অপ্রতিরোধ্য স্পেন ফের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, আর্জেন্টিনাকে জেতাতে পারলেন না মেসি

অতিরিক্ত সময়ের চরম উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার কঠিন রক্ষণব্যুহ ভেঙে অবশেষে ফুটবল বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি ফের একবার নিজেদের করে নিল স্পেন। নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত রোমাঞ্চকর ফাইনালে আলবিসেলেস্তেদের ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করল লা রোহারা। ম্যাচের ১০৬ মিনিটে স্প্যানিশ উইঙ্গার ফেরান তোরেসের করা একমাত্র দৃষ্টিনন্দন গোলটি পুরো খেলার ভাগ্য নির্ধারণ করে দিল।

পুরো ম্যাচ জুড়ে দাপট বজায় রেখে নিখুঁত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও আর্জেন্টিনার কড়া ডিফেন্স ভাঙতে স্প্যানিশ ফুটবলারদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। প্রথমার্ধ এবং দ্বিতীয়ার্ধে একের পর এক আক্রমণ করেও কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পাচ্ছিলেন না স্পেনের ফরোয়ার্ডরা। প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখতে আর্জেন্টিনা দল মূলত অতি-রক্ষণাত্মক শৃঙ্খল এবং স্পেনের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করার নেতিবাচক কৌশল বেছে নিয়েছিল, যা পুরো প্রথম ৯০ মিনিটকে বেশ খণ্ডিত করে তোলে।

Spain squad celebrating 2026 FIFA World Cup title victory

আর্জেন্টিনার প্রতিরোধ ও ফেরান তোরেসের ম্যাজিক

ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। যখন গ্যালারি জুড়ে চরম উত্তেজনা ও টাইব্রেকার ভাগ্য নির্ধারণের ভাবনা দানা বাঁধছিল, ঠিক তখনই স্পেনের হয়ে জয়সূচক গোলটি করেন ফেরান তোরেস। পেদ্রো পোরোর চমৎকার ক্রস ব্যাক পোস্টে অসাধারণ দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণে রাখেন তরুন উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামস। সেখান থেকে চকিতে বল পেয়ে আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে নিখুঁত শটে বল জালে জড়ান বার্সেলোনা উইঙ্গার তোরেস।

ফাইনালের মেগা মঞ্চে আর্জেন্টিনার মূল রণকৌশলই ছিল স্পেনের স্বাভাবিক পাসিং গেম ও তিকিতাকার ছন্দ ব্যাহত করা এবং অযথা সময় নষ্ট করা। তবে অতিরিক্ত সময়ে তাদের এই নেতিবাচক পরিকল্পনা বড় ধাক্কা খায়। স্প্যানিশদের ক্ষিপ্র আক্রমণ রুখতে গিয়ে ম্যাচের শেষ ভাগে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় আর্জেন্টিনার নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজকে। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ায় আর্জেন্টিনার শক্তিশালী ডিফেন্সিভ দেওয়াল একপ্রকার ভেঙে পড়ে।

আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ যদি গোলপোস্টের নিচে চিনের প্রাচীর হয়ে না দাঁড়াতেন, তবে ব্যবধান আরও বাড়তে পারত। স্পেনের একের পর এক আক্রমণাত্মক শট প্রতিহত করে নীল-সাদা জার্সিকে দীর্ঘক্ষণ ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। পুরো ম্যাচে স্পেন যেখানে গোলমুখে ২০টি শট নিয়েছে, সেখানে আর্জেন্টিনা সাকুল্যে মাত্র দুটি শট নিতে পেরেছে। তাও কোনওটাই তেকাঠির ভিতরে নয়। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে ফাইনাল ম্যাচে স্প্যানিশদের রাজত্ব কতটা একক ছিল।

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির জন্য এই ফাইনালটি ছিল বিশ্বমঞ্চে শেষ ম্যাচ। কিন্তু নিজের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ফুটবল কেরিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ মিশনটি খেতাব দিয়ে রাঙাতে পারলেন না তিনি। ম্যাচের ১১৫ মিনিটে মেসির একটি মরিয়া ফ্রি-কিক স্প্যানিশ ডিফেন্ডার মিকেল মেরিনোর মাথায় লেগে লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে আর্জেন্টিনার সমতায় ফেরার শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়। চোখের জলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরকে বিদায় জানাতে হল এই মহাতারকাকে।

মাঠের বাইরে গ্ল্যামার ও তারকা খচিত আয়োজন

ফুটবলের এই মহা দ্বৈরথ মাঠের ভিতরের লড়াইয়ের চেয়ে মাঠের বাইরের জাঁকজমকেও ছিল সমান আকর্ষণীয়। ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো এই মেগা ফাইনালটিকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মনোগ্রাহী উৎসব হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। গ্যালারিতে উপস্থিত লক্ষাধিক দর্শক মাঠের নান্দনিক ফুটবলের পাশাপাশি উপভোগ করেছেন বিশ্বের প্রথম সারির সঙ্গীতশিল্পীদের পরিবেশনা। খেলা শুরুর আগের প্রাক-ম্যাচ জমকালো অনুষ্ঠান আমেরিকার গ্ল্যামারাস ঐতিহ্যবাহী 'সুপার বোল'-এর জৌলুসকেও একপ্রকার ফিকে করে দিয়েছিল।

বিশ্বকাপের মতো মঞ্চের কিক-অফ অনুষ্ঠানটি বেশ দীর্ঘ হওয়ায় খেলা শুরু হতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় ছয় মিনিট বিলম্ব হয়। মার্কিন পপ সেনসেশন জেনিফার হাডসন তাঁর সুরেলা কণ্ঠে স্টেডিয়াম মাতিয়ে তোলেন। এরপর গান পরিবেশন করেন আর উইলিয়ামস, যিনি ফিফার আকর্ষণীয় থিম সং গেয়ে শোনান। সবশেষে হলিউড মেগাস্টার টম ক্রুজ মাঠে দাঁড়িয়ে ফুটবলের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষমতা নিয়ে একটি প্রেরণাদায়ক বক্তব্য পেশ করেন, যা পুরো পরিবেশকে মোহময় করে তোলে।

এই ফাইনালের সবচেয়ে বড় চমক ছিল প্রথমার্ধের বিরতির দীর্ঘ সময়। সাধারণত ১৫ মিনিটের বিরতি দেওয়া হলেও এই ফাইনালে তা গিয়ে ঠেকেছিল প্রায় ২৭ মিনিট ২০ সেকেন্ডে। পপ সম্রাজ্ঞী ম্যাডোনা, জাস্টিন বিবার এবং জনপ্রিয় সিরিয়াল টেড লাসো-র তারকাদের অংশগ্রহণে এই বিশেষ হাফ-টাইম শো অনুষ্ঠিত হয়। এই দীর্ঘ বিরতিটি আর্জেন্টিনার জন্য উপকারী ছিল, কারণ তাদের ফুটবলাররা দীর্ঘ রক্ষণাত্মক লড়াইয়ের ক্লান্তি কাটিয়ে মাঠের কৌশল সাজানোর অতিরিক্ত সময় পেয়েছিল।

এই ঐতিহাসিক ফুটবল মাহেন্দ্রক্ষণ সরাসরি উপভোগ করতে নিউ ইয়র্কের গ্যালারিতে হাজির হয়েছিলেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তারকারা। ফিফা প্রধান ইনফান্তিনো এই ফাইনালটি উপভোগ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভিভিআইপি বক্সে বসে। সেই রাজকীয় বক্সে মেক্সিকোর নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউম, স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ এবং কানাডার বিশিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক প্রতিনিধি মার্ক কার্নিও উপস্থিত ছিলেন।

স্পেনের এই ঐতিহাসিক দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পিছনে লুকিয়ে ছিল তাদের দীর্ঘদিনের দলগত পরিকল্পনা এবং ফুটবল অ্যাকাডেমিগুলোর ওপর নিখাদ আস্থা। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিয়ে দুর্দান্ত ও দর্শনীয় ফুটবল খেলে অপরাজিত থেকেই ফাইনালে উঠেছিল কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। মাঠের লড়াইয়ে আধিপত্য ধরে রাখার স্প্যানিশ তরুণদের এই বিশেষ দর্শন প্রমাণ করেছে যে, রক্ষণাত্মক ফুটবলের চেয়ে জয়ের ক্ষুধা নিয়ে খেলাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।

খেলার নান্দনিক ব্যাকরণ এবং মাঠের আধিপত্য—উভয় দিক থেকেই স্পেনের ফুটবলাররা এই শিরোপা জয়ের উপযুক্ত দাবিদার ছিলেন। আর্জেন্টিনার অতি-রক্ষণাত্মক ব্যুহ ভাঙতে তারা যে অসীম ধৈর্য ও ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা দেখিয়েছে, তা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। লা রোহার এই জয় কেবল তাদের ট্রফি কেবিনেটকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং সুন্দর ফুটবলের ধারাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে স্প্যানিশ আধিপত্যের নতুন যুগের সূচনা করল।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+