আহমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনার একবছর পার! কোন পর্যায়ে রয়েছে এআই-১৭১ ট্র্যাজেডির তদন্ত?
আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-১৭১ (AI171) বিমান দুর্ঘটনার এক বছর পূর্ণ হওয়ার আবহে এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB) এই ট্র্যাজেডি সম্পর্কে তাদের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালের ১২ জুন আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে ওড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বোয়িং ৭৮৭-৮ বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। ২৬০ জনের প্রাণহানি ঘটানো এই বিপর্যয়ের তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং চূড়ান্ত প্রমাণের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের কাজ চলছে বলে এএআইবি জানিয়েছে।
লন্ডনের গ্যাটউইকগামী বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমানটি আহমেদাবাদের অদূরে বি জে মেডিকেল কলেজের হস্টেল চত্বরে ভেঙে পড়েছিল। দুর্ঘটনায় বিমানের ২৪২ জন আরোহীর মধ্যে ২৪১ জনেরই মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এছাড়া মাটিতে থাকা হোস্টেলের বেশ কয়েকজন সাধারণ নাগরিকও সেই সময় প্রাণ হারান, যার ফলে মোট মৃতের সংখ্যা ২৬০-এ পৌঁছয়। ২০১১ সালে বাণিজ্যিক পরিষেবা শুরুর পর এটিই ছিল বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের ইতিহাসে প্রথম প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

তদন্তকারী ব্যুরো স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই দুর্ঘটনাটির তদন্ত সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও নিয়ম মেনে এগিয়ে চলেছে। ভারতের ২০১৭ সালের বিমান দুর্ঘটনার অনুসন্ধান সংক্রান্ত আইনি নিয়মাবলী এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নিয়ম মেনে এই অতি সংবেদনশীল অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যেই প্রযুক্তিগত, কার্যক্ষমতা ও মানুষের ভুলত্রুটির মতো জটিল বিষয়গুলি পর্যালোচনায় যুক্ত করা হয়েছে।
তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে দেশের বেসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক জানিয়েছে, "সংগৃহীত প্রমাণ এবং পরীক্ষার ফলাফলগুলি বর্তমানে একীকরণ ও বিস্তারিত সমন্বয়ের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।" এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় এএআইবি উল্লেখ করেছে যে, বিমানের ফ্লাইট রেকর্ডার সামগ্রী, ইঞ্জিনের সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ, বিমানের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পুরনো রেকর্ড এবং ফ্লাইট অপারেশনাল ডকুমেন্টের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে "উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি" অর্জিত হয়েছে।
চূড়ান্ত অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট প্রকাশে বিলম্বের মূল কারণ হিসেবে বোয়িং ৭৮৭ বিমানের 'জিই অ্যারোস্পেস’ ইঞ্জিনের জটিল কারিগরি বিশ্লেষণ চলমান থাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় দেশের বাইরের বোয়িং কোম্পানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড এবং ব্রিটেনের তদন্তকারী সংস্থাগুলি যুক্ত রয়েছে। নিয়মানুযায়ী, চূড়ান্ত রিপোর্ট সামনে আনার আগে প্রতিটি অংশীদার সংস্থার মতামত নেওয়া এবং ড্রাফ্ট রিপোর্ট পর্যালোচনা করা বাধ্যতামূলক।
তদন্তকারী ব্যুরো এএআইবি আবার নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, এই ধরণের বিমান দুর্ঘটনা সংক্রান্ত অনুসন্ধানের মূল লক্ষ্য কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে দোষী সাব্যস্ত করা বা আইনি দায় চাপানো নয়। বরং মূল উদ্দেশ্য হলো আগের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীতে বিমান চালানোর যাত্রাপথকে আরও বেশি সুরক্ষিত করা। দুর্ঘটনার প্রথম বার্ষিকীতে শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলির প্রতি তারা গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করেছে।
দুর্ঘটনার এক মাস পর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১২ জুলাই প্রকাশিত প্রাথমিক রিপোর্টটিতে বিমানের শেষ মুহূর্তের অতি সংবেদনশীল তথ্যগুলি প্রকাশ করা হয়েছিল। তাতে দেখা যায়, বোয়িং ড্রিমলাইনার বিমানটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ও স্বাভাবিক নিয়মেই আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে আকাশে ডানা মেলেছিল। কিন্তু ওড়ার সামান্য কিছুক্ষণের মধ্যেই অদ্ভুতভাবে বিমানের দুটি প্রধান ইঞ্জিনের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণকারী সুইচ 'রান’ মোড থেকে আচমকা 'কাটঅফ’ হয়ে যায়।
ককপিটের ভয়েস রেকর্ডার থেকে পাওয়া চাঞ্চল্যকর কথোপকথনে শোনা গিয়েছে, ঘটনার সময় ফ্লাইটের এক চালক অপরজনকে তীব্র উৎকণ্ঠার সঙ্গে জিজ্ঞাসা করছেন কেন তিনি ইঞ্জিনের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিলেন। এর বিপরীতে থাকা দ্বিতীয় পাইলট স্পষ্ট ভাষায় তীব্র বিস্ময়ের সাথে জানিয়েছিলেন যে তিনি নিজে এমন কোনো পদক্ষেপ করেননি। দুই ইঞ্জিনেরই জ্বালানি সরবরাহ আকস্মিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় মুহূর্তেই বিমানটি প্রচণ্ডভাবে গতি হারাতে শুরু করে।
বিমানের চালকরা অবশ্য সুইচগুলিকে সাথে সাথেই পুনরায় 'রান’ মোডে ফিরিয়ে এনে স্বয়ংক্রিয় স্টার্টআপ প্রক্রিয়া সচল করতে চেষ্টা চালিয়েছিলেন। এই মরিয়া প্রচেষ্টায় বিমানের একটি ইঞ্জিনের প্রাণ ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিত মিললেও দ্বিতীয় জটিল ইঞ্জিনটি নিজেকে সচল করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। অত্যন্ত অল্প উচ্চতায় ও কম গতিতে থাকার কারণে ককপিট থেকে শুধুমাত্র একটি বিপদ সংকেত বা 'মেডে' কল বিমানবন্দরকে পাঠানো সম্ভব হয়েছিল।
বিপর্যয়ের এক বছর পার হওয়ার সাথে সাথেই নিহত পরিবারগুলিকে দেওয়া আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টি তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে। বিমান দুর্ঘটনায় নিহত গুজরাটের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রুপানির মেয়ের সরাসরি অভিযোগ ছিল, ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের বদলে বিমান সংস্থাটি তাদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে যেকোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার অনৈতিক চেষ্টা করছে।
এয়ার ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই গুরুতর অভিযোগটিকে খারিজ করে বলেছে যে, এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ গ্রহণের বিষয়ে নিহতদের পরিবারের ওপর "কোনো রকম সময়সীমা বা চাপ" তৈরি করা হচ্ছে না। তাছাড়া ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত চুক্তির আইনি শর্তাবলী বিমান চলাচল শিল্পে ব্যবহৃত সাধারণ নিয়ম ও বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করেই তৈরি। চূড়ান্ত ক্ষতিপূরণের হিসাব প্রতিটি মৃত ব্যক্তির বয়স, উপার্জন ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের সংখ্যার ভিত্তিতে করা হচ্ছে।
নিহতদের প্রায় ৯৬ শতাংশ পরিবার ইতিমধ্যে ২৫ লক্ষ টাকা করে প্রাথমিক ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন বলে এয়ার ইন্ডিয়া দাবি করেছে। এর পাশাপাশি ৯১ শতাংশ বিড়ম্বিত পরিবারকে মেমোরিয়াল ট্রাস্টের মাধ্যমে ঘোষিত ১ কোটি টাকার অনুদানও প্রদান করা হয়েছে। তবে ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান পাইলটস (FIP) আংশিক রিপোর্ট পেশে চরম সংশয় প্রকাশ করে দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে যাতে জল্পনা কমানো সম্ভব হয়।
বিজে মেডিক্যাল কলেজের নিকটবর্তী আবাসিক এলাকায় আছড়ে পড়া বিমানটির মর্মান্তিক পরিণতি এখনো দেশের আকাশপথ সুরক্ষার প্রশ্নে গভীর ক্ষতচিহ্ন এঁকে রেখেছে। এএআইবি জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিক পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে শেষ রিপোর্ট তৈরি করা হবে। তবে বিমান চালকদের আপত্তি ও নিহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত ক্ষোভ দূর করে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টের আসার পরই আসল রহস্য সামনে আসবে।












Click it and Unblock the Notifications