চূড়ান্ত নিরাপত্তা আর কড়া নজরদারিতে নিট-ইউজি পুনঃপরীক্ষা, স্বচ্ছতা ফেরাতে কি সব ব্যবস্থাই যথেষ্ট?

দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা এবং অত্যন্ত সতর্কতামূলক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে নিট-ইউজি (NEET-UG) পুনঃপরীক্ষা। প্রথম দফার পরীক্ষায় দেশব্যাপী প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুরুতর অভিযোগ এবং তা নিয়ে দেশজোড়া আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবার কোনও খামতি না রেখে পরীক্ষার সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কোমর বেঁধে নেমেছে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য প্রশাসন।

এদিন রবিবার দুপুর দুটো থেকে শুরু হয়ে বিকেল সওয়া পাঁচটা পর্যন্ত এই পরীক্ষা চলবে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে এই পরীক্ষার আয়োজন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করা হয়েছে। দেশজুড়ে মোট ৫৫১টি শহরে এবং দেশের বাইরে ১৪টি আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে এই ঐতিহাসিক পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। সর্বস্তরের নজরদারি সুনিশ্চিত করতে প্রতিটি কেন্দ্রেই বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে।

Students awaiting entry at secured NEET-UG exam center

এবারের এই বিতর্কিত পুনঃপরীক্ষায় অংশ নিতে চলেছেন প্রায় ২২ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী। গোটা দেশ জুড়ে ৫,৪৪০টি সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে, যাতে কোনো পরীক্ষার্থীর যাতায়াত বা পরীক্ষা প্রদানে সমস্যা না হয়। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পরীক্ষার প্রতিটি আসনেই লাইভ ভিডিও ক্যামেরার মাধ্যমে কড়া নজরদারি রাখার ব্যবস্থা করেছে নিয়ামক সংস্থা।

দিল্লির ভিন্ন অংশে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলির ঠিক বাইরে দিল্লি পুলিশের বিশাল বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে পান্ডারা রোডের সিএম শ্রী স্কুলের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলিতে নজরদারি সবচেয়ে বেশি জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীতে চলমান তীব্র গরম এবং লু-প্রবাহের হাত থেকে পরীক্ষার্থীদের বাঁচাতে দিল্লি সরকার বিশেষ মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

তীব্র দাবদাহ মোকাবিলায় পরীক্ষা কেন্দ্রগুলির গেটের বাইরে বিশেষ 'কুলিং জোন’ বা ঠান্ডা জলের ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশ্রামের জায়গা তৈরি করা হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরে অপেক্ষা করতে হওয়া অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যদের সুবিধার্থে সেখানে বসার এবং ছায়াযুক্ত অপেক্ষাগারের বন্দোবস্ত করা হয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

এদিকে কর্ণাটকের রাইচুরে পরীক্ষা কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ প্রশাসন ছিল আপসহীন। পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের আগেই পুরুষ ও মহিলা পরীক্ষার্থীদের মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। অনেক পরীক্ষার্থীকে তাদের গলার চেন, কানের দুল কিংবা অন্যান্য গয়না খুলে বাইরে রেখে পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশ করতে বাধ্য করা হয়েছে, যাতে কোনো প্রযুক্তিগত জালিয়াতি না করা যায়।

কর্ণাটকের ম্যাঙ্গালুরুতেও পরীক্ষার পূর্বপ্রস্তুতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সেখানকার বিশেষ পরীক্ষা কেন্দ্র বালমাট্টার সরকারি মহিলা পিইউ কলেজে পর্যাপ্ত পুলিশি মোতায়েন নিশ্চিত করা হয়েছিল। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত উপস্থিতিতে এবং বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া সুরক্ষায় আজ ভোরেই প্রশ্নপত্র জেলা ট্রেশারি থেকে পরীক্ষার প্রতিটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে অত্যন্ত সুরক্ষিত গাড়িতে স্থানান্তরিত করা হয়।

মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর শহরেও পরীক্ষা নির্বিঘ্ন করতে বড়সড় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে পুলিশ প্রশাসন। ইন্দোরের নিরাপত্তা বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিশ (এসিপি) প্রীতি তিওয়ারি জানান যে, পুলিশ কমিশনারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বিশেষ কনভয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা সামগ্রী প্রতিটি কেন্দ্রে পৌঁছানো হয়েছে। ট্রাফিক জট এড়াতে রুটগুলিতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ট্রাফিক পরিকল্পনা।

ইন্দোর শহরে পরীক্ষা পরিচালনার স্বার্থে পুলিশ গোটা এলাকাকে চারটি বিশেষ জোনে ভাগ করেছে। প্রতিটি জোনে একজন করে ডেপুটি কমিশনার (ডিসিপি) সর্বক্ষণ তদারকি করছেন। যেকোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতি বা জালিয়াতির ঘটনা রুখতে পরীক্ষা কেন্দ্রের ৫০০ মিটারের মধ্যে জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এর আগে পরীক্ষা পরিচালনা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। প্রশ্নপত্র ফাঁস, ওএমআর শিট জালিয়াতি এবং প্রথম দফার ফলাফলে অস্বাভাবিক গ্রেস মার্কস দেওয়ার অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আসার পর বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে জল গড়ায়। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে কেন্দ্রীয় সরকার এই গোটা ঘটনার তদন্তভার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা অর্থাৎ সিবিআই-এর হাতে তুলে দেয়।

সিবিআই ইতিপূর্বে বিহার, গুজরাট এবং উত্তরপ্রদেশ সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে একাধিক মূল চক্রী, দালাল ও সরকারি কর্মচারীকে গ্রেফতার করেছে। তদন্তকারীদের দাবি, এই প্রশ্নপত্র পাচার চক্রের শিকড় অনেক গভীরে ছড়িয়ে রয়েছে এবং চক্রের বাকি সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে লাগাতার অভিযান চালানো হচ্ছে। এই চরম ডামাডোলের কারণেই পুনঃপরীক্ষায় আর কোনো ঝুঁকি নেওয়া হয়নি।

এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও পড়ুয়ারা পুনরায় নিজেদের সেরাটা দিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়েছেন। ম্যাঙ্গালুরুর এক পরীক্ষার্থী জানিয়েছেন যে, তিনি পূর্ববর্তী বিভ্রান্তি ভুলে এবারও ভালো প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং আগের পরীক্ষায় ৫৫০-এর বেশি নম্বর পেলেও এবার দেশের সামগ্রিক সুরক্ষার আবহে পরীক্ষা দিতে পেরে অনেকটা আশ্বস্ত বোধ করছেন। তবে বারবার পরীক্ষার সূচি পরিবর্তনের তীব্র মানসিক চাপ নিয়েও পড়ুয়ারা কথা বলেছেন।

পরীক্ষা শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে পড়ুয়াদের মানসিক বল বাড়াতে এগিয়ে এসেছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তিনি রবিবার বার্তার মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কোনো ভয় বা উদ্বেগ ছাড়াই পরীক্ষায় বসার পরামর্শ দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন যে, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি ও রাজ্য প্রশাসন এই পরীক্ষা সম্পূর্ণ ত্রুটিহীনভাবে সম্পন্ন করতে দায়বদ্ধ।

মেডিকেল শিক্ষার এই প্রবেশিকা পরীক্ষার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা শুধুমাত্র লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যতের বিষয় নয়, বরং এটি দেশের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। রবিবারের এই পুনঃপরীক্ষা যাতে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় আবার নতুন করে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, সেই প্রত্যাশাই করছেন দেশের অগণিত পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+