নতুন ভোটারদের জন্য বড় আপডেট! তালিকায় নাম তুুলতে গেলে করতেই হবে এই কাজটি
ভারতে নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার নিয়মে বড়সড় বদল এনেছে নির্বাচন কমিশন। এবার থেকে প্রথমবার ভোটার তালিকায় নাম তুলতে গেলে আবেদনকারীকে তাঁদের পিতামাতা বা অভিভাবকের পূর্ববর্তী ভোটার তালিকার তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিশেষ করে, বিগত 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' বা এসআইআর (SIR) সংশোধনী প্রক্রিয়ায় পিতামাতার নাম ছিল কি না, তা স্পষ্ট করে জানাতে হবে।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনলাইন মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত 'ফর্ম ৬' (Form 6)-এ এই নতুন নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। কোনও নতুন আবেদনকারী যদি তাঁর পিতামাতা বা পূর্বপুরুষদের নাম সংক্রান্ত এই তথ্য না দেন, তবে তিনি অনলাইনের মাধ্যমে ফর্ম পূরণের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে পারবেন না। ফলে নতুন ভোটারদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাধ্যতামূলক ধাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের পোর্টাল 'ইসিআইনেট' (ECINET)-এ এই পরিবর্তনের পর এখন অনলাইনে ফর্ম ৬-এর পার্ট জে (Part J) এবং পার্ট কে (Part K)-এর মাঝখানে একটি নতুন ঘোষণা বা ডিক্লেয়ারেশন ঘর যুক্ত করা হয়েছে। এখানে নতুন ভোটারদের তিনটি বিকল্পের মধ্যে যেকোনও একটি বেছে নিতে বলা হচ্ছে, যা তাঁদের পারিবারিক নথির সত্যতা যাচাই করতে সাহায্য করবে এবং আবেদন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখবে।
এই ডিক্লেয়ারেশনে আবেদনকারীদের সামনে যে তিনটি বিকল্প রাখা হয়েছে, সেগুলি হল— প্রথমত, পূর্ববর্তী এসআইআর তালিকায় আবেদনকারীর নিজের নাম ছিল কিনা; দ্বিতীয়ত, বিগত এসআইআর তালিকায় ওনাদের পিতা, মাতা বা কোনো আইনসম্মত অভিভাবকের নাম নথিভুক্ত ছিল কিনা; এবং তৃতীয়ত, পূর্ববর্তী সেই সংশোধিত তালিকায় আবেদনকারী বা তাঁর পিতামাতা কারওরই নাম ছিল না।
আবেদনকারী যদি প্রথম দুটি বিকল্পের মধ্যে যেকোনও একটি বেছে নেন, তবে তাঁকে বেশ কিছু অতিরিক্ত তথ্য দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে পূর্ববর্তী এসআইআর চলাকালীন সংশ্লিষ্ট বিধানসভা কেন্দ্রের নাম, পোলিং বুথ বা ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের নম্বর এবং ভোটার তালিকার ক্রমিক সংখ্যা। আর যাঁদের ক্ষেত্রে এই দুটির একটিও প্রযোজ্য নয়, তাঁরা সরাসরি তৃতীয় বিকল্পটি বেছে নিতে পারবেন।
সরকারি বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই কার্যকর প্রশাসনিক নির্দেশ
মজার বিষয় হল, ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধি (Registration of Electors Rules) আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধন করে কোনও গেজেট বিজ্ঞপ্তি এখনও জারি করা হয়নি। তা সত্ত্বেও দেশের শীর্ষ নির্বাচন কমিশন প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে অনলাইন পোর্টালে এই বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আধিকারিকদের মতে, অনলাইন আবেদনের ক্ষেত্রে এই ঘরটি পূরণ না করে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই।
কমিশনের এক উচ্চপদস্থ সূত্র থেকে জানা গিয়েছে, গত বছরের জুন মাসে বিহারে যখন নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তখন পরীক্ষামূলকভাবে এই নিয়মটি প্রথম চালু করা হয়। বিহারের সেই দৈনিক এসআইআর বুলেটিনগুলিতে এই ঘোষণার মাধ্যমে পোর্টাল মারফত ফর্ম পূরণের বিষয়টি নিয়মিত নথিবদ্ধ করা হতো। সেখানে সফলতা মেলার পরই এটি দেশজুড়ে চালু করা হল।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, কেরল এবং তামিলনাড়ুর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলিতে ইতিমধ্যেই নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়েছে। অন্যান্য আরও বেশ কিছু রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেও এই কাজ পুরোদমে চলছে। যেসব জায়গায় একবার এই সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে, সেখানেই নতুন অনলাইন আবেদনের ক্ষেত্রে এই নিয়ম বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করা হচ্ছে বলে কমিশন সূত্রে খবর।
নতুন নিয়ম চালু করার কারণ ও এর প্রভাব
নির্বাচন কমিশনের মতে, এই নতুন নিয়মের ফলে নির্বাচকমণ্ডলীর সঠিক ম্যাপিং বা পরিবারের নকশা তৈরি করা অনেক সহজ হবে। এর হাত ধরে নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার জন্য আবেদনপত্রের সঙ্গে এত দিন যেসব অতিরিক্ত নথিপত্র বা কাগজের প্রমাণপত্র জমা দিতে হতো, তার পরিমাণও অনেকটাই কমে যাবে। এর ফলে সামগ্রিক ভোটার তালিকা আরও নির্ভুল ও স্বচ্ছ হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এমনিতেই দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ফর্ম ৬ পূরণ করার সময় আবেদনকারীকে তাঁর সঙ্গে বসবাসকারী পরিবারের সদস্যদের তথ্য এবং তাঁদের ভোটার আইডি বা এপিক (EPIC) নম্বর দিতে হয়। এখন নতুন এসআইআর সংযোজনীর মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়াকে আরও বিস্তারিত করা হল, যা ভুয়ো ভোটারদের প্রবেশ রুখতে এবং একই মানুষের একাধিক জায়গায় নাম থাকা বন্ধ করতে সাহায্য করবে।
সারা দেশজুড়ে নির্বাচন কমিশন বর্তমানে ভোটার তালিকা থেকে ভুয়ো, মৃত, স্থানান্তরিত বা দুই জায়গায় নাম থাকা ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। অনেক সময় এক ব্যক্তির নাম একের বেশি কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় থেকে যায়, যা বন্ধ করাই এই নিবিড় সংশোধনের উদ্দেশ্য। তবে এই প্রক্রিয়ার ফলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভোটার তালিকা থেকে প্রচুর মানুষের নাম বাদ যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
তবে কমিশনের এই পদক্ষেপের ফলে কিছু বিভ্রান্তিও তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মনে। বিশেষ করে যারা তৃতীয় বিকল্পটি অর্থাৎ "তালিকায় পিতা বা মাতার নাম ছিল না" বেছে নিচ্ছেন, তাঁদের আবেদনের উপর এর কি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে স্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি। এর ফলে অনেকের মনেই আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে আগামী দিনের আবেদন মঞ্জুর হওয়া নিয়ে।
সাধারণ মানুষ এবং ভোটারদের একাংশের মতে, ভারতের মতো বিশাল দেশে যেখানে এখনও অনেক প্রান্তিক এবং অনগ্রসর পরিবারের ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে চরম অসচেতনতা রয়েছে, সেখানে এই ধরনের অনলাইন জটিলতা বা কঠোর নিয়ম কার্যকর করার আগে ব্যাপক প্রচারের প্রয়োজন ছিল। তা না হলে অনেক যোগ্য নাগরিকই এই টেকনিক্যাল কারণে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
সবমিলিয়ে বলা যায়, নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশুদ্ধতা বজায় রাখার স্বার্থে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং যাচাইকরণ ব্যবস্থার সংস্কার অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ। তবে তা যেন সাধারণ এবং প্রথমবার আবেদনকারী ভোটারদের জন্য বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে নজর দেওয়াও কমিশনের দায়িত্ব। এই নতুন নিয়মের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আগামী দিনে কমিশন নতুন কোনও সহায়তামূলক গাইডলাইন প্রকাশ করে কিনা, সেটাই দেখার।












Click it and Unblock the Notifications