দিল্লি বিমানবন্দরে অপমানের অভিযোগ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে, শুরু কূটনৈতিক চাপানউতোর
নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখার ঘটনায় চরম কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ভারতের ইমিগ্রেশন বিভাগ ছাড়পত্র দিলেও, ক্ষুব্ধ এই শীর্ষ বাংলাদেশি অ্যাডভাইজার শেষ পর্যন্ত ভারতে প্রবেশ না করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দিল্লি থেকে কলম্বো হয়ে ঢাকা ফিরে যান। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করে ঢাকা ইতিমধ্যে ভারতের উপ-হাইকমিশনারকে তলব করেছে।
কূটনৈতিক সূত্রে খবর, রবিবার সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে নয়াদিল্লিতে পৌঁছন জাহেদ উর রহমান। ১৫ ও ১৬ জুন ভারতের বিদেশমন্ত্রকের উদ্যোগে আয়োজিত ভারত মহাসাগরীয় রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু দিল্লিতে নামার পরেই কোনও সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই ইমিগ্রেশনে তাঁকে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা হয়। পরবর্তীতে ছাড়পত্র পেলেও ক্ষুব্ধ হয়ে সফর বাতিল করে তিনি ঢাকা ফিরে যান।

এই ঘটনার পর ঢাকার কূটনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রক তড়িঘড়ি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের উপ-হাইকমিশনার পবন বাধেকে সরাসরি তলব করে তাঁদের "গভীর হতাশা ও অসন্তোষ" জানিয়েছে। বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান এই ঘটনাকে অত্যন্ত "অনভিপ্রেত ও দুর্ভাগ্যজনক" বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান যে, আগে থেকে কূটনৈতিক প্রোটোকল জানানো সত্ত্বেও এই ধরনের আচরণ কোনোভাবেই আশা করা যায় না।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হল, এই সফরের ব্যাপারে আগে থেকেই দুই দেশের মধ্যে প্রথাগত কূটনৈতিক যোগাযোগ ছিল। বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত ভারতের বিদেশ মন্ত্রককে জাহেদ উর রহমানের সফরের বিশদ বিবরণ দিয়ে কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হয়েছিল। এমনকী ব্যক্তিগতভাবেও ভারতীয় কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের এই গড়িমসি এবং দীর্ঘ সময় আটকে রাখার পেছনে কোনো স্পষ্ট যুক্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
জানা গিয়েছে, দিল্লিতে ইমিগ্রেশন যাচাইয়ের সময় জাহেদ উর রহমানের নামটি একটি বিশেষ "নিরাপত্তা সংক্রান্ত তালিকায়" দেখা গিয়েছিল। এছাড়া তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্টের বদলে সাধারণ সবুজ পাসপোর্টে একটি সার্ক (SAARC) স্টিকার ব্যবহার করে ভ্রমণ করছিলেন। তবে এই নিয়ে ভারত সরকার বা দিল্লির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অফিশিয়াল কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তাদের এই কূটনৈতিক নীরবতা ঘটনাটিকে নিয়ে গুঞ্জন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, জাহেদ উর রহমান বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনের অন্যতম পরিচিত মুখ। পেশায় চিকিৎসক এবং কলামিস্ট এই ব্যক্তিত্ব দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও গঠিত নির্বাচন সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও কৌশল বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্তি পাওয়ার পর থেকে তিনি ঢাকার কূটনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী মহলে যথেষ্ট প্রভাবশালী ভূমিকা রেখে আসছেন।
গত ২০২৪ সালের অগাগস্ট মাসে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায় পেরিয়ে এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটল। বাংলাদেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ঘটনাটি কেবল একটি প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং এর পেছনে গভীর কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক দ্বিমুখী বার্তা নিহিত থাকতে পারে। যদিও ভারত এসব মনগড়া দাবি উড়িয়ে দিয়েছে।












Click it and Unblock the Notifications