আট মাসের রুদ্ধশ্বাস অভিযান! মহাকাশে পাড়ি অনিল মেননদের

মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অসাধারণ মাইলফলক স্পর্শ করে দীর্ঘ আট মাসের এক অভিযানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) পাড়ি দিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন মহাকাশচারী অনিল মেনন। নাসার এই যুগান্তকারী অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হল মহাশূন্যের মতো প্রতিকূল পরিবেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে মানবদেহের ওপর ভরহীনতার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব খতিয়ে দেখা। এই অভিযান আগামী দিনে মহাবিশ্বের আরও গভীরে মানুষের পৌঁছনোর পথকে সুগম করবে বলে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে।

কাজাখস্তানের বৈকোনুর কসমোড্রোম থেকে রাশিয়ার সময় অনুযায়ী এদিন রাতে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা রসকসমসের সয়ুজ মহাকাশযানে চেপে দুই রুশ নভোচারীর সঙ্গে যাত্রা শুরু করলেন অনিল মেনন। মহাকাশযানটি সফল উৎক্ষেপণের পর নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছতেই মহাকাশপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা যায়। পেশায় জরুরি চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও মহাকাশ চিকিৎসাবিদ হওয়ায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন জটিল গবেষণার জন্য অনিল মেনন এই অভিযানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।

Astronaut Anil Menon aboard the International Space Station

আট মাসের এই দীর্ঘ যাত্রায় অনিল মেনন কেবল এই অভিযানের একজন অন্যতম গবেষকই নন, বরং তিনি নিজে এই দীর্ঘকালীন অভিযানের বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য প্রধান মানব চরিত্র এবং গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করবেন। মহাকাশের শূন্য অভিকর্ষজ বল বা মাইক্রোগ্রাভিটি কীভাবে মানবদেহে পরিবর্তন আনে, তা খতিয়ে দেখতে তাঁর ওপর নিয়মিত কিছু পরীক্ষা চালানো হবে।

দীর্ঘদিন মহাকাশে থাকার সময় মহাকাশচারীদের স্বাস্থ্যের নানা রকম পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এই সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজতে অনিল মেনন এই আট মাসের অভিযানে বিভিন্ন অত্যাধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিজে পরীক্ষা করবেন। এর মধ্যে সবচেয়ে যুগান্তকারী প্রযুক্তি হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানিং প্রযুক্তি, যা মহাকাশের শূন্যতায় জীবন বাঁচাতে সাহায্য করবে।

স্বয়ংক্রিয় এই সিস্টেমের মাধ্যমে মহাকাশচারীরা কোনও সরাসরি ডাক্তারের সাহায্য ছাড়াই নিখুঁতভাবে নিজেদের শরীরের অভ্যন্তরীণ ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারবেন। নাসার বিজ্ঞানীদের মতে, মঙ্গল গ্রহের মতো দূরপাল্লার অভিযানে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সময়ের বড় ব্যবধান বা 'টাইম ল্যাগ’ তৈরি হয়, যেখানে পৃথিবী থেকে রিয়েল-টাইমে যোগাযোগ করা অসম্ভব। সেই সব পরিস্থিতিতে মহাজাগতিক অভিযাত্রীদের শারীরিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এই প্রযুক্তি প্রধান ভরসা হয়ে উঠবে।

মহাশূন্যে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অভাব কীভাবে দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের শরীরে রক্ত সঞ্চালন, হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা এবং সামগ্রিক রক্তবাহী নালিগুলোর ওপর প্রভাব ফেলে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। অনিল মেনন দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশ চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাঁর নিজস্ব শারীরিক প্রতিক্রিয়া থেকে পাওয়া ডেটা অত্যন্ত অর্থবহ হবে। এই ডেটার সাহায্যেই নাসা ভবিষ্যতে নভোচারীদের মহাকাশে দীর্ঘ সময় সুস্থ রাখার জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

অনিল মেননের এই আট মাসের অভিযান কেবল মানুষের শরীরের ওপরেই গবেষণা চালাবে না, বরং এটি আধুনিক প্রযুক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এক নতুন পথ উন্মোচন করতে চলেছে। ভরহীন পরিবেশে বা মাইক্রোগ্রাভিটিতে উচ্চমানের সেমিকন্ডাক্টর তৈরি করা যায় কিনা, তার ওপর এই অভিযানে বিশেষ কিছু পরীক্ষা চালানো হবে। অভিকর্ষহীন পরিবেশে কোনও বাহ্যিক বাধা ছাড়া সম্পূর্ণ ত্রুটিহীনভাবে উন্নতমানের অর্ধপরিবাহী বা ক্রিস্টাল তৈরি করা সম্ভব।

মহাকাশে উৎপাদিত এই উন্নত সেমিকন্ডাক্টরগুলি ভবিষ্যতে পৃথিবীর সুপারকম্পিউটার, অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক্স পণ্য ও কৃত্রিম উপগ্রহের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসবে। এর পাশাপাশি এই অভিযানে ত্রিমাত্রিক বায়োপ্রিন্টিং বা থ্রিডি বায়োপ্রিন্টিং প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হবে। এই জীবন্ত কোষ প্রিন্টিং প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা হলে মহাশূন্যে কৃত্রিমভাবে মানুষের জটিল টিস্যু তৈরি করা সম্ভব হবে।

থ্রিডি বায়োপ্রিন্টারের মাধ্যমে তৈরি এই ধরনের ডামি মানব টিস্যু চিকিৎসার ইতিহাসে বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। এটি মানুষের শরীরের বয়স বাড়ার প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন জটিল ব্যাধিকে আরও গভীরভাবে বুঝতে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করবে। পাশাপাশি, এই প্রযুক্তি মানব অঙ্গের বিকল্প তৈরিতে সাহায্য করবে, যা রিজেনারেটিভ মেডিসিন বা পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাবে বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আশাবাদী।

অনিল মেননের এই বিশেষ কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক দায়িত্বে আসার পিছনে রয়েছে তাঁর অসাধারণ কাজের অতীত ইতিহাস। নাসার মহাকাশচারী হিসেবে যোগদানের পূর্বে তিনি মূলত একজন ফ্লাইট সার্জন ও মহাকাশ চিকিৎসাবিদ হিসেবে নিরলস কাজ করেছেন। বছরের পর বছর ধরে জরুরি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার তীক্ষ্ণ ক্ষমতা এবং মহাকাশ চিকিৎসার ওপর দীর্ঘদিনের গভীর অভিজ্ঞতা তাঁকে এই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক অভিযানের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি করে তুলেছে।

আট মাসব্যাপী এই ঐতিহাসিক অভিযানের মাধ্যমে অর্জিত বিপুল বৈজ্ঞানিক তথ্য আগামী দিনের মহাকাশ অভিযানকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে। নাসা তাদের উচ্চাভিলাষী 'আর্টেমিস’ প্রোগামের অধীনে চাঁদে মানুষের পুনরায় বসতি স্থাপন এবং পরবর্তীতে লাল গ্রহ মঙ্গলে মানববাহী প্রথম মহাকাশযান পাঠানোর যে পরিকল্পনা করছে, অনিল মেননের এই বৈজ্ঞানিক মিশন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। পুরো বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে তাঁর সংগৃহীত তথ্যের ঐতিহাসিক ফলাফলের জন্য।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+