লর্ডসে শতরান করে জবাব রোহিতের, তবুও ইংল্যান্ডের রানের পাহাড় টপকাতে না পেরে লজ্জার সিরিজ হার টিম ইন্ডিয়ার
লর্ডসের ঐতিহাসিক মাঠে আরও একটি শ্বাসরুদ্ধকর ক্রিকেট ম্যাচের সাক্ষী থাকল ক্রিকেট বিশ্ব। ভারতের অধিনায়ক রোহিত শর্মার লড়াকু ১৩৮ রান এবং বিরাট কোহলির ৭৪ রানের দুর্দান্ত ইনিংস সত্ত্বেও ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচে ভারতকে ২৭ রানে হারিয়ে দিল ইংল্যান্ড। লর্ডসের এই জয়ের সুবাদে ইংল্যান্ড দল তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতে নিল।
প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ড নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৩ উইকেটে ৩৮৭ রানের পাহাড়প্রমাণ রান সংগ্রহ করে। জবাবে ভারত ৭ উইকেটে ৩৬০ রান তুলতে সক্ষম হয়। বিশ্বের এক নম্বর ওডিআই দল হিসেবে ইংল্যান্ড সফরে এসে ভারতীয় শিবিরের জন্য লর্ডসের এই হারটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়ে রইল।

টি২০ সিরিজে ৪-০ ব্যবধানে পর্যুদস্ত হওয়ার পর ওয়ানডে সিরিজেও হারের মুখ দেখতে হল টিম ইন্ডিয়াকে। অথচ রান তাড়ার শুরুটা ভারতের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ছিল। অধিনায়ক রোহিত শর্মা এবং শুভমান গিলের ওপেনিং জুটি ভারতকে জয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তবে অনভিজ্ঞ বোলিং ও মিডল অর্ডারের ব্যর্থতায় শেষরক্ষা আর হল না।
ডাকেট ও বেথেলের ব্যাটিং তাণ্ডব
লর্ডসের ম্যাচে টসে জিতে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হল ভারতকে। জসপ্রীত বুমরাহর অনুপস্থিতিতে ভারতীয় বোলিং লাইনআপ অনভিজ্ঞতার কারণে মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারেনি। ইংরেজ ওপেনার বেন ডাকেট এবং জেকব বেথেল মিলে ভারতীয় পেসারদের ওপর সুনামি বইয়ে দেন। প্রথম উইকেটে তাঁরা মাত্র ৩০ ওভারের মধ্যেই ১৯২ রানের এক অনবদ্য পার্টনারশিপ গড়ে তোলেন।
বেন ডাকেট এদিন ওডিআই ক্রিকেটে তাঁর ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ১৪১ রান করে সাজঘরে ফেরেন। ১৮টি চার ও ১টি ছয়ে সাজানো ছিল তাঁর এই ইনিংস। অন্যদিকে বেথেল ৫১ বলে অর্ধশতক হাঁকিয়ে খেললেন ৯১ রানের বিধ্বংসী ইনিংস। প্রথম দুই উইকেট পড়ার পরেও স্বস্তির মুখ দেখতে পায়নি ভারতীয় বোলিং আক্রমণ।
চারে নামা অভিজ্ঞ জো রুট ৪৮ বলে লড়াকু ৭৪ রান করে অপরাজিত থাকেন। এরপর ম্যাচ শেষ হওয়ার আগে মাত্র ১৩ বলে ৪১ রান তুলে ভারতীয় পেসার গুরনুর ব্রারের স্পেলকে দুঃস্বপ্ন বানিয়ে দেন জস বাটলার। ব্রার ১০ ওভারে কোনও উইকেট না পেয়ে দেন ৯৭ রান। ইংরেজ ব্যাটাররা পুরো ইনিংসে ৪২টি চার এবং ৬টি ছক্কা মারেন।
মূলত জসপ্রীত বুমরাহর অনুপস্থিতিতে এই ম্যাচে খেলা ৪ জন ভারতীয় পেসারের মোট ৫০টি ওয়ানডে ম্যাচের অভিজ্ঞতাও ছিল না। অর্শদীপ সিং কোনও উইকেট না পেয়ে ৭২ রান দেন। প্রিন্স যাদব ৭৯ রানে নেন ১ উইকেট। এই মারাত্মক অভিজ্ঞতাহীন বোলিং আক্রমণ ইংল্যান্ডের বিশ্বমানের হেভিওয়েট ব্যাটিং লাইনের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণও ১০ ওভার বল করে ৬৯ রান দেন। তবে তিনি ২টি উইকেট পেয়েছেন।
রোহিত-কোহলির লড়াই ও হার না মানা জেদ
পর্বতপ্রমাণ ৩৮৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে রোহিত শর্মা ও শুভমান গিল ভারতকে আক্রমণাত্মক সূচনা এনে দেন। শুভমন গিল ৭৭ রানের চমৎকার ইনিংস খেলে সাজঘরে ফিরে গেলেও রোহিত নিজের লড়াই জারি রাখেন। লর্ডসের মাঠে নিজের প্রথম ওয়ানডে শতরান পূর্ণ করেন তিনি, যা তাঁর ওডিআই ক্রিকেটের ৩৪তম সেঞ্চুরি।
একের পর এক অবসর গুঞ্জনকে এক শটে উড়িয়ে হিটম্যান দেখিয়ে দিলেন তাঁর উপযোগিতা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। রোহিত তাঁর ১১০ বলের ইনিংসে ১৭টি চার ও ৫টি চোখ ধাঁধানো ছক্কার সাহায্যে খেলেন ১৩৮ রানের ইনিংস। গিল ফিরে যাওয়ার পর ক্রিজে আসা বিরাট কোহলির সঙ্গে তাঁর ১১৩ রানের পার্টনারশিপ ভারতকে আবারও আশাবাদী করে তুলেছিল।
কোহলি লর্ডসের মাঠে তাঁর সর্বোচ্চ ৭৪ রানের সাবলীল ইনিংস খেলেন। এর আগে লর্ডসে কোনও অর্ধশতরানও ছিল না কোহলির। রোহিত-কোহলি জুটি মিলে যখন একের পর এক চার-ছয় মারছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল ভারত হয়তো ইতিহাস গড়ে রান তাড়া করবে। কিন্তু ওডিআই ক্রিকেটের সমস্ত হিসাব এক মুহূর্তে ওলটপালট করে দেন ইংরেজ অলরাউন্ডার জ্যাকব বেথেল।
৩০ ওভারের পর ম্যাচ যখন ভারতের নিয়ন্ত্রণে বলে মনে হচ্ছিল, তখন বেথেল তুলে নেন সেট ব্যাটার রোহিত শর্মার মহামূল্যবান উইকেটটি। এই একটি উইকেটই ভারতের জয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে ইংরেজ শিবিরকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে। রোহিত ফিরে যেতেই ভারতের মিডল অর্ডার হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে।
এরপর বল হাতে চূড়ান্ত ধস নামান স্যাম কারান। একের পর এক চমৎকার গতি পরিবর্তনের সাহায্যে মাত্র ৭ বলের ব্যবধানে কারান তুলে নেন ইশান কিষাণ, শ্রেয়স আইয়ার ও বিরাট কোহলির উইকেট। এই তিন প্রধান উইকেট হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সিরিজ জয়ের আশাও চিরতরে শেষ হয়ে যায়।
শেষের দিকে পরাজয় নিশ্চিত জেনেও আদিল রশিদ ও জোফরা আর্চারের নিখুঁত বল সামলে ব্যবধান কমানোর লড়াই চালান লোয়ার অর্ডারের খেলোয়াড়েরা। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এটিই প্রথম নজিরবিহীন ম্যাচ যেখানে দুই দলের চারজন ওপেনারই ৭৫ রানের বেশি ব্যক্তিগত সংগ্রহ করেন।
ভারতর হারলেও রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলির লড়াকু অবদান ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে চিরস্মরণীয় থাকবে। সিরিজ হারের হাহাকারের মাঝেও দুই মহারথীর এমন অনবদ্য বীরত্ব ভক্তদের মনে আজীবন অম্লান থাকবে।












Click it and Unblock the Notifications