এমবাপেই পেলেন 'গোল্ডেন বুট', বিশ্বকাপ ফাইনালে নিস্প্রভ মহাতারকা মেসি
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর আসরেই বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন স্বর্ণালী যুগের সূচনা হল। আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি লিওনেল মেসিকে গোল সংখ্যায় পিছনে ফেলে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব 'গোল্ডেন বুট’ নিজের দখলে রাখলেন ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপে। এই বিশ্বকাপে এমবাপে মোট ১০টি গোল করেছেন। তাঁর অবিশ্বাস্য গতির কাছে বারবার পরাস্ত হতে হয়েছে বিশ্বের তাবড় ডিফেন্ডারদের। একইসঙ্গে সবমিলিয়ে বিশ্বকাপেও সর্বোচ্চ গোলসংখ্যায় এখন এগিয়ে এমবাপেই। তাঁর সংগ্রহ ২২টি গোল। মেসি করেছেন ২১টি গোল। তাঁদের সবচেয়ে কাছে রয়েছেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসে। তিনি করেছেন ১৬টি গোল। ফলে সবকিছু ঠিক থাকলে মাত্র ২৭ বছর বয়সী এমবাপে যে আগামী দিনে সমস্ত রেকর্ড ভেঙে অবিশ্বাস্য উচ্চতায় সকলের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবেন, তা এখন থেকেই বলা যায়।
ফরাসি শিবিরের জন্য এবারের টুর্নামেন্টে টিকে থাকার লড়াই সহজ ছিল না। সেমিফাইনালে স্পেনের পাওয়ার ফুটবলের কাছে পরাস্ত হয়ে ট্রফি জয়ের দৌড় থেকে ছিটকে যেতে হয়েছিল দিদিয়ের দেশঁ-র দলকে। তবে ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন হাতছাড়া হলেও এমবাপে কিন্তু শেষ ম্যাচ পর্যন্ত নিজের লড়াই সচল রেখেছিলেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্রোঞ্জ পদক জয়ের লড়াইতে দুর্দান্ত পারফর্ম করে তিনি একাই জোড়া গোল হাঁকান তবে দলকে জেতাতে পারেননি।

কিলিয়ান এমবাপের বিশ্বরেকর্ড এবং এলিট ক্লাবে প্রবেশ
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে গোল্ডেন বুট জেতা অত্যন্ত গৌরবের হলেও এক আসরে দুই অঙ্কের গোলের ঘরে পৌঁছনো কতটা কঠিন, তা ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। ২০২৬ সালের এই চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে এমবাপে বিশ্বের চতুর্থ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের একটি একক সংস্করণে ১০ বা তার বেশি গোল করার অনন্য নজির গড়লেন। এর আগের দীর্ঘ ফুটবল ইতিহাসে মাত্র তিনজন খেলোয়াড় বিশ্বকাপের ময়দানে এই অসাধ্য সাধন করতে পেরেছিলেন।
ইতিহাসে তাকালে দেখা যায়, ১৯৫৮ সালে ফ্রান্সের জো ফন্তেইন এক আসরে সর্বোচ্চ ১৩টি গোল করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির সান্দর কোকসিস ১১টি গোল এবং ১৯৭০ সালে পশ্চিম জার্মানির কিংবদন্তি গার্ড মুলার ১০টি গোল করে তালিকায় নাম তুলেছিলেন। দীর্ঘ ৫৬ বছর পর কোনও ফুটবলার বিশ্বকাপের আসরে এই অভাবনীয় সংখ্যা স্পর্শ করলেন। এমবাপে এখন ফুটবল বিশ্বের সেই বিরল ও মহান তারকাদের সরণিতে নিজের জায়গা করে নিলেন।
এর আগে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও এই দুই পিএসজি সতীর্থ অর্থাৎ মেসি ও এমবাপের মধ্যে এক রোমহর্ষক টক্কর দেখেছিল সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা। সেবার লুসাইল স্টেডিয়ামে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও ট্রফি ছোঁয়া হয়নি এমবাপের, তবে ৮ গোল করে মেসিকে এক গোলের ব্যবধানে হারিয়ে গোল্ডেন বুট ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপেও তিনি সেই একই দাপট ধরে রাখলেন এবং বিশ্ব ফুটবলে দাপট বজায় রাখলেন।
আর্জেন্টিনার হয়ে ফাইনালে নামা লিওনেল মেসি গোল করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁর গোল সংখ্যা আটটিতেই এসে থমকে যায়। অন্যদিকে, ইংলিশ মিডফিল্ডার জুড বেলিংহাম এবং নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড ৭টি করে গোল নিয়ে যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে শেষ করেন। এর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে তরুণ প্রজন্মের ফুটবলারদের আগমনী বার্তা আরও স্পষ্ট হল। নিচে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের সেরা দশ গোলদাতার তালিকা দেওয়া হল।
| র্যাঙ্ক | খেলোয়াড় | গোল | অ্যাসিস্ট | খেলার সময় (মিনিট) |
|---|---|---|---|---|
| ১ | কিলিয়ান এমবাপে (ফ্রান্স) | ১০ | ৪ | ৭৬৯ |
| ২ | লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) | ৮ | ৪ | ৭৮৩ |
| ৩ | জুড বেলিংহাম (ইংল্যান্ড) | ৭ | ১ | ৬৯৮ |
| ৪ | আর্লিং হালান্ড (নরওয়ে) | ৭ | ০ | ৫৩৭ |
| ৫ | উসমানে ডেম্বেলে (ফ্রান্স) | ৬ | ২ | ৬৪৮ |
| ৬ | হ্যারি কেন (ইংল্যান্ড) | ৬ | ১ | ৭৩২ |
| ৭ | মিকেল ওয়ারজাবাল (স্পেন) | ৫ | ১ | ৬৬৪ |
| ৮ | ইসমাইলা সার (সেনেগাল) | ৪ | ১ | ৪১৯ |
| ৯ | জুলিয়ান কুইনোনেস (মেক্সিকো) | ৪ | ১ | ৪৪০ |
| ১০ | ভিনিসিয়াস জুনিয়র (ব্রাজিল) | ৪ | ১ | ৫০৫ |
স্পেনের দ্বিতীয়বার বিশ্বজয় এবং ফাইনালে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা
কিলিয়ান এমবাপে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে বিশ্বকে মোহিত করলেও, দলগত চ্যাম্পিয়নশিপের আসল রোমাঞ্চ ছিল ফাইনাল ম্যাচে। আমেরিকার নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে আয়োজিত মহাকাব্যিক ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হয়েছিল মেসির আর্জেন্টিনা। সেখানে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় লড়াইতে ১-০ গোলে হারিয়ে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো সোনালী ট্রফি নিজেদের করে নিল স্পেন। ডিফেন্স এবং মাঝমাঠের দুর্দান্ত সামঞ্জস্যই ছিল স্প্যানিশ দলটির জয়ের মূল চাবিকাঠি।
ফাইনালে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় দুদলের রক্ষণভাগই ছিল অনমনীয়। স্পেনের ফুটবলাররা মাঠ জুড়ে পাসের রাজত্ব তৈরি করলেও এমিলিয়ানো মার্টিনেজ গোলপোস্টের নিচে অপ্রতিরোধ্য চিনের প্রাচীর গড়ে তুলেছিলেন। আর্জেন্টিনার এই অতন্দ্র প্রহরী একের পর এক নিশ্চিত গোল রুখে দিয়ে ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান। তবে ম্যাচের মূল মোড় ঘুরে যায় ইনজুরি টাইমের শেষ মুহূর্তে, যখন আর্জেন্টিনার ফুটবলার ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন।
দশ জনের আর্জেন্টিনা দলের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের আধিপত্য আরও বেড়ে যায়। এই সময়ে আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের ওপর অনবরত চাপ সৃষ্টি করতে থাকে ইউরোপসেরা স্প্যানিশ দল। অবশেষে ম্যাচের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকে। মাঠে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামা ফেরান তোরেস আলবিসেলেস্তেদের ডিফেন্স চূর্ণ করে বল জালে জড়িয়ে দেন। এই এক গোলেই পুরো স্টেডিয়ামে শুরু হয় স্প্যানিশ উল্লাস।
নিকো উইলিয়ামসের চমৎকার অ্যাসিস্ট থেকে গোল করতে তোরেস সামান্যতম ভুল করেননি। লুইস দে লা ফুয়েন্তের কোচিংয়ে স্পেন যেভাবে সারা টুর্নামেন্টে মাত্র একটিমাত্র গোল হজম করেছে, তা সত্যিই তাদের বিশ্বজয়ের দাবিকে শতভাগ প্রমাণ করে। নিখুঁত পাসিং আর তিকিতাকার নয়া রূপ দেখেই স্পেন আজ বিশ্ব ফুটবলের মাথায় রাজমুকুট পরতে সফল হল। তারা প্রমাণ করেছে যে ফুটবলে শেষমেশ দলগত সংহতিই সবচেয়ে বড় ম্যাজিক।
স্পেনের এই রূপকথার খেতাব অর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটল ২০২৬ সালের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের। ফ্রান্স ট্রফি জিততে না পারলেও কিলিয়ান এমবাপের বিরল ১০ গোলের মাইলফলক দীর্ঘকাল মানুষের মনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। একদিকে স্পেনের চোখ ধাঁধানো তিকিতাকা, অন্যদিকে এমবাপের রাজকীয় ছন্দ— সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের লড়াই ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন স্বর্ণ অধ্যায় যোগ করল, যা আগামী প্রজন্মের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।












Click it and Unblock the Notifications