আয়ারল্যান্ডে বৈভবের সুযোগ না পাওয়া নিয়ে মুখ খুললেন গাভাসকরও, ইংল্যান্ডে কি ভুল শোধরাবে ভারতীয় দল?
ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ হিসাবে ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলে দিয়েছেন বিহারের সমস্তিপুরের ১৫ বছর বয়সী তরুণ বাঁহাতি ব্যাটার বৈভব সূর্যবংশী। তবে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি২০ সিরিজে তাঁর জাতীয় যুব দলের সাফল্যের পর সিনিয়র দলের নীল জার্সিতে অভিষেক ঘটবে বলে ক্রিকেট মহল যে বিপুল আশা করেছিল, তা আপাতত বাস্তবে রূপ পায়নি। ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার ও প্রাক্তন অধিনায়ক সুনীল গাভাসকরও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন আয়ারল্যান্ড সফরেই হয়তো দেশের হয়ে অভিষেক হবে বৈভবের। ক্রিকেটপ্রেমীদের সেই বহু প্রতীক্ষিত সুযোগটি হাতছাড়া হলেও, গাভাসকর কিন্তু বৈভবের আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী।
গাভাসকরের মতে, আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচটি বৈভবের খেলোয়াড় জীবনের জন্য সবচেয়ে সহজ এবং উপযুক্ত মঞ্চ হতে পারত। সেখানে অভিষেক ঘটিয়ে বৈভবের পক্ষে সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় ক্রিকেটার হিসেবে সচিন তেন্ডুলকরের প্রায় সাড়ে তিন দশক পুরনো ঐতিহাসিক রেকর্ডটি নিজের নামে করে নেওয়া সম্ভব হতো। কিংবদন্তি এই প্রাক্তন ওপেনারের মতে, আয়ারল্যান্ডের মতো তুলনামূলক দুর্বল দলের বিরুদ্ধে কিশোর বৈভবকে খেলার সুযোগ দিলে, তা তাকে ইংল্যান্ড কন্ডিশনের মোকাবিলা করার আগে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা দিত।

আয়ারল্যান্ড সিরিজে ভারতের অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার এবং প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীরের নেতৃত্বাধীন টিম ম্যানেজমেন্ট একটু রক্ষণশীল কৌশল নিয়েছিল। তাঁরা বৈভবকে খেলানোর ঝুঁকি না নিয়ে ওপেনিং জুটিতে অভিষেক শর্মা ও সঞ্জু স্যামসনের মতো অভিজ্ঞদের ওপরেই আস্থা রাখেন। ওই সিরিজে বৈভবের পরিবর্তে দলে প্রিন্স যাদব এবং সূর্যাংশ শেডগের অভিষেক ঘটানো হয়। তবে সুনীল গাভাসকর মানছেন যে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আসন্ন পাঁচ ম্যাচের সিরিজে বৈভবের খেলার সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল।
বৈভবের এই উল্কাগতিতে ভারতীয় ক্রিকেটের মূল স্রোতে উঠে আসার পেছনে রয়েছে আইপিএল এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে তার চোখধাঁধানো ধারাবাহিক পারফরম্যান্স। ২০২৬ সালের আইপিএল মরসুমে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে দুর্দান্ত ব্যাটিং করে ৭০০-র বেশি রান সংগ্রহ করেছেন এই প্রতিভাবান বাঁহাতি ব্যাটার। তার এই নির্ভীক ব্যাটিং শৈলী ও বড় রান করার ক্ষমতা জাতীয় নির্বাচকদের বাধ্য করেছে তাকে নিয়ে আলাদাভাবে গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করতে।
অনূর্ধ্ব-১৯ ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে খেলা বৈভবের ঐতিহাসিক ইনিংস তাকে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসে। সেই ম্যাচে লিস্ট-এ ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্রুততম হাফ-সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ড গড়েন বৈভব। মাত্র ১১ বলে তিনি নিজের অর্ধশতরান পূর্ণ করেন, যা যেকোনও স্তরের ক্রিকেটে এক অবিশ্বাস্য কীর্তি। গাভাসকরের মতে, মাত্র ১১ বলে পঞ্চাশ করা সাধারণ কথা নয়, এটি প্রমাণ করে বৈভবের ব্যাটিং দক্ষতা কতটা বিশেষ এবং স্বভাবজাত।
দুনিয়াজুড়ে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই বৈভবের ব্যাটিংয়ের ভক্ত হয়ে গিয়েছেন এবং তাকে আগামী দিনের মহাতারকা বলে ঘোষণা করেছেন। বেশিরভাগ ক্রিকেট বিশেষজ্ঞই বৈভবের আয়ারল্যান্ড সফরে সুযোগ না পাওয়া নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের কড়া সমালোচনা করছেন এবং একে একটি ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সুনীল গাভাসকরের বক্তব্যও ঠিক একই লাইনে যায়, কারণ ভারত বর্তমানে একটি শক্তিশালী নতুন ওপেনিং জুটির অন্বেষণ করছে যা ভবিষ্যতের টি২০ বিশ্বকাপের রূপরেখা তৈরি করবে।
মহাতারকা গাভাসকরের গভীর ক্রিকেটীয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইংল্যান্ড সিরিজে বৈভবের সুযোগ পাওয়া মূলত দলের প্রথম সারির ওপেনারদের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করছে। টেস্ট বা টি২০ ফরম্যাটে যদি নিয়মিত ভারতীয় ওপেনাররা শুরুতেই প্রতিপক্ষের বোলিংয়ের মুখে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েন, তবে বৈভবকে সরাসরি ওপেনার হিসেবে খেলানো হতে পারে। সেক্ষেত্রে বর্তমান ওপেনারদের একজনকে ব্যাটিং অর্ডারে চার বা পাঁচ নম্বরে নামিয়ে বৈভবকে সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারতীয় দলের জন্য যেকোনও সিরিজই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা সে আয়ারল্যান্ড হোক কিংবা ইংল্যান্ড। তবে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয় যতটা প্রত্যাশিত থাকে, ইংল্যান্ডের আগ্রাসী দলের বিরুদ্ধে লড়াই ততটাই মানসিক পরীক্ষার মতো। আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় টি২০-র পর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনী কমিটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাবে। গাভাসকরের বিশ্বাস, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজটিই হবে বৈভবের মতো ঘরোয়া ক্রিকেটের চমককে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তীব্র চাপের মুখে পরীক্ষা করে নেওয়ার সঠিক সময়।
বর্তমান ভারতীয় ক্রিকেটে বৈভবকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এবং আধুনিক ব্যাটিংয়ের প্রতিরূপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সমস্তিপুরের এই কিশোরের নির্ভীক ও আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের ধরন আধুনিক খেলার সঙ্গে একবারে খাপ খেয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বৈভব সূর্যবংশীকে ভারতের জাতীয় দলে বেশিদিন ধরে বসিয়ে রাখা কার্যত অসম্ভব এবং সেটি ভারতীয় ক্রিকেটের অগ্রগতির জন্য কাম্যও নয়। তাই খুব শীঘ্রই তাঁকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নীল জার্সিতে দাপিয়ে বেড়াতে দেখা যাবে।
যদিও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বিপুল চাপ ১৫ বছরের এক কিশোরের অপরিণত কাঁধে নেওয়া কিছুটা কঠিন, তবে বৈভবের মানসিক দৃঢ়তা অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে। আসন্ন ইংল্যান্ড সফরটি ভারতীয় দলের জন্য নতুন এক চ্যালেঞ্জের বার্তা নিয়ে আসছে যেখানে বৈভবের ডাক পাওয়া এক সোনালী সুযোগ হতে পারে। এই কিশোর প্রতিভাকে যদি খেলানো হয়, তবে তা শুধু সচিনের রেকর্ডের দিক থেকেই নয়, ভারতীয় ব্যাটিংয়ের সমৃদ্ধির স্বার্থেও অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে চলেছে।












Click it and Unblock the Notifications