ওয়েনাড়ে ভয়াবহ ধসে ইতিমধ্যে মৃত ২, আহতদের মধ্যে রয়েছেন বাঙালি শ্রমিকও
কেরলের ওয়েনাড়ে একটি সুড়ঙ্গ নির্মাণাধীন প্রকল্পে ভয়াবহ ভূমিধসের জেরে অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবারের এই মর্মান্তিক ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজ্য প্রশাসনের তরফে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু হয়েছে। হোম মিনিস্টার রমেশ চেন্নিথালা ইতিমধ্যেই ফায়ার ফোর্স প্রধান এবং ওয়েনাড়ের জেলা পুলিশ সুপারকে উদ্ধারকাজ আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাহাড়ি এই অঞ্চলে আকস্মিক ধস নামার কারণে স্বাভাবিক জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে মুরলীধরন এই ঘটনায় দুই শ্রমিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসার জন্য ওয়েনাড়ের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, ভূমিধসের কারণে রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে পড়ায় উদ্ধারকারী দলগুলির যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছিল। তবে রাস্তা পরিষ্কারের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরেই আটকে পড়া বাকিদের দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হবে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় স্থানীয় কোনো বাসিন্দা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হননি। হতাহতরা মূলত রাজ্যের বাইরের পরিযায়ী শ্রমিক বলেই জানা গিয়েছে।

আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসায় তৎপরতা
এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের খবর আসতেই বিপর্যয় মোকাবিলা দল এবং স্থানীয় মানুষজন উদ্ধারকাজে হাত লাগান। ধসের নিচে চাপা পড়া ধ্বংসস্তূপ থেকে এপর্যন্ত আটজন শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের তড়িঘড়ি মেপ্পাডির উইমস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে তাঁদের চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষ চিকিৎসক দল গঠন করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, চিকিৎসাধীন শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছেন হীরা কুমার (৩২), দিলীপ (১৯), সুরজ যাদব (২৫), সঞ্জয় ঠাকুর (৩৫), রজনীশ (২৭), তন্ময় ঘোষ (২৮), কুপামাল ওরফে জয়া (৩৭) এবং কুঞ্জু (৩৯)।
দুর্ঘটনাস্থলের আশেপাশের সমস্ত ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ি থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে প্রশাসন। এই কাজের সুবিধার্থে চুল্লিকা সরকারি এলপি স্কুলে একটি অস্থায়ী ত্রাণ শিবির চালু করা হয়েছে, যেখানে আশ্রয়হীনদের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও, উদ্ধারকাজ আরও ত্বরান্বিত করতে ওয়েনাড় এবং কোঝিকোড় থেকে ৬০ জন দক্ষ কর্মী সম্বলিত জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর দুটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। জেলা শাসক নিজে দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে সমগ্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
কোঙ্কন রেলওয়ে ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেরলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন এই সুড়ঙ্গ ধসের ঘটনাকে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে বর্ণনা করে ঠিকাদারদের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, সুড়ঙ্গ বানানোর সময় সংগৃহীত আলগা মাটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে দ্রুত সরিয়ে ফেলার জন্য ডিস্ট্রিক্ট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি বারবার নির্দেশ বা সতর্কবার্তা দিলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সংস্থাগুলি তা পাত্তাই দেয়নি। এই চরম অবহেলাই আজ এত বড় দুর্ঘটনা ডেকে আনল।
সুড়ঙ্গ ধসে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে কেরল সরকারের মন্ত্রী টি সিদ্দিকি একে একটি সম্পূর্ণ মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয় বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সরাসরি কোঙ্কন রেলওয়ের বিরুদ্ধে কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগ এনেছেন। সিদ্দিকি জানান, ওই এলাকায় সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কারণে ধস নামতে পারে, সে বিষয়ে ওয়েনাড়ের জেলা কালেক্টর অনেক আগেই কোঙ্কন রেলওয়েকে লিখিতভাবে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও রেল কর্তৃপক্ষের তরফে সুরক্ষামূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ অগ্রাহ্য করার এই প্রবণতা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
অতীতের মুণ্ডাক্কাই দুর্যোগ ও সুরক্ষাবিধির প্রশ্ন
পরিবেশগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে পরিচিত ওয়েনাড়ের এই অঞ্চলে পরিকাঠামোগত কাজ করার ক্ষেত্রে আগেও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। মাত্র দুই বছর আগে কেরালার মুণ্ডাক্কাই নামক এলাকায় এক বিধ্বংসী ভূমিধসে ২৯৮ জন সাধারণ মানুষ অকালে প্রাণ হারিয়েছিলেন। প্রাচীন সেই ক্ষতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্থানীয় মন্ত্রীরা মন্তব্য করেছেন যে, পূর্বের এমন মারাত্মক অভিজ্ঞতার পরেও কীভাবে আধিকারিকরা ও নির্মাণকারী সংস্থা পাহাড় কাটার সুরক্ষাবিধি নিয়ে অবহেলা করতে পারলেন, তা নিয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
রাজস্ব মন্ত্রী এপি অনিল কুমার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, উদ্ধারকাজ সম্পূর্ণ করার পাশাপাশি এই বিপর্যয়ের সম্পূর্ণ গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে সরকার তথ্য সংগ্রহ করছে। সুরঙ্গ খনন ও মাটি ফেলার ক্ষেত্রে কোন কোন নিয়মের লঙ্ঘন হয়েছে, তা চিহ্নিত করে কড়া আইনি পদক্ষেপ করা হবে। তিনি ও মন্ত্রী টি সিদ্দিকি স্বয়ং পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করতে এবং উদ্ধারকারীদের কাজের গতি বাড়াতে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাচ্ছেন।
দুর্যোগ পরবর্তী সাহায্য ও দিল্লির আর্থিক সহযোগিতা নেওয়ার প্রসঙ্গে কেরলের মুখ্য সচিব বিশ্বনাথ সিনহা জানিয়েছেন যে, এই দুর্ঘটনার সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি এবং মূল দায়ভার কার, তা নিশ্চিত হওয়ার পরই কেন্দ্রীয় সহায়তার বিষয়টি আলোচনা করা হবে। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসনের জন্য যে নির্দিষ্ট তহবিল ও পদ্ধতি রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে কাজ চালানো হবে। বর্তমানে রাজ্যের বিপর্যয় তহবিলেই উদ্ধার ও পুনর্বাসনের কাজের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে।
ওয়েনাড়ের পাহাড়ি প্রকৃতি ও সেখানকার পরিবেশগত স্পর্শকাতরতাকে গুরুত্ব না দিয়ে পরিকাঠামোগত কাজের সিদ্ধান্ত যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, এই বিপর্যয় তা আবার প্রমাণ করল। স্থানীয় জনগণের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকারে রেখে এবং পাহাড় কাটার আধুনিক সুরক্ষাবিধি মেনে তবেই ভবিষ্যতে প্রকল্প চালু রাখা উচিত বলে পরিবেশবিদরাও মনে করছেন। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ঘটনার চূড়ান্ত প্রশাসনিক তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়লে দোষীদের বিরুদ্ধে বড়সড় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে রাজ্য প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে।












Click it and Unblock the Notifications