শেয়ার বাজারে স্পেসএক্সের অভাবনীয় সাফল্য! বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার হলেন ইলন মাস্ক
মার্কিন শেয়ার বাজারে প্রথম দিনেই অভূতপূর্ব সাফল্য পেল বেসরকারি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্স। শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিটে সংস্থাটির অভিষেক পর্বটি ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ। প্রথম দিনেই কোম্পানিটির শেয়ারের দর প্রায় ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অভাবনীয় সাফল্যের হাত ধরে স্পেসএক্সের সিইও ইলন মাস্ক বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার বা লক্ষ কোটিপতি হিসেবে নিজের নাম ইতিহাসের পাতায় নথিভুক্ত করলেন।
এদিন লেনদেন শুরুর সময় স্পেসএক্সের প্রতিটি শেয়ারের প্রাথমিক মূল্য ছিল ১৫০ ডলার। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক চাহিদার কারণে এই দর আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে শেয়ারের দাম এসে দাঁড়ায় ১৬৬.৯০ ডলারে। শেয়ার বাজারের প্রথম দিনেই এমন ক্রমাগত দরবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

ডিজিটাল দুনিয়া কাঁপানো এই শেয়ারের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির ফলে শুক্রবার স্পেসএক্সের মোট বাজার মূল্য বা মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন ২.১৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গিয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থমূল্য বিশ্বের খুব কম প্রতিষ্ঠানেরই রয়েছে। একই সাথে বিশ্বখ্যাত ব্যবসায়িক সাময়িকী ফোর্বসের নতুন হিসাব অনুযায়ী, ইলন মাস্কের নিজস্ব মোট সম্পদের পরিমাণ এখন আনুমানিক ১.১ ট্রিলিয়ন ডলারে স্পর্শ করেছে, যা একটি নতুন বিশ্বরেকর্ড।
শেয়ার বাজার বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, স্পেসএক্সের শেয়ার কেনার জন্য সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা গেছে। বাজারে ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগকারী এই পাবলিক অফারে অংশ নেন। বিনিয়োগকারীরা স্পেসএক্সের প্রায় ৫৫ কোটি ৫৬ লক্ষ (৫৫৫.৬ মিলিয়ন) শেয়ার কেনার জন্য উপচে পড়েন, যার অফার মূল্য নির্ধারিত ছিল প্রতি শেয়ার ১৩৫ ডলার।
স্পেসএক্সের প্রাথমিক শেয়ারের দাম যখন ১৩৫ ডলার ঘোষণা করা হয়, তখন অনেকেই এর ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু লেনদেনের প্রথম দিনই সমস্ত আশঙ্কার অবসান ঘটিয়ে তা আকাশচুম্বী আকার ধারণ করে। শুরুতেই ১৫০ ডলার স্পর্শ করার পর তা ১৬৬.৯০ ডলারে চলে যাওয়া বিনিয়োগকারীদের অনবদ্য আগ্রহের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, যা আইপিও ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।
এই আইপিও বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাব থেকে স্পেসএক্স মোট ৭৫ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের ঘটনাটি কর্পোরেট ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক রেকর্ড সৃষ্টি করল। এর আগে ২০১৯ সালে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো তাদের আইপিও থেকে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছিল। স্পেসএক্স এবার আরামকোর সেই দীর্ঘদিনের রেকর্ডটি খুব সহজেই ভেঙে দিল।
সৌদি আরামকোর আইপিও ছিল তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে বড় ঘটনা, যা সারা বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের নজর কেড়েছিল। কিন্তু স্পেসএক্সের এই নতুন মহাজাগতিক অগ্রযাত্রা পুঁজিবাজারের সমস্ত সমীকরণ বদলে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় বড় বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলো এখন মহাকাশ প্রযুক্তির এই অগ্রণী প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হতে উন্মুখ হয়ে রয়েছেন, যা এই রেকর্ড ভাঙা সাফল্যে স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে।
মহাকাশের এই অবিশ্বাস্য প্রযুক্তির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বর্তমানে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পূর্বে যেখানে কেবল সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই মহাকাশ বিদ্যা নিয়ে গবেষণা করত, সেখানে আজ স্পেসএক্সের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য করতে পারছে। ওয়াল স্ট্রিটে শুক্রবারের এই বিপুল সাড়া তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
হঠাৎ করে স্পেসএক্সের শেয়ার বাজারে আসার পেছনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইলন মাস্ক। তাঁর মতে, কোম্পানির মহাকাশভিত্তিক ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য বিশাল অঙ্কের পুঁজির প্রয়োজন ছিল। এই তহবিলের সিংহভাগ ব্যবহৃত হবে মহাকাশে আরও উন্নত স্যাটেলাইট বা উপগ্রহের নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং সেখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ডেটা সেন্টার বা তথ্য সংরক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে।
তবে শুধুমাত্র স্যাটেলাইট এবং ডেটা সেন্টারেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না প্রযুক্তিবিশ্বের এই শীর্ষতম ব্যক্তিত্ব। স্পেসএক্সের দীর্ঘমেয়াদী ও সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য হল মঙ্গল গ্রহে মানুষের স্থায়ী বসতি বা কলোনি স্থাপন করা। লাল গ্রহে কৃত্রিম উপায়ে মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার যে স্বপ্ন মাস্ক বহু বছর ধরে দেখছেন, এই সংগৃহীত বিশাল তহবিল সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবের অনেক কাছাকাছি নিয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মঙ্গল গ্রহে উপনিবেশ স্থাপনের কাজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জটিল বৈজ্ঞানিক গবেষণার দাবি রাখে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য প্রতিনিয়ত তরল জ্বালানি, অত্যাধুনিক সুপার হেভি রকেট এবং লাখ লাখ টন সামগ্রী মহাকাশে পাঠাতে হবে। ওয়াল স্ট্রিটের এই অভাবনীয় সাড়া স্পেসএক্সকে সেই দীর্ঘস্থায়ী মিশনের পথে প্রয়োজনীয় আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পুঁজিবাজারের বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন যে এই অভাবনীয় আর্থিক উত্থান কেবল ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির গল্প নয়, এটি সামগ্রিকভাবে বেসরকারি মহাকাশ খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক। যেভাবে সাধারণ খুচরো গ্রাহকরা এবং বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা একসাথে এই শেয়ার কিনতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তা প্রমাণ করে যে মহাকাশ অর্থনীতির একটি সোনালী ভবিষ্যত রয়েছে।
বর্তমানে স্পেসএক্স তাদের শক্তিশালী ফ্যালকন রকেট এবং বিশেষত স্টারলিংক স্যাটেলাইট ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সেবা দান করছে। এই স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ক্রমাগত আধুনিকায়ন এবং মহাকাশে বিশাল তথ্য ভাণ্ডার বা ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগে যে স্পেসএক্স দারুণভাবে লাভবান হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনে কোনো সংশয় নেই। সেই আস্থার ফলেই বাজারে এত দ্রুত এর দর বেড়েছে।
শুক্রবারের এই ঐতিহাসিক আইপিও বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্য দরবারে স্পেসএক্সের আধিপত্য আরও সুদৃঢ় হল। ইলন মাস্কের ট্রিলিয়নেয়ার হওয়ার গৌরব এবং স্পেসএক্সের ২.১৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার মূল্যের রেকর্ড মহাকাশ খাতের অগ্রগতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এই বিপুল বিনিয়োগ মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে কোন কোন নতুন দ্বার উন্মোচন করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।












Click it and Unblock the Notifications