ফিরে দেখা ২০২০: সিএএ থেকে কৃষক আন্দোলন, বিক্ষোভ আর অস্থিরতায় কাটল একটা বছর
ফিরে দেখা ২০২০: সিএএ থেকে কৃষক আন্দোলন, বিক্ষোভ আর অস্থিরতায় কাটল একটা বছর
গোটা বিশ্বের কাছে একটা অভিশপ্ত বছর হয়ে রইল ২০২০। শুধু করোনা নয় ভারত রাজনৈতিক অস্থিরতা ময় একটা বছর কাটাল। মোদী সরকারের পক্ষেও বছরটা খুব একটা সুখকর হয়নি। একের পর এক বিলের সংশোধনি ঘিরে উত্তাল হয়েছে দেশ। জানুয়ারি থেকে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছিল ভারত। করোনার ধাক্কায় সেই বিক্ষোভ ধামাচাপা পড়লেও বছরের শেষে নয়া কৃষিবিল ঘিরে নতুন করে বিক্ষোভ মাথা চারা দিয়েছে। গোটাদেশেই তাঁর আঁচ পড়েছে।

নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল
২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর দ্বিতীয় মোদী সরকার প্রথম নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলটি পাস করেন। তাতে বলা হয়েছে প্রতিবেশি রাষ্ট্র পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশ, ভুটান, চিন থেকে আসা শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত যারা ভারতে এসেছেন তাঁদের এই নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে। এখন প্রশ্ন হল কারা এই নাগরিকত্ব পাবেন, হিন্দু, শিখ, জৈন, ক্রিশ্চান, বৌদ্ধ এই ধর্মের শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে বলে বিলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংখ্যা গরিষ্ঠতার জেরে সংসদের উভয় কক্ষেই সেটা পাস করিয়ে ফেলে মোদী সরকার।

প্রতিবাদে উত্তাল দেশ
মোদী সরকারের এই নাগরিকত্ব বিলের প্রতিবাদে প্রথম বিক্ষোভটি শুরু হয়েছিল উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলিতে। অসমে নাগাল্যান্ড, মেঘালয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। অসমে সেই বিক্ষোভ মাত্রা ছাড়িয়েছিল। বাংলাদেশ হাইকমিশনারের গাড়িতে পর্যন্ত হামলা করে বিক্ষোভ কারীরা। তারপর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে সামান্য অবনতি হয়েছিল ভারতের। দীর্ঘ একমাস অসমে কার্ফু জারি করা হয়েছিল। সেই আঁচ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছিল অন্যান্য রাজ্যগুলিতেও।

উত্তাল পশ্চিমবঙ্গ
সিএএ বিরোধী আন্দোলনের আঁচ এসে পড়েছিল পশ্চিমবঙ্গেও। অসম লাগোয়া জেলাগুলি থেকে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়। মালদহ, মুর্শিদাবাদ, দুই দিনাজপুরে তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়। মুর্শিদাবাদের লালগোলায় ১০টি ট্রেন জ্বালিয়ে দিয়েছিল বিক্ষোভকারীরা। একাধিক স্টেশনে টিকিট কাউন্টার ভাঙচুর করা হয়। থমকে যায় ট্রেন পরিষেবা। মুখ্যমন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারির পর বিক্ষোভ শান্ত হলেও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হতে ১ মাস সময় লেগে গিয়েছিল।

বিক্ষোভে সামিল মমতাও
পরে সিএএ বিরোধী আন্দোলনে সামিল হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসও। নতুন করে বিরোধী ঐক্য তৈরি হতে শুরু করে। কংগ্রেস, আরজেডি সকলেই এক মঞ্চে সিএএ বিরোধী আন্দোলন শুরু করেছিল। এই আন্দোলনে আংশিক শরিক হয়েছিল শিবসেনাও। তার পর থেকে বিজেপির সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল চওড়া হতে শুরু করে শিবসেনার। এনসিপিও মহাজোটের সিএএ বিরোধী আন্দোলনে শরিক হয়েছিল।

শাহিনবাগ আন্দোলন
সিএএ বিরোধী আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি লাইমলাইটে থেকেছে শহিনবাগ। দিল্লির শাহিনবাগে সিএএ-র বিরোিধতায় অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন সমাজকর্মীরা। কোনও রাজনৈতিক ব্যনারা ছাড়াই চলছিল সেই বিভোক্ষ। তাতে সমর্থন জানিয়েছিলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও। দিল্লির বিধানসভা ভোটে এই শাহিনবাগ আন্দোলনের বিপুল প্রভাব পড়েছিল। শাহিনবাগ আন্দোলনের নেপথ্যে জেএনইউ ও আলিবাগের ছাত্রদের মদত ছিল বলে অভিযোগ করে বিজেপি। দীর্ঘ ৬ মাস সেখানে অবস্থান বিক্ষোভ চলেছে। শাহিনবাগের আন্দোলন তোলার জন্য শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে যেতে হয়েছিল মোদী সরকারকে। সুপ্রিম কোর্ট রাস্তা আটকে বিক্ষোভে আপত্তি জানালে অবস্থান তুলে নিতে বাধ্য হন তাঁরা।

সিএএ-র প্রতিবাদে দাঙ্গা দিল্লিতে
মোদীর জমানাতেই ঘটেছে সেই অঘটন। করোনা ধরার পড়ার কয়েকদিন আগেই দাঙ্গায় উত্তাল হয়েছিল দিল্লি। তা সামাল দিতে রীতিমতো হিমসিম খেতে হয়েছিল মোদী সরকারকে। টানা ১০দিন ধরে সেই দাঙ্গা চলেছে। দাঙ্গায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ ছিল আপ কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে। দাঙ্গার জেরে দিল্লির সেইসব জায়গায় পিছিয়ে গিতে হয়েছিল সিবিএসসি-র বোর্ড পরীক্ষাও। তারপরেই দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে একের পর কেন্দ্রে ধাক্কা খায় বিজেপি। ফের ক্ষমতায় ফেরে আম আদমি সরকার।

কৃষিবিল পাস
সিএএ আর কৃষি আইনের মধ্যে একটা দীর্ঘ বিরতি টেেন দিয়েছিল দেশের করোনা মহামারী। করোনা একটু ঝিমিয়ে পড়তেই শুরু হয় লোকসভা অধিবেশন। তাতেই কৃষি বিলের নতুন সংশোধনী পাস করে মোদী সরকার। দুই কক্ষেই বিলটি পাস হয়ে যায়। রাজ্যসভায় বিলটি পেশের আগেই মোদী সরকারের হাত ছাড়ে শিরোমণি অকালি দল। পদত্যাগ করেন অকালি দলের মন্ত্রী হরসিমরত কউর। এনডিএ সরকার থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয় অকালি দল।

কৃষক বিক্ষোভ
পাঞ্জাবের কৃষকরা প্রথম নয়া কৃষি আইনের বিরোধিতায় সরব হয়েছিলেন। ধীরে ধীরে তার আঁচ এসে পড়ে গোটা দেশে। উত্তর থেকে দক্ষিণ সর্বত্র মোদী সরকারের কৃষি আইনেক প্রতিবাদে পথে নেমেছেন কৃষকরাষ পাঞ্জাব হরিয়ানা এই আন্দোলন আরও জোরদার ভাবে চলছে। রেল অবরোধ থেকে শুরু করে ভারত বনধ, কৃষি বিলের প্রতিবাদে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। আইন প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

৫ দফা বৈঠক ব্যর্থ
ইতিমধ্যেই মোদী সরকারের সঙ্গে ৫ দফায় বৈঠক করেছেন কৃষকরা। কোনও রফাসূত্র বেরোয়নি। কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে অনড় রয়েছেন তাঁরা। পর পর ৫ দফার বৈঠকেও ওই একটি দাবিই জানিয়ে আসছেন কৃষকরাষ ইতিমধ্যেই এই আন্দোলনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাশে পেয়েছেন কৃষকরা। একুশের বিধানসভা ভোটে বিজেপিকে টার্গেট করেই কৃষক আন্দোলনে শরিক হওয়ার বার্তা দিয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যেই মমতার সঙ্গে কথা বলে গিয়েছেন অকালি দলের নেতারা। মমতার নির্দেশে হরিয়ানায় গিয়ে কৃষক সংগঠন গুলির সঙ্গে কথা বলেছেন ডেরেক ওব্রায়েন। ফোনে মমতার বার্তা শুনিয়েছেন তাঁদের। এই বিক্ষো বছরে শেষ পর্যন্তই রয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।












Click it and Unblock the Notifications