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। এই বাস্তবতার নিরিখে দেশীয় কোনো ভেষজ উপাদান যদি আশার আলো দেখায়, তবে তা অবশ্যই গবেষণার দাবি রাখে। কিন্তু সেই কাজ করার সময় আন্তর্জাতিক স্তরের বৈজ্ঞানিক নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে দেশের শিক্ষামহলে জোর বিতর্ক রয়েই যায়।

বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির মিলন কখনই অসম্ভব নয়, যদি সেখানে রাজনীতির ছোঁয়া এবং অযথা ভাবাবেগের অনুপ্রবেশ রোখা সম্ভব হয়। ভারতের দীর্ঘ জ্ঞানচর্চার ইতিহাসকে আধুনিক বিশ্বের দরবারে যুক্তিগ্রাহ্য করে তুলতে কঠোর গবেষণার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকাও জরুরি। তবেই কোনো ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা বিশ্বমঞ্চে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে এবং সুস্থ বৈজ্ঞানিক পরিবেশও অক্ষুণ্ণ থাকতে পারে।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+