১৭,২০০ কোটি টাকার মেগা ডিল! ভারতের গ্রিন এনার্জি সেক্টরে নতুন দিশা দিতে চলেছে আদিত্য বিড়লা গ্রুপ
ভারতের পরিবেশ-বান্ধব ও নবীকরণযোগ্য শক্তি সেক্টরে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চলেছে ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অগ্রণী শিল্প গোষ্ঠী আদিত্য বিড়লা গ্রুপ। বহুজাতিক তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র পরিচালনাকারী বিখ্যাত সংস্থা 'শেল'-এর মালিকানাধীন গ্রিন এনার্জি সরবরাহকারী ভারতীয় প্রতিষ্ঠান 'স্প্রিং এনার্জি'-কে অধিগ্রহণ করার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে তারা। ১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৭,২০০ কোটি টাকার এই বিরাট চুক্তিটি ভারতের পরিবেশ-বান্ধব জ্বালানি সেক্টরের অন্যতম বৃহৎ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সংযোজন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
এই মেগা চুক্তিটি সম্পাদিত হচ্ছে মূলত আদিত্য বিড়লা গ্রুপের ফ্ল্যাগশিপ কোম্পানি গ্রাসিম ইন্ডাস্ট্রিজের সরাসরি সহযোগী শাখা 'আদিত্য বিড়লা রিনিউয়েবলস লিমিটেড'-এর অধীনে। বাণিজ্যিক এবং সেক্টর ভিত্তিক নিয়ম মেনে প্রস্তাবিত এই ক্রয় প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ সুচারুভাবে কার্যকর হতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি ও নিয়ন্ত্রক দফতরের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই অধিগ্রহণের পর আদিত্য বিড়লা গ্রুপের নিজেদের মোট নবীকরণযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন এবং সরবরাহ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, যা তাদের বর্তমান ক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ শক্তি জোগাবে।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বা গ্রিন এনার্জি উৎপাদন ক্ষেত্রে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নিজেদের অবস্থানকে বহুগুণ মজবুত করার এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে আদিত্য বিড়লা গ্রুপ। তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, আগামী তিন বছরের মধ্যে নিজেদের সামগ্রিক নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের যৌথ পরিকাঠামোকে বাড়িয়ে প্রায় ২০ গিগাওয়াট পর্যন্ত বর্ধিত করা। স্প্রিং এনার্জির সমন্বয় তাদের এই উচ্চাভিলাষী দেশের অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে পৌঁছনোর কাজটিকে সহজ করবে ও প্রয়োজনীয় গতিশীলতা প্রদানকারী দীর্ঘমেয়াদি এক ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করবে।
বর্তমানে নতুন অধিগ্রহণ করা এই স্প্রিং এনার্জির ঝুলিতে রয়েছে ভারতের একাধিক রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তৃত সৌর ও কয়লাবিহীন বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ পরিকাঠামো। এর মধ্যে থাকা বেশ কিছু পরিকাঠামো ইতিমধ্যেই গ্রিডের সাথে যুক্ত হয়ে পূর্ণ মাত্রায় সচল রয়েছে এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এখনও নির্মাণ ও পরিকল্পনার স্তর পার করছে। এই বৈচিত্র্যময় সম্পদ হাতের কাছে চলে আসার কারণে গ্রুপটি ভারতের বৃহৎ বাণিজ্যিক ও ভারী শিল্প গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান পরিষ্কার বিদ্যুতের প্রয়োজন অনায়াসে মেটাতে সক্ষম হবে।
এই মাইলফলক ছোঁয়া কৌশলগত অধিগ্রহণকে তাঁদের সমগ্র পরিবেশ-বান্ধব শক্তির যাত্রার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন আদিত্য বিড়লা গ্রুপের প্রধান কুমার মঙ্গলম বিড়লা। তিনি জানান, "এই নির্দিষ্ট চুক্তিটি আমাদের দীর্ঘমেয়াদী অগ্রগতির দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবায়িত করবে। এর দ্বারা আমরা এক সমৃদ্ধ ও বিশ্বমানের পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম গড়তে চাই, যা দেশের সবুজ জ্বালানি প্রকল্পের গতি এবং ক্রমবর্ধমান ক্লিন বিদ্যুতের সুনির্দিষ্ট চাহিদার সঙ্গে ভীষণভাবে মানানসই। এই বিশাল লগ্নি আমাদের পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতিকেও স্পষ্ট করে তোলে।"
অন্য এক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ব্রিটিশ শক্তি বিপণনকারী খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান 'শেল'-এর জন্য ভারতের এই বাজার থেকে সরে যাওয়া তাদের সামগ্রিক বৈশ্বিক ব্যবসা নতুন করে সাজানোর এক সুচিন্তিত পদক্ষেপ। ২০২২ সালে মূলত স্প্রিং এনার্জিকে নতুন মালিকানায় অধিগ্রহণ করেছিল শেল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের আন্তর্জাতিক বিশ্ববাজারে যেখানে বিনিয়োগের ওপর সুদূরপ্রসারী রিটার্ন বা আর্থিক ফল বেশি পাওয়া সম্ভব, সেই ক্ষেত্রগুলিতে মূলধন বাড়াতেই তারা ভারতের সম্পদ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়।
আজকের দিনে বৈশ্বিক শক্তি নিয়ন্ত্রক কোম্পানিগুলো প্রায়শই উন্নয়নশীল দেশগুলির নির্দিষ্ট সম্পত্তি পুনর্মূল্যায়ন করে থাকে। বহুজাতিক সংস্থাগুলির এই জাতীয় বিশ্বজনীন মূলধন পুনর্বণ্টনের কারণে সম্পদ হস্তান্তরের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। স্প্রিং এনার্জির এই হাতবদল তেমনই একটি দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত, যেখানে একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল জায়ান্টরা নিজেদের মূল ব্যবসা ছোট করে লাভের অংশে গভীর মনোযোগ দিচ্ছে, ঠিক তখনই অন্যদিকে ভারতের অগ্রণী বাণিজ্যিক পরিবারগুলি সেই পরিচ্ছন্ন সম্পদ অধিগ্রহণ করছে।
| চুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য | বিস্তারিত বিবরণ |
|---|---|
| নতুন মূল মালিকানা | আদিত্য বিড়লা রিনিউয়েবলস লিমিটেড (ABRen) |
| পুরনো মূল মালিকানা | শেল (স্প্রিং এনার্জি প্ল্যাটফর্ম) |
| লেনদেনের আনুমানিক মূল্য | ১.৮ বিলিয়ন ডলার (১৭,২০০ কোটি টাকা প্রায়) |
| অর্জিত পোর্টফোলিও ক্ষমতা | ৯.৪ গিগাওয়াট পর্যন্ত দ্বিগুণ বৃদ্ধি |
| মধ্যমেয়াদী লক্ষ্য | আগামী ৩ বছরে ২০ গিগাওয়াট সম্পন্ন করা |
ভারতের সামগ্রিক জলবায়ু রূপান্তর এবং টেকসই সবুজ পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যমাত্রার নিরিখে এই মেগা ডিলের প্রয়োজন অসীম। ২০৩০ সালের মধ্যে পুরোপুরি জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত উৎস থেকে অন্তত ৫০০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক দৃঢ় লক্ষ্য সামনে রেখেছে ভারত সরকার। এই বৃহৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের সময়ে বেসরকারি ক্ষেত্রগুলির এই ধরনের বৃহৎ আকারের বিনিয়োগ ভারতের ক্লিন এনার্জির অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের আত্মনির্ভর সবুজ শক্তির দীর্ঘমেয়াদি বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে।
এই ধরনের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ভারতের বিদ্যুৎ বন্টন গ্রিডের নবীকরণযোগ্য শক্তির সংযোগ অনেক বেশি সরল ও মজবুত হবে। ফলে বড় বড় ভারী কারখানা ও বেসরকারি শিল্প এলাকা কয়লা এবং পরিবেশের ক্ষতিসাধনকারী প্রথাগত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমাতে সাহায্য পাবে। আদিত্য বিড়লা গ্রুপ যে একক বৃহত্তম আধুনিক সবুজ বিদ্যুতের হাব হিসেবে নিজেদের রূপ দিচ্ছে, তা আগামী দিনগুলিতে শিল্প কল-কারখানার কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা ক্ষতিকর ধোঁয়ার প্রভাব কমানোর সবচেয়ে বড় সহায়ক হবে।
নিয়ন্ত্রকদের কাছ থেকে সমস্ত প্রয়োজনীয় মান্যতা এবং কর সংক্রান্ত সবুজ সংকেত মিটে যাওয়ার পর, আদিত্য বিড়লা গ্রুপ অদূর ভবিষ্যতেই দেশের অন্যতম বৃহত্তম ক্লিন এনার্জি ব্র্যান্ড হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে। এটি কেবল তাদের নিজেদের দীর্ঘস্থায়ী কর্পোরেট দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটাবে না, বরং বিশাল জনসংখ্যার দেশ ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সচল রেখেই সামগ্রিক সবুজায়নের পথকে মসৃণ ও স্থায়ী করবে। এই নতুন পথচলা দেশের আর্থিক সমৃদ্ধি এবং পরিবেশ চেতনার মাঝে এক অভিনব মেলবন্ধন তৈরি করল।












Click it and Unblock the Notifications