রাজ্যসভার ৩ আসনে কি পদ্মশিবিরের জয় নিশ্চিত? তৃণমূলের গৃহযুদ্ধে উত্তপ্ত বাংলার রাজনীতি
পশ্চিমবঙ্গে তিনটি রাজ্যসভা আসনের আসন্ন উপনির্বাচন এই রাজ্যের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। আগামী ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের সমীকরণ অনেকটাই বদলে গিয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী শিবিরের প্রধান শক্তি তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক ভাঙন এই লড়াইয়ে বিজেপিকে এক অভূতপূর্ব সুবিধাজনক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে যেখানে বিরোধীদের অন্তত একটি আসনে জয় নিশ্চিত ছিল, সেখানে এবার তিনটি আসনেই পদ্মশিবিরের জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই উপনির্বাচনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে জুন মাসে তৃণমূলের তিন হেভিওয়েট রাজ্যসভা সাংসদ—সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইকের ইস্তফায়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলের বিপর্যয়জনক ফলের পর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দল ও সংসদ উভয় পদ থেকেই ইস্তফা দেন এই তিন নেতা। সুখেন্দুশেখর ও প্রকাশের মেয়াদ ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর এবং সুস্মিতার মেয়াদ ২০৩০ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ছিল। তাঁদের আকস্মিক দলত্যাগ রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে রাতারাতি ওলটপালট করে দেয়।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর ২৯৪ আসনবিশিষ্ট পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপি একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অন্যদিকে তৃণমূলের আসন সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ৮০-তে। এছাড়া জাতীয় কংগ্রেস ও এজেইউপি দুটি করে এবং সিপিআই(এম) ও ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) একটি করে আসনে জয়লাভ করে। পরবর্তী সময়ে কিছু রাজনৈতিক রদবদলের কারণে বিজেপির শক্তি দাঁড়ায় ২০৭-এ এবং এজেইউপি-র বিধায়ক সংখ্যা কমে হয় এক।
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চূড়ান্ত ভাঙন নতুন জটিলতার জন্ম দেয়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিধানসভার বর্তমান বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দল দুটি স্পষ্ট শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আশি জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৬৫ জন বর্তমানে ঋতব্রত শিবিরের দিকে ঝুঁকে রয়েছেন, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে রয়েছেন মাত্র ১৫ জন বিধায়ক। এই ভাঙনের ফলে রাজ্যসভার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিরোধীদের সম্মিলিত শক্তির হিসাব ভেস্তে গিয়েছে।
রাজ্যসভা নির্বাচনের নিয়মানুযায়ী, ৩টি আসনের জন্য প্রতিটি প্রার্থীকে জয়ের জন্য অন্তত ৭০টি প্রথম পছন্দের ভোটের প্রয়োজন হবে। বিধানসভায় বিজেপির বর্তমান ২০৭ জন বিধায়ক থাকায় তারা খুব সহজেই তাদের ভোট তিন প্রার্থীর মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিতে পারবে। এর ফলে তাদের প্রতিটি প্রার্থী গড়ে ৬৯টি করে ভোট পেতে পারেন, যা তাঁদের জয়ের জন্য যথেষ্ট। অন্যদিকে, তৃণমূলের কোনও একটি ভগ্নাংশের একার ক্ষমতায় একজন প্রার্থীকেও জেতানোর মতো সংখ্যা নেই।
যদি তৃণমূল কংগ্রেস অখণ্ড থাকত, তবে বিরোধীদের সম্মিলিত ভোটে অনায়াসেই একটি আসন নিজেদের ঝুলিতে পুরতে পারত। কিন্তু বিভক্ত দলটির কোনও গোষ্ঠীই এখন এককভাবে সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী শিবিরের ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতাই বিজেপিকে সবকটি আসনে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দিচ্ছে। দলের রাশ কার হাতে থাকবে তা নিয়ে দুই শিবিরের কামড়াকামড়িতে আখেরে লাভ হচ্ছে গেরুয়া শিবিরেরই।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির যদি ক্ষমতা দেখানোর তাগিদে নিজস্ব প্রার্থী দেওয়ার কথা ভাবেও, তাহলেও দলগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে কংগ্রেস বা বামেদের সমর্থন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের যুগে বাম বা কংগ্রেস নেতৃত্ব তৃণমূলের কোনো বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীকে প্রত্যক্ষ সমর্থন জানাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যদিও তাত্ত্বিকভাবে সমস্ত বিরোধী দল একজোট হলে প্রায় ৭০টি বা তার কাছাকাছি ভোট জোগাড় করা সম্ভব, যা একটি আসনের লড়াইকে তীব্র করে তুলতে পারে।
তবে বাস্তব রাজনীতিতে এই ধরনের মহাজোটের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তার ওপর সাম্প্রতিক বছরগুলিতে রাজ্যসভা নির্বাচনে ক্রস-ভোটিং অর্থাৎ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভিন্ন দলকে ভোট দেওয়ার প্রবণতা অনেক বেড়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বিধানসভায় পর্যাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিজেপি এই ক্রস-ভোটিংয়ের সুযোগ নিতে পারে, যা তাদের জয়কে আরও সুনিশ্চিত করবে। ফলে কোনো রকম জোটের চেষ্টা হলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।
এই রাজ্যসভা নির্বাচনটি কেবল সংখ্যার খেলা নয়, বরং তৃণমূলের আসল উত্তরাধিকার কার হাতে থাকবে তা প্রমাণের মরণপণ লড়াই। ইতিমধ্যেই দুই পক্ষই নির্বাচন কমিশনের দরবারে দলের নাম এবং প্রতীকের আইনি অধিকার দাবি করে সওয়াল শুরু করেছে। বিদ্রোহের প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল যখন ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোনীত প্রার্থীকে অগ্রাহ্য করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। বর্তমানে সেই সমর্থন আরও সংহত হয়েছে বলে দাবি বিদ্রোহীদের।
অনূর্ধ্ব এই জটিল পরিস্থিতিতে মমতা শিবির অবশ্য এই ধাক্কাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাদের দাবি, যাঁরা দল ছেড়েছেন তাঁরা আসলে বিশ্বাসঘাতক। দলের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পর পরাজয়ের দিনে তাঁরা সুবিধাবাদীর মতো আচরণ করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের এক প্রবীণ নেতার মতে, দলনেত্রীর জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করেই এই আসনগুলি জেতা হয়েছিল, বিদায়ী সাংসদদের ব্যক্তিগত কেরিয়ারের জন্য নয়। বাংলার মানুষ ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন কারা কঠিন সময়ে দলের হাত ছেড়েছেন।
অপরপক্ষে, রাজ্যসভা থেকে তাঁদের পদত্যাগ যে এক বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত, তা স্পষ্ট করতে চেয়েছেন ঋতব্রত শিবিরের নেতারা। তাঁদের যুক্তি, এই পদত্যাগগুলি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং বর্তমান নেতৃত্বের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা। দলের অভ্যন্তরের বারবার দেওয়া সতর্কতা উপেক্ষা করার ফলেই বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয় ঘটেছে। তাঁদের দাবি, প্রশ্নটা রাজ্যসভার সাধারণ কিছু আসনের নয়, মানুষের আস্থা হারানোর মূল কারণ চিহ্নিত করার।
চূড়ান্ত মনোনয়ন পর্ব এখনও শুরু না হওয়ায় ভোটের লড়াইয়ের রূপরেখাটি এখনও অনেকটাই নমনীয়। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে, ২৪ জুলাইয়ের এই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলটির গৃহযুদ্ধ বিজেপির জয়ের পথকে নিষ্কণ্টক করে তুলেছে। রাজনৈতিক মহলের নজর এখন সেদিকেই, বিরোধীরা কি কোনো সমঝোতায় আসতে পারবে নাকি বিজেপির একটি দাপুটে জয় নিশ্চিত হবে।












Click it and Unblock the Notifications