রথযাত্রার আনন্দ নিমেষে বিষাদ! পুরীতে প্রবল ভিড় ও গরমের জেরে প্রাণ গেল দুই পুণ্যার্থীর

মহাপ্রভু জগন্নাথ দেবের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রার প্রথম দিনেই ঘটে গেল এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক বিপর্যয়। ওডিশার পুরীধামে রথের রশি টানার বিপুল উন্মাদনার মাঝে আকস্মিক ভিড়ের চাপ এবং প্রচণ্ড গুমোট আবহাওয়ার কারণে দুই পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছে। নবগঠিত বিজেপি সরকারের প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অবিশ্রান্ত বৃষ্টির পর তৈরি হওয়া অত্যন্ত অস্বস্তিকর ও আর্দ্র পরিবেশের কারণে বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন।

পুরী হাসপাতাল ও মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের দেওয়া উচ্চপর্যায়ের বিবৃতি মারফত জানা গিয়েছে, রথের টান শুরু হওয়ার পর গ্র্যান্ড রোডে আচমকাই পুণ্যার্থীদের ঢল নামে। এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে সাতজনকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। দুর্ভাগ্যবশত, তাঁদের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব এক প্রবীণ পুণ্যার্থী চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। চিকিৎসকেরা তাঁর মৃত্যুর সঠিক কারণ খতিয়ে দেখছেন।

Huge crowds gather at Puri Rath Yatra 2026

এরই পাশাপাশি শ্রীক্ষেত্রের অন্য একটি পৃথক এলাকায় আরও এক মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। আনুমানিক পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী এক যুবক রথযাত্রা উৎসব দেখার সময় হঠাৎই তীব্র হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তৎক্ষণাৎ প্রাথমিক চিকিৎসা এবং জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা সত্ত্বেও চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। উৎসবের মহাসম্মেলনের মাঝে এই জোড়া মৃত্যুর ঘটনায় নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে।

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সুসজ্জিত তিন রথ—তালধ্বজ, দর্পদলন এবং নন্দীঘোষের গ্র্যান্ড রোড দিয়ে যাত্রা। এই পবিত্র মুহূর্তের সাক্ষী হতে সকাল থেকেই লাখ লাখ ভক্তের জমায়েত হয়েছিল পুরী শহরে। কিন্তু বৃষ্টির পর গুমোট রোদের তীব্র তাপে বড়দাণ্ডের বুক জুড়ে শ্বাসকষ্ট এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে শুরু করে। এর ফলেই বহু মানুষ অসুস্থতা অনুভব করতে থাকেন।

এবারের রথযাত্রায় ভক্তদের জনজোয়ার অতীতের অনেক রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। প্রাথমিক খতিয়ান অনুযায়ী, দেশ-বিদেশ থেকে প্রায় আট থেকে নয় লক্ষ পুণ্যার্থী গ্র্যান্ড রোডে ভিড় জমিয়েছিলেন রথ টানার ঐতিহাসিক মুহূর্তে অংশ নিতে। কিন্তু অতি বৃষ্টির পর ভ্যাপসা গরম পরিস্থিতিকে মারাত্মক করে তোলে। এর ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষারত দীর্ঘ লাইনে থাকা ভক্তদের মধ্যে ক্লান্তি ও জলশূন্যতা দেখা দেয়।

দমকল ও জরুরি পরিষেবা বিভাগের উচ্চপদস্থ জেলা আধিকারিক উমাশঙ্কর দাশ জানিয়েছেন, শ্রীগুন্ডিচা মন্দিরের অভিমুখে রথ এগোনোর সময় গ্র্যান্ড রোডের সংকীর্ণ অংশে ভিড়ে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। সেখানে অন্তত একশো জন দমবন্ধ হয়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলেন। দমকলের উদ্ধারকারী দল তড়িঘড়ি তাঁদের ভিড়ের মাঝখান থেকে উদ্ধার করে অস্থায়ী শিবিরের উদ্দেশ্যে নিয়ে যায়।

আকস্মিক অসুস্থ হয়ে পড়া এই বিপুল সংখ্যক ভক্তকে সুস্থ করে তুলতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক অস্থায়ী বুথ স্থাপন করা হয়েছিল। সেখানে অবিরাম জল, ওআরএস এবং জীবনদায়ী ওষুধের জোগান বজায় রাখা হয়েছিল। বহু পুণ্যার্থীকে প্রাথমিক ওআরএস দেওয়ার পরেই ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে বেশ কয়েকজনকে পর্যবেক্ষণের জন্য মূল সরকারি হাসপাতালেই ভর্তি রাখতে হয়েছে।

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রশাসনের পাশাপাশি বহু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও এগিয়ে এসেছিল। স্ট্রেচার বা অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে রাজপথ থেকে অসুস্থদের হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়ার ছবি সামাজিক স্তরে মানুষের উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে তোলে। মূলত দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ এবং কমবয়সীদের এই চরম ভিড়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।

জোড়া মৃত্যুর এই বেদনাদায়ক ঘটনার পর তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে ওডিশার নবগঠিত মোহন মাঝি সরকারের ওপর। প্রশাসনের তরফ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে যে, সামগ্রিকভাবে রথযাত্রা উৎসব অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। পরিকাঠামোগত সুরক্ষায় কোনও খামতি ছিল না এবং ভিড়ের কারণে বড় কোনও পদদলিত হওয়ার ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

রাজ্যে ক্ষমতাহীন হওয়া নবীন পট্টনায়কের দল এই সাফাই কিন্তু মেনে নিতে নারাজ। ওডিশার দীর্ঘকালীন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বর্তমান বিরোধী দলনেতা রথযাত্রার এই জোড়া মৃত্যুর ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক শোকবার্তায় তিনি পুণ্যার্থীদের সুরক্ষাকে সুনিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি দায়বদ্ধতা বৃদ্ধির কড়া বার্তা পাঠিয়েছেন।

অন্যদিকে, এই বিষয়ে চরম রাজনৈতিক আক্রমণ শানিয়েছে কংগ্রেস দল। ওডিশা প্রদেশ কংগ্রেসের বর্ষীয়ান সভাপতি ভক্ত চরণ দাস সরাসরি বর্তমান বিজেপি সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের চূড়ান্ত দূরদর্শিতার অভাবে এবং অব্যবস্থার কারণেই এই দুই পুণ্যার্থীর আকস্মিক জীবনহানি ঘটেছে। এই ধরনের অবহেলা মেনে নেওয়া যায় না।

রথযাত্রার মতো আন্তর্জাতিক স্তরের বৃহৎ ধর্মীয় জমায়েতে পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তার খামতি নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। গত বছরের রথযাত্রাতেও গুন্ডিচা মন্দিরের কাছে চরম বিশৃঙ্খলার জেরে পদদলিত হয়ে তিন পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছিল। অতীতের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারও যদি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতো, তবে হয়তো এই প্রাণহানি আটকানো যেত।

যদিও সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি সফল রথযাত্রার জন্য সেবাইত ও সমস্ত ভক্তদের শৃঙ্খলার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি প্রশাসনিক আধিকারিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার পুরীর পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আগামী বছরগুলিতে যাতে পুণ্যার্থীরা আরও সুষ্ঠু ও সুরক্ষিত উপায়ে ভগবানকে দর্শন করতে পারেন, তার চেষ্টা করা হবে।

আর্দ্র আবহাওয়া ও জনজোয়ারের যৌথ সমীকরণ সামাল দেওয়া পুলিশ ও রাজনৈতিক প্রশাসনের কাছে এক বড় শিক্ষা। পুরীর রথযাত্রার এই দুঃখজনক ঘটনা জানান দেয় যে কেবল কয়েক হাজার বাহিনী মোতায়েন করলেই নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হয় না। পুণ্যার্থীদের সুরক্ষাকেই প্রতিটি উৎসবের মূল ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা উচিত, যাতে পুণ্য অর্জন করতে এসে কাউকে ঘরের মানুষের কাছে লাশ হয়ে ফিরতে না হয়।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+