"একাই লড়ছি", মমতার এই আক্ষেপ আসলে মোদী-বিরোধী শিবিরকে সাবধান করার জন্য

তাঁর কাছে এখন জাতীয় রাজনীতিই পাখির চোখ। কিনতু সেখানে কিছু করে দেখাতে গেলে জোট বেঁধে লড়তে হবে। উত্তরপ্রদেশের ঘটনা দেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি হতাশ হয়েই বললেন যে তিনি একাই লড়ছেন?

তিনি সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে দ্বিধা করছেন না বিন্দুমাত্র। প্রথমে 'এনকাউন্টার' তত্ত্ব, তারপরে OROP নিয়ে প্রাক্তন জওয়ানের আত্মহত্যা এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথ দিল্লির মুখ্যমন্ত্র্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আটক করার ঘটনা এবং সর্বশেষে এনডিটিভি-র উপর পাঠানকোটে সন্ত্রাস-বিরোধী অপারেশনের সম্প্রচার নিয়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞা - পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একের পর এক ইস্যুতে কেন্দ্রকে বিঁধে চলেছেন। নভেম্বর ২ এবং ৩ তারিখে এই এতগুলি বিষয়ের উপরে মমতা টুইট করেন।

"আনানসার্ড", "আনফর্চুনেট", "আনপ্রিসিডেন্টেড", "শকিং" ইত্যাদি নানা বিশেষণ তিনি ব্যবহার করেন তাঁর টুইটের ছররা-তে।

এর আগে একশো দিনের কাজের টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর ব্যাপারেও তিনি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। দলীয় কর্মীদেরও বলেছিলেন রাজ্যে বিজেপির বিরুদ্ধে আরও আঁটঘাঁট বেঁধে নামতে। আর শুক্রবারে সরাসরি বলে দিলেন যে যা লড়াই করার তিনি একাই করছেন। আর প্রতিশ্রুতিও দিয়ে বললেন যে (মোদী) বিরোধীরা একসঙ্গে এলে তিনিও তাতে থাকবেন এবং প্রয়োজনে যে কোনও ভূমিকা তিনি পালন করতে রাজি।

রাজ্যের প্রধান হলেও তৃণমূল নেত্রী যে সোজা ২০১৯-এর দিকে তাকিয়ে খেলছেন তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। কিনতু একই সঙ্গে তিনি এটাও বুঝেছেন যে ভারতের মতো দেশে একটি আঞ্চলিক দলের নেত্রী হিসেবে তাঁর ক্ষমতা সীমিত।

জাতীয় স্তরে নরেন্দ্র মোদীর বিকল্প হিসেবে উঠে আসতে হলে প্রয়োজন বড় মঞ্চ যেখানে আঞ্চলিক দলগুলি একে ওপরের সঙ্গে নিঃশর্ত এবং নিঃস্বার্থভাবে জোট বাঁধবে। কিন্তু সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশে নির্বাচনের আগে যা হল বা এখনও হচ্ছে তাতে মমতার সেই মঞ্চ বাঁধার স্বপ্ন যে বেশ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। আর তাতেই তাঁর খেদ যে তিনি একাই লড়ছেন।

ভাইপো এবং যুব তৃণমূল নেতা ও সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনার পর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং প্রতিবেশী রাজ্য বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশকুমার মমতাকে ফোন করে অভিষেকের খোঁজখবর নেন। এর আগে কংগ্রেসকে ধর্মনিরপেক্ষ জোটে সামিল না করে যে পথ নেই বিশেষ, তাও স্বীকার করেন মুখ্যমন্ত্রী। সব মিলিয়ে, জোটের জল্পনা তুঙ্গে ওঠে।

কেরিয়ার মধ্যগগনে থাকা মমতা এখন সময় নষ্ট করতে চাইছেন না

আর সেই প্রকল্পের উদ্যোগ যে উল্কাবেগে ছুটছে না, তাতেই মমতা অধৈর্য হয়ে পড়েছেন।

আসলে মমতা জানেন যে তিনি তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারের মধ্যগগনে এখন। এই বছরের নির্বাচনে হাজারটা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও যেভাবে তিনি একাই দলকে দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জিতিয়েছেন এবং রাজ্যে বাম এবং কংগ্রেসের মতো পুরোনো শক্তিগুলি কবরে পাঠিয়েছেন, তাতে একদিকে যেমন তিনি বঙ্গীয় রাজনীতির শেষ পাদানিতে পৌঁছেছেন, তেমনি অন্যদিকে জাতীয় রাজনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করার ক্ষেত্রেও গুটি গুটি এগোচ্ছেন।

তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস কয়েকদিন আগে জাতীয় দলের তকমাও পেয়েছে কিন্তু মমতা জানেন ছোটখাটো রাজ্যে জনভিত্তি বিস্তার ঘটিয়ে মনস্তাত্ত্বিক ছাড়া আর কিছু সুবাধে পাওয়া যাবে না। আসল লড়াই অর্থাৎ দিল্লির মসনদে পৌঁছতে গেলে চাই বড় রাজ্যগুলিতে প্রভাববিস্তার। আর সেটা এক করার থেকে একসাথে মিলে করলেই বেশি ফলপ্রসূ হবে।

সেইজন্যেই, মমতা চান সব কোন্দল-কলহ মিটিয়ে সমাজবাদী পার্টির মতো বড় আঞ্চলিক দলগুলি বৃহত্তর ভূমিকা পালন করুক যাতে তাঁর মোদী-বিরোধী মঞ্চের কাজ ত্বরান্বিত হতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে মমতা-বিরোধীরা অবশ্য অন্য গন্ধ পাচ্ছে

এব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের মমতা-বিরোধী শক্তিগুলি অন্য খেলা দেখছেন যদিও। তাঁদের মতে, বেহিসেবি পয়সা খরচ করে আর দেনার দায়ে নাজেহাল হয়ে প্রশাসক মমতা কেন্দ্রকে আক্রমণ করে আসল সমস্যা থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে চাইছেন। পাল্টা আক্রমণে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। বিরোধীদের এই বক্তব্যে হয়তো সততা কিছুটা হলেও আছে।

কিনতু মমতার কাছে এখন পাখির চোখ দিল্লি

কিনতু সঙ্গে সঙ্গে এটাও সত্যি যে রাজনীতিবিদ মমতার কাছে এই ব্যাপারগুলি আগের মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এবার আর ততটা নয়। কারণ তিনি ভালো করেই জানেন যে ভালো হন, খারাপ হন, পশ্চিমবঙ্গের ভরসা শুধু তিনিই আর তাই প্রশাসনিক কাজের নিরিখে কেন্দ্রকে অহরহ দুষে চলবেন, সেই রাজনীতিতে নিজেকে আর সীমিত তিনি রাখবেন না।

রাজ্যের বিরোধীদের অবশ্য ভবিষ্যৎ বলে কতটুকু কী অবশিষ্ট আছে তা তাঁরাই জানেন আর তাই মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আরও একদিন টিকে থাকার।

মমতা সেদিক থেকে এখন পরবর্তী স্তরে বিরাজ করছেন। পাখির চোখের মতো দেখছেন পরের লোকসভা নির্বাচনকে। কংগ্রেস থাকলেও সেই নির্বাচনে রাহুল গান্ধীদের অবস্থা যে প্রান্তিক হবে আর মূল শক্তি হয়ে উঠবেন মমতা, নীতীশ, কেজরিওয়ালরাই - সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

আর তাই "আমি তো একই লড়ছি" খেদোক্তি প্রকাশ করে মোদী-বিরোধী শিবিরকে জানান দিচ্ছেন যে সময় নষ্ট কোরো না আর। সময় কিন্তু কারও তোয়াক্কা করে না।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+