বারবার আটকে গিয়েও কীভাবে অবিশ্বাস্য কামব্যাক? রূপকথা লিখে ফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনা

লিওনেল মেসির অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স এবং শেষ মুহূর্তের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ভর করে আবারও ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিল আর্জেন্টিনা। বুধবার সেমিফাইনালের মেগা ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনাল নিশ্চিত করল আলবিসেলেস্তেরা। ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের রেকর্ড স্পর্শ করার একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

ম্যাচের পঞ্চান্ন মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডন গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দিলে ম্যাচের ভাগ্য থ্রি লায়ন্সদের দিকেই ঝুঁকে পড়েছিল। কিন্তু আর্জেন্টিনা যেন কোনওভাবেই দমে যাওয়ার পাত্র নয়। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে, অর্থাৎ ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ গোল করে দলকে সমতায় ফেরান। এরপর অতিরিক্ত সময়ে পরিবর্ত খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামা ফরোয়ার্ড লাউতারো মার্টিনেজের দুর্দান্ত এক হেডার ইংল্যান্ডের নিশ্চিত জয় কেড়ে নেয়। দুটি গোলের পিছনেই ছিল অধিনায়ক লিওনেল মেসির জাদুকরী অবদান।

Lionel Messi celebrates Argentina reaching the 2026 World Cup final

বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার নিশ্চিত রূপকথার পর সংবাদ সম্মেলনে দল নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। নিজের দলের এই অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের মানসিকতার প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি বলেন, "আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, এই দলটি যখন চরম চাপের মধ্যে থাকে, তখনই তার সেরা ফুটবল খেলে। আমরা যখন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই এবং প্রতিপক্ষ সামান্যতম দ্বিধাবোধ করে, তখনই আমাদের দল রক্তের স্বাদ পাওয়া শিকারির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই দলটি আমাকে সর্বদাই সেই অনুভূতি দেয়।"

বিশ্বকাপের ইতিহাসে টানা দুবার শিরোপা জয়ের কীর্তি রয়েছে কেবল ইতালি ও ব্রাজিলের। ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কোনও দল এই সোনালি ট্রফি পর পর দুবার নিজেদের ঘরে তুলতে পারেনি। ফলে দীর্ঘ সময় পর আর্জেন্টিনার সামনে সুযোগ এসেছে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে নিজেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে নেওয়ার। এই টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই কোটি কোটি ভক্তের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে কাঁধে নিয়ে লড়ছেন লিওনেল মেসি।

কাতারে সোনালি ট্রফি ঘরে তোলার পর এবারের এই আসরেও আর্জেন্টিনা দল যে চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচয় দিচ্ছে, তা বিশ্ব ফুটবলে বিরল। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়টি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চলতি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচই রূপ নিয়েছে একেকটি মহানাটকীয় থ্রিলারে। কেপ ভার্দে, মিশর কিংবা সুইজারল্যান্ড— প্রতিটি দলের বিপক্ষেই প্রায় হেরে যাওয়া ম্যাচ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিজয়ীর বেশে মাঠ ছেড়েছে স্কালোনির শিষ্যরা।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার এই রুদ্ধশ্বাস অভিযাত্রার শুরু হয়েছিল ৩২ দলের লড়াইয়ে আফ্রিকার দেশ কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে। মিয়ামি স্টেডিয়ামের উত্তপ্ত ও আর্দ্র আবহাওয়ায় প্রায় ৬৫ হাজার দর্শকের সামনে দুই দুইবার পিছিয়ে পড়েছিল আকাশী-নীল বাহিনী। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে লিওনেল মেসির নেওয়া কর্নার কিক থেকে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর জোরালো হেডার কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার দিনেই বোর্হেসের গায়ে লেগে জালের ঠিকানা খুঁজে নিলে ৩-২ ব্যবধানে কোনো রকমে রক্ষা পায় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।

এর চেয়েও বেশি নাটকীয়তা দেখা যায় রাউন্ড অব সিক্সটিনের ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে। আটলান্টা স্টেডিয়ামে এক সময় টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার চূড়ান্ত আশঙ্কায় পড়েছিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। খেলার প্রথমার্ধেই পেনাল্টি মিস করে বসেন লিওনেল মেসি। অন্যদিকে ইয়াসের ইব্রাহিম ও মোস্তফা জিকোর চোখ ধাঁধানো গোলে ২-০ ব্যবধানে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় মিশর। ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত দুই গোলে পিছিয়ে থাকার পর বিশ্বকাপ থেকে অবিশ্বাস্যভাবে ছিটকে যাওয়ার প্রহর গুনছিল মেসি-বাহিনী।

পরাজয়ের সেই খাদের কিনারা থেকেই দলকে টেনে তোলেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ৭৯ মিনিটে মেসির চমৎকার ক্রস থেকে হেডে গোল করে প্রথম ব্যবধান কমান ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। এর ঠিক চার মিনিট পর মেসি নিজেই চোখ ধাঁধানো এক গোল করে ম্যাচটিকে ২-২ সমতায় নিয়ে আসেন। যখন সবাই ধরে নিয়েছিল ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে, তখনই ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে এনজো ফার্নান্দেজের জাদুকরী গোল আর্জেন্টিনাকে ৩-২ ব্যবধানের এক জয় এনে দেয়।

কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে রোমাঞ্চকর লড়াইটিও ফুটবল অনুরাগীদের স্মৃতিতে বহুদিন থাকবে। সুইজারল্যান্ড ম্যাচে লাল কার্ড দেখে ১০ জনের দলে পরিণত হলেও পুরো ম্যাচে তারা রক্ষণভাগ জমাট রেখেছিল। প্রথম গোল করে এগিয়ে গেলেও সুইজারল্যান্ড সমতা ফেরায়। ৯০ মিনিট পর্যন্ত আর গোল করতে না পেরে মরিয়া হয়ে উঠেছিল আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ। ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর পর ১১২ মিনিটে তরুণ ফরোয়ার্ড জুলিয়ান আলভারেজ দূরপাল্লার এক রকেট গতির শটে ডেডলক ভাঙেন। সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল সম্পূর্ণ ঝাঁপিয়ে পড়েও বল রুখতে পারেননি।

এর ঠিক ৯ মিনিট পর, ম্যাচের ১২১ মিনিটে থিয়াগো আলমাদার অসাধারণ এক শট সুইস রক্ষণভাগে বাধা পেয়ে ফেরত আসলে ফিরতি বলে নিখুঁত শটে গোল করেন লাউতারো মার্টিনেজ। ফলে ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে সেমিফাইনালে পা রাখে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। প্রতিটি ম্যাচেই আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মানসিকতা ছিল দেখার মতো, বিশেষ করে খাদের কিনারা থেকে লড়াই করে চরম প্রতিকূলতা ভেদ করে ট্রফি ছিনিয়ে নেওয়ার এক অন্যরকম তাগিদ তাদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল।

ফাইনালের মহাযুদ্ধে আর্জেন্টিনার সামনে এখন বিশ্ব সেরার মর্যাদা ধরে রাখার চূড়ান্ত পরীক্ষা। আগামী ম্যাচের ৯০ মিনিট নির্ধারণ করবে ফুটবল ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়। চাপের মুখে বারংবার ঘুরে দাঁড়ানোর যে নিদর্শন পুরো টুর্নামেন্টে তারা প্রদর্শন করেছে, তা ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষের জন্য অবশ্যই চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। শেষ পর্যন্ত মেসি ও তার দল এই বিশ্বকাপ ট্রফিটি টানা দ্বিতীয়বারের মতো নিজেদের ঘরে তুলতে পারে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+