আদানির প্রস্তাবিত মূল্যের ৫০% বেশিতে চিনকে বিমানবন্দর আধুনিকীকরণের বরাত দিল কেনিয়া সরকার, কেন জানেন?
কেনিয়ার সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর জোমো কেনিয়াত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (জেকেআইএ) আধুনিকীকরণের দায়িত্ব পেল চিন। প্রায় ২.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই বিশাল চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে চিনের 'চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’-র সঙ্গে। ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপের প্রস্তাবিত চুক্তি বাতিলের প্রায় দুই বছর পর এই বড় সিদ্ধান্ত নিল কেনিয়া সরকার। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে আদানির ২ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব বাতিল করার পর অবশেষে এই চিনা সংস্থাকে কাজ দেওয়া হল।
কেনিয়ার এই বিমানবন্দর সংস্কারের ক্ষেত্রে আদানি গ্রুপের প্রস্তাবের তুলনায় চিনের এই নতুন চুক্তির খরচ প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। আদানির প্রস্তাবিত বাজেট ছিল প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার, সেখানে চিনা সংস্থা ২.৯ বিলিয়ন ডলারে এই কাজ করবে। এই নতুন প্রকল্পের অধীনে কেনিয়ার জেকেআইএ বিমানবন্দরের ব্যাপক সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণের কাজ সম্পন্ন করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এই পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ দ্রুত শেষ করাই এখন কেনিয়া প্রশাসনের লক্ষ্য।

শুরুতে কেনিয়া প্রশাসন এই মেগা প্রজেক্টের জন্য আদানি গ্রুপের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে গভীর আলোচনা চালিয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে মার্কিন বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক আর্থিক দুর্নীতির যে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল, তার জেরে কেনিয়া সরকারকে পিছু হটতে হয়। যদিও প্রথম থেকেই আদানি গোষ্ঠী তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা এই সব ধরনের আন্তর্জাতিক দুর্নীতির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।
মার্কিন বিচার বিভাগের সেই গুরুতর অভিযোগের জেরে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটোর সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। কেনিয়ার রাজনৈতিক মহলেও এই চুক্তিটিকে ঘিরে জনমানসে ক্ষোভ ক্রমশ তীব্রতর হয়ে ওঠে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ একটি বেসরকারি বিদেশি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার আশঙ্কায় নাগরিক সমাজ ও সাধারণ জনগণ রাজপথে নেমে তীব্র প্রতিবাদ দেখাতে শুরু করেন।
আইনি দিক থেকে এই বিতর্কের যদিও সম্প্রতি অবসান ঘটেছে। ২০২৬ সালের জুন মাসে মার্কিন বিচার বিভাগ পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত তদন্ত প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে আইনি ক্ষেত্রে আদানি গ্রুপ নিষ্কলঙ্ক প্রমাণিত হলেও ততদিনে কেনিয়ার বিমানবন্দরের মেগা চুক্তিটি তাদের হাত থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যায় এবং কেনিয়া সরকার অন্য বিকল্পের দিকে এগিয়ে যায়।
এই বিশাল চুক্তি বাতিলের পিছনে কেনিয়া জুড়ে চলা দীর্ঘ সামাজিক প্রতিবাদ ও জন অসন্তোষের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। ফ্রান্সে বসবাসকারী কেনিয়ার অত্যন্ত জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও হুইসেলব্লোয়ার নেলসন আমেনিয়া এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন। তিনি বিমানবন্দরের বেসরকারিকরণের বিরোধিতায় সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বিশাল ও ধারাবাহিক সাইবার প্রচার অভিযান চালান, যা কেনিয়ার সাধারণ মানুষকে পথ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
নেলসন আমেনিয়ার জেরে এই বিমানবন্দর পরিকাঠামো চুক্তিটি কেনিয়ার রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষের একাংশের ধারণা ছিল, বাইরের দেশের সংস্থার হাতে বিমানবন্দরের দায়িত্ব দেওয়া হলে দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হতে পারে। এই তীব্র প্রতিবাদের জেরেই কেনিয়ার প্রশাসন তৎকালীন উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে আদানি গ্রুপের সাথে দীর্ঘ কয়েক মাসের আলোচনার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।
ঠিক এই সময়েই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভুয়ো তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার এবং জনমতকে প্রভাবিত করার এক বড় চক্রের হদিশ সামনে আসে। সম্প্রতি ফ্রান্সের প্রশাসন ১৩টি কুখ্যাত চিনা সংবাদ ওয়েবসাইটের খোঁজ পায়, যেগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম উপায়ে চিন-পন্থী ভুয়ো প্রচার চালাচ্ছিল। এই পুরো ঘটনাটি কেনিয়ার বিমানবন্দর সংকটের সময়ে তথ্য প্রচারের স্বচ্ছতাকে তীব্র প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
এছাড়াও কেনিয়ার প্রকল্প চলাকালীন আদানি গ্রুপ একটি ভুয়ো ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রেস বিজ্ঞপ্তির তীব্র প্রতিবাদ করে নিজস্ব বিবৃতি দিয়েছিল। সেই চক্রাকার ছড়ানো ভুয়ো বিজ্ঞপ্তিতে আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে ঘুষ দেওয়ার মতো অসত্য অভিযোগ তোলা হয়েছিল। আদানি গ্রুপের পক্ষ থেকে সরাসরি নিজেদের মিডিয়া বিবৃতিতে জানানো হয় যে, এই ধরনের প্রচার সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন এবং ভারতীয় সংস্থাকে লক্ষ্য করে তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এটি করা হয়েছে।
কেনিয়ার এই জটিল পরিস্থিতি কিন্তু কেবল কেনিয়ার সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড়সড় ঝড় তোলে। ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এই মেগা চুক্তি বাতিল সংক্রান্ত বিষয়ে সরাসরি কেন্দ্র সরকারকে নিশানা করে। দলের প্রবীণ নেতা জয়রাম রমেশ সমাজমাধ্যমে একটি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, "কেনিয়ায় আদানি-বিরোধী বিক্ষোভ ভারত-বিরোধী বিক্ষোভে পরিণত হতে পারে।"
এই ঘটনার পর কংগ্রেস দেশের শীর্ষপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ প্রকাশ করে। ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়, "কেনিয়া আদানি গ্রুপের সাথে চুক্তি বাতিল করার পর সরকারকে প্রশ্ন করল কংগ্রেস।" জয়রাম রমেশের দাবি ছিল, ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিদেশে বিতর্কিত বিনিয়োগের জেরে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের সামগ্রিক কূটনৈতিক স্বার্থ ও অর্থনৈতিক ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অপরদিকে কেনিয়া তাদের জেকেআইএ বিমানবন্দরটিকে সংস্কার করতে বিগত কয়েক দশক ধরে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম চালাচ্ছে। পূর্ব আফ্রিকার এই অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দরটির পরিকাঠামো আধুনিকীকরণ তাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল। তাই বিপুল অতিরিক্ত খরচ হওয়া সত্ত্বেও চিনকে এই ২.৯ বিলিয়ন ডলারের প্রোজেক্টের দায়িত্ব সমর্পণ করতে বাধ্য হল কেনিয়া সরকার, যা আদানি গ্রুপের পূর্বে প্রস্তাবিত ২ বিলিয়ন ডলার বাজেটের চেয়ে অনেকটাই বেশি।
আদানি গ্রুপের চুক্তি বাতিলের মধ্য দিয়ে কেনিয়ার বিমানবন্দর আধুনিকীকরণের কাজ শেষ পর্যন্ত চিনের অধীনে গেল। অবশেষে সমস্ত আইনি বিতর্ক কেটে আদানি গোষ্ঠী ক্লিনচিট পেলেও, বিপুল বাড়তি অর্থ খরচ করে চিনকে এই গৌরবময় প্রকল্প দেওয়া আফ্রিকার রাজনীতি ও বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যার সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক প্রভাব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।












Click it and Unblock the Notifications