সর্বদলীয় বৈঠকে নজিরবিহীন হট্টগোল! আসন বিন্যাস নিয়ে কেন ক্ষোভে ফেটে পড়ল ইন্ডিয়া জোট?

সংসদের আসন্ন বাদল অধিবেশন শুরুর আগেই রবিবার রাজধানীর আবহ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। কেন্দ্রের ডাকা সর্বদলীয় বৈঠকে এক নজিরবিহীন নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হল, যখন বিরোধী 'ইন্ডিয়া' জোটের সাংসদরা তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে দেওয়া পৃথক বসার ব্যবস্থার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করলেন। তবে এই পদক্ষেপটি মূলত প্রতীকী প্রতিবাদ ছিল, কারণ বিরোধী নেতৃত্ব ক্ষোভ দায়ের করার পর পুনরায় বৈঠকে ফিরে এসে আলোচনায় যোগ দেন।

সোমবার, ২০ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ১৩ অগাস্ট পর্যন্ত চলা বাদল অধিবেশনের আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত রূপরেখা এবং বিভিন্ন বিল পাসের বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তুলতেই এই সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হয়েছিল। নতুন দিল্লির সংসদ অ্যানেক্স ভবনে সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু এই বৈঠকের আহ্বান করেন। যেখানে সরকারের প্রতিনিধি দলের পাশাপাশি লোকসভা ও রাজ্যসভার সমস্ত প্রধান বিরোধী দলের ফ্লোর লিডাররা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু বৈঠকের শুরুতেই আসন বিভাজন সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে।

Opposition leaders protesting at parliament all-party meeting

বিতর্কের কেন্দ্রে বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের পৃথক আসন বিন্যাস

বৈঠক সূত্রে খবর, তৃণমূল কংগ্রেসের দলত্যাগী প্রায় ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ নিজেদের 'ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস অফ প্রোগ্রেসিভ ইন্ডিয়া' (NCPI) নামে পরিচিত করছেন। তাঁরা মূল তৃণমূল নেতাদের পাশে বসতে অসম্মতি জানানোয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রক তাঁদের পৃথক আসন বণ্টন করে। এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার কথা জানতে পেরেই ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলির সাংসদেরা চরম আপত্তি তোলেন এবং প্রতিবাদের পথ বেছে নেন যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলে।

তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র স্পষ্ট ভাষায় প্রশ্ন তোলেন, দলের অভ্যন্তরীণ ফাটলকে আইনসভার অভ্যন্তরে কীভাবে সরকার স্বীকৃতি দিতে পারে। কারণ ভারতের সংবিধানের দলত্যাগ বিরোধী আইন অনুযায়ী, কোনও বড় দলের ভাঙন বা ভাগের ক্ষেত্রে লোকসভার স্পিকারের অনুমোদন বা রায় আবশ্যক। এখানে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এখনও পর্যন্ত তৃণমূলের এই ২০ জন বিদ্রোহীকে কোনও নতুন সংসদীয় দল হিসেবে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেননি এবং তাঁদের সংসদীয় পদ খারিজের আবেদনও বিচারাধীন রয়েছে।

মহুয়া মৈত্রের কথায়, "ওই ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদদের দলত্যাগের মামলা এখনও স্পিকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। সংবিধানের ৯১তম সংশোধনীর পর আইনসভার ভিতরে পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কোনও অবকাশ নেই। যখন বিষয়গুলি অমীমাংসিত, তখন কোন আইনি ক্ষমতায় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী তাঁদের বৈঠকে ডাকলেন এবং পৃথক বসার ব্যবস্থা করে দিলেন? এর বিরোধিতা করতেই আমরা সব বিরোধী জোটের দল মিলে ওয়াকআউট করেছি এবং আপনাদের ধন্যবাদ জানাই।"

অসাংবিধানিক সিদ্ধান্তের অভিযোগ কংগ্রেস ও শরিকদের

মহুয়ার এই প্রতিবাদের সুরে জোরদার সমর্থন জুগিয়েছেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তথা সাংসদ প্রমোদ তিওয়ারিও। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, স্পিকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই সরকারের এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণ রূপে অসাংবিধানিক এবং অন্যায়। লোকসভার সর্বোচ্চ অভিভাবকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে সরকারি স্তরে এই প্রকার সিদ্ধান্ত নেওয়াকে তাঁরা সংসদীয় রীতিনীতির পরিপন্থী বলে মনে করছেন। বিরোধী দলগুলি মূলত দেশের সংবিধানের পবিত্রতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষা করার তাগিদেই একজোটে এই প্রতীকী ওয়াকআউটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।

শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) দলের বর্ষীয়ান সাংসদ অরবিন্দ সাওয়ন্ত এবং আম আদমি পার্টি (আপ)-র রাজ্যসভার সাংসদ এন ডি গুপ্তাও সরকারের পক্ষপাতের কড়া সমালোচনা করেছেন। সাওয়ন্ত প্রশ্ন তোলেন, ঠিক কোন আইনি ক্ষমতার ভিত্তিতে বা দেশের কোন সুনির্দিষ্ট সংসদীয় নিয়মে এই দলত্যাগী বিদ্রোহীদের একটি পৃথক সংসদীয় দলের মর্যাদা দিয়ে বসার ব্যবস্থা করা হলো। সরকার কী কারণে নিয়মের তোয়াক্কা না করে এক তরফা ভাবে এই সিদ্ধান্ত নিল, তাই নিয়ে বিতর্ক জমে ওঠে।

অন্যদিকে ভারতের বর্তমান সংসদীয় রাজনীতিতে আপ-এর প্রতিনিধি এন ডি গুপ্তা তাঁদের নিজস্ব একটি অনুরূপ সংকটের বিবরণ দিয়ে শাসকদলের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, অনৈতিকভাবে দল ভাঙাতে বেশ কয়েকজন সাংসদকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। বিচারাধীন এই সব স্পর্শকাতর বিষয়ে আইনকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বিদ্রোহীদের সরাসরি পৃথক আসন দেওয়ার মতো সরকারি পদক্ষেপ গণতন্ত্রকে কালিমালিপ্ত করে। এই কারণে বিরোধী জোটের ঐকমত্য বজায় রেখে একটি শক্ত বার্তা দিতে তাঁদের ওয়াকআউট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আসন বিন্যাসকে কেন্দ্র করে এই রাজনৈতিক বিক্ষোভ চললেও, বহু আলোচিত বাদল অধিবেশনের বিভিন্ন প্রস্তাব ও বিল নিয়ে শাসক এবং বিরোধী পক্ষের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সরকার এবং ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে অংশগ্রহণকারী প্রধান নীতি নির্ধারক ও উপস্থিত সদস্যদের তালিকা নিচে বিশদভাবে পরিবেশন করা হলো:

রাজনৈতিক পক্ষ বৈঠকে উপস্থিত থাকা মুখ্য প্রতিনিধিগণ
সরকারি প্রতিনিধি প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা, সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু, সংসদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল।
ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব জয়রাম রমেশ, তিরুচি শিবা, সুপ্রিয়া সুলে, ধরমেন্দ্র যাদব, সৌগত রায়, মহুয়া মৈত্র, কে সুরেশ, প্রমোদ তিওয়ারি, অরবিন্দ সাওয়ন্ত প্রমুখ।

জনস্বার্থবাহী বিভিন্ন আইনি কর্মকাণ্ডের স্বার্থে ইন্ডিয়া জোট ফের আলোচনায় অংশ নিলেও, রবিবারের এই ঘটনা বাদল অধিবেশনের ভবিষ্যৎ রূপরেখাকে স্পষ্ট করে তুলল। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ২০ জুলাই থেকে শুরু হতে চলা অধিবেশনে বিদ্যুৎ সংশোধন বিল, মূল্যবৃদ্ধি এবং রাজ্যগুলির অধিকার খর্ব হওয়ার মতো বিতর্কিত ইস্যুগুলিতে ট্রেজারি বেঞ্চ এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র বাগযুদ্ধ ও লোকসভায় উত্তপ্ত সংঘাত ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+