আমেরিকা-ইরান সমঝোতায় স্বস্তি, বিশ্ববাজারে হু হু করে কমল তেলের দাম
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা হ্রাসের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের বাজারে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গিয়েছে। দুই দেশের সরকার ইলেকট্রনিক উপায়ে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি যেমন প্রশমিত হওয়ার আশা দেখা দিয়েছে, তেমনই বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার লেনদেনের শুরুতেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী হতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের ফিউচার প্রাইস ১.১২ শতাংশ বা ৮৯ সেন্ট কমে ব্যারেল প্রতি ৭৮.৬৬ ডলারে নেমে আসে। একই সঙ্গে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI)-এর দামও ১.২৮ শতাংশ বা ৯৮ সেন্ট হ্রাস পেয়ে ব্যারেল প্রতি ৭৫.৮১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তেল বিপণন সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার খবর পৌঁছাতেই বিশ্ববাজারের বিনিয়োগকারীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই নতুন সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ওয়াশিংটন অবিলম্বে ইরানের ওপর জারি থাকা নৌ-অবরোধ তুলে নিতে সম্মত হয়েছে। এর বিনিময়ে তেহরান প্রশাসনও বড় একটি ছাড় দিয়েছে। ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত বিখ্যাত হরমুজ প্রণালীতে অন্তত আগামী ৬০ দিনের জন্য সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও অবাধ চলাচল নিশ্চিত করবে। এই বোঝাপড়া কার্যকর হওয়ার ফলে এই অঞ্চলে যুদ্ধের মেঘ অনেকটাই কেটে গিয়েছে।
| বিষয় | চুক্তির পর বর্তমান অবস্থা |
|---|---|
| ব্রেন্ট ক্রুড তেল (Brent Crude) | ব্যারেল প্রতি ৭৮.৬৬ ডলার (১.১২ শতাংশ পতন) |
| ডব্লিউটিআই ক্রুড তেল (WTI Crude) | ব্যারেল প্রতি ৭৫.৮১ ডলার (১.২৮ শতাংশ পতন) |
| হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা | আগামী ৬০ দিন নিরাপদ ও অবাধ জাহাজ চলাচল |
| মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ | ইরানের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া |
ইরানি সূত্র অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়মিত হতে শুরু করেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ অগ্রাহ্য করে ইতিমধ্যে ইরানের অন্তত ১১টি বড় তেলের ট্যাঙ্কার নির্বিঘ্নে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা করেছে। বৃহস্পতিবার পাওয়া খবরে জানা গিয়েছে, এই জলপথ দিয়ে ইরানের আটটি জাহাজ নিজস্ব জলসীমা থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে রওনা হয়েছে এবং তিনটি প্রধান জাহাজ সফলভাবে দেশের জলসীমায় প্রবেশ করেছে।
হরমুজ প্রণালী হল বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল সমুদ্রপথ। বিশ্বের মোট উত্তোলিত অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনা তৈরি হলেই গোটা বিশ্বের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। মার্কিন নৌবাহিনী সেখানে অবরোধ তৈরি করায় এতদিন বিশ্বজুড়ে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছিল। এবার সেই অবরোধ উঠে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো যেমন স্বস্তি পেয়েছে, তেমনই ক্রেতা দেশগুলোর কাছেও জোগান নিশ্চিত হয়েছে।
রপ্তানি ও সরবরাহে ব্যাঘাতের কারণে এই বছরের এপ্রিল ও মে মাসে অপরিশোধিত তেলের বাজার অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। দুই দেশের পরস্পরবিরোধী সামরিক অবস্থান এবং একের পর এক পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে এক সময় অপরিশোধিত তেলের দাম রেকর্ড ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারে স্পর্শ করেছিল। এর ফলে চরম সংকটে পড়েছিল জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলি। মূল্যবৃদ্ধির এই রেকর্ড ধাপে ধাপে কমতে শুরু করলেও দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাটানির কারণে বাজারে নিয়মিত চরম অস্থিরতা বজায় ছিল।
তেলের দামের এই পতন ভারতের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক সংবাদ। ভারত তার নিজস্ব বার্ষিক প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি অংশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে থাকে। ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক স্তরে তেলের সামান্য দাম বাড়লে বা সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে ভারতের ঘরোয়া বাজারে পেট্রোল, ডিজেল ও এলপিজি গ্যাসের দাম সরাসরি বেড়ে যায়। বিশ্ববাজারে তেলের ব্যারেল প্রতি দাম ৮০ ডলারের নিচে নেমে আসায় ভারতীয় তেল উন্নয়ন সংস্থা এবং সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ অনেকটাই কমবে。
আমদানি ব্যয় হ্রাস পেলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরো দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এর পরোক্ষ ভালো প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন খরচে, যা দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা নেবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার নীতি নির্ধারকদের কাছেও সুদের হার নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে এলে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং বৈদেশিক বাজারে ভারতীয় টাকা শক্তিশালী করার গতি ত্বরান্বিত হবে।
এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অন্য একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান সরাসরি কোনো শীর্ষ বৈঠক না করে সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক মাধ্যমে এই সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে। কূটনীতির এই আধুনিক রূপ নির্দেশ করে যে আন্তর্জাতিক সংকট মেটাতে এখন কৃত্রিম দীর্ঘসূত্রতা এড়ানো সম্ভব। ওয়াশিংটন ও তেহরানের কর্মকর্তারা ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে এই চুক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ চূড়ান্ত করেছেন, যা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক উত্তেজনা প্রশমনে একটি নতুন উদাহরণ স্থাপন করল।
আপাতত এই চুক্তির সময়সীমা ৬০ দিন নির্ধারণ করা হলেও, এই সময়কালে উভয় দেশের পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা হবে। যদি এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে সফলভাবে কার্যকর থাকে, তবে আগামী দিনে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। আপতকালীন পরিস্থিতিতে বড় কোনো বৈরী পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকবে এবং বিশ্বের সামগ্রিক অর্থনীতি ইতিবাচক পথেই অগ্রসর হবে।












Click it and Unblock the Notifications