দুর্বল সংগঠন, নেতৃত্ব নিয়ে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করতে কংগ্রেসের হাতে পেন্সিল ওই আদর্শের লড়াই
রাজনীতির রুক্ষ বাস্তবে লড়াই ফলপ্রসূ হোক বা না হোক, অন্তত পপুলিজম-এর নিরিখে যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর দিতে পিছপা নয়
রাজনীতির রুক্ষ বাস্তবে লড়াই ফলপ্রসূ হোক বা না হোক, অন্তত পপুলিজম-এর নিরিখে যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর দিতে পিছপা নয়, তা দলের সভাপতি রাহুল গান্ধী প্রমাণ করলেন, মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল। ঘটা করে প্রকাশ করলেন এক বিশদ নির্বাচনী ইস্তেহার যার পপুলিজম তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো তো বটেই, পাশাপাশি তার অর্থনৈতিক সম্ভবপরতা নিয়েও তোলে নানা প্রশ্ন।

কিন্তু কংগ্রেস নেতৃত্ব ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচন জিততে পারলে যে সমস্ত লক্ষ্য পূরণের আশ্বাস দিয়েছেন, তাতে এটা পরিষ্কার হয় যে অর্থনৈতিক বা অন্যান্য চিন্তাভাবনা তাঁদের কাছে গৌণ। লক্ষ্য এখন একটাই, বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করে গদিতে ফেরা।
কংগ্রেসের ইস্তেহারে রয়েছে সামাজিক 'ন্যায়' (ন্যূনতম আয় যোজনা); ২২ লক্ষ সরকারি কর্মপদ পূরণ করা; কৃষকদের জন্যে আলাদা বাজেট; শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের খাতে আরও বেশি অর্থ যোগানো ইত্যাদি নানা বড় প্রতিশ্রুতি। এমনকি, অশান্ত জম্মু ও কাশ্মীরে এক শান্তিকামী নীতি অবলম্বনের কথাও বলা হয়েছে।
এই নির্বাচনে কংগ্রেসের লক্ষ্য বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ-হিন্দুত্ববাদ থেকে দেশের রাজনীতির অভিমুখ ঘোরানো এবং আর্থ-সামাজিক পরিবেশ-পরিস্থিতির কথা মানুষের সামনে তুলে ধরা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একপেশে দাপটের সময়ে এছাড়া কংগ্রেসের আর বিশেষ কিছু করণীয় ছিল না এ কথা যেমন সত্যি, তেমনই তাদের বিপুল ইস্তেহারী কর্মকাণ্ড রূপায়িত করার অর্থনৈতিক সুবিধা-অসুবিধার কথাগুলিও ফেলনা নয়। তবে আদর্শগত বা অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াও যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয়, তা হচ্ছে রাজনৈতিক।
সবই তো বুঝলাম, কিন্তু জোটের রাজনীতি না করলে কি আদৌ ক্ষমতায় আসা সম্ভব?
এই বিপুল প্রতিশ্রুতিকে সফল করতে গেলে প্রথমে কংগ্রেসকে ক্ষমতায় আসতে হবে কিন্তু এখনও পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, জোটহীন রাজনীতির পথে এলোমেলোভাবে ঘুরতে থাকা শতাব্দীপ্রাচীন এই দলটির পক্ষে তা করে দেখানো কতটা সম্ভব?
পাশাপাশি, একথাও ভুলে চলবে না যে দেশে এখন খুব বেশি রাজ্যে কংগ্রেস সরকারে নেই আর তাই কেন্দ্রে যদি তারা এবারের লোকসভা নির্বাচনে জিতেও আসে, তাদের উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে রাজনৈতিক বাধাবিঘ্ন আসবে প্রচুর এবং সেসব সামলাতে রাহুল গান্ধীর প্রয়োজন হবে দক্ষ সেনাপতিদের।
পাশাপাশি, এই ধরনের বিপুল অর্থনৈতিক প্রকল্প রূপায়ণ করতে গেলে দুর্নীতি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না আর অতীতে দুর্নীতির প্রশ্নে কংগ্রেসি সরকারদের বেসামাল হওয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে অনেক। যদি সমস্ত বিষয়টিই ঘুরে ফিরে সেই একই জায়গায় ফিরে আসে, তবে তা কংগ্রেস নেতৃত্বের পক্ষে বিশেষ লাভজনক হবে না।
কংগ্রেসের এই নির্বাচনী ইস্তেহারে ১৯৭১ এবং ১৯৯১ সালের একটি মিশেল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে রাষ্ট্রের সহায়তায় সামাজিক ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, অন্যদিককে ধনবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি। জওহরলাল নেহেরু এবং পিভি নরসিংহ রাও-এর থেকে পাঠ নিয়ে যেন এই ইস্তেহারের রচনা। বিজেপির একটি বিকল্প তৈরী করতে যে কংগ্রেসের কান্ডারীরা মাঝরাত্তিরে মোমবাতি দেদার পুড়িয়েছেন সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু এখন দেখার এর বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কতটা।
২০০৪-ও কংগ্রেস লড়েছিল আদর্শের লড়াই, জিতেওছিল]
অবশ্য এমন লড়াই যে কংগ্রেস আগে সফলভাবে লড়েনি, তা নয়। ২০০৪ সালে যখন তদানীন্তন বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ 'ইন্ডিয়া শাইনিং' এবং 'ভারত উদয়' ইত্যাদি স্লোগান তুলে ফের ক্ষমতায় ফেরার আশায় মশগুল, তখন সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস সামাজিক প্রকল্পের আদর্শকে মূলধন করেই বাজিমাত করে। এবারেও যেখানে সাংগঠনিক এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে কংগ্রেস বিজেপির থেকে যোজনখানেক পিছিয়ে, তখন 'ওয়েলফেয়ার স্টেট্' এবং ন্যায়প্রতিষ্ঠার আদর্শকে হাতিয়ার করে টক্কর দেওয়া ছাড়া রাহুল ব্রিগেডের আর কোনও পথ নেই। যদিও এবারের লড়াই ২০০৪ থেকে অনেক কঠিন কারণ বিজেপির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার তাদের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোদী স্বয়ং।












Click it and Unblock the Notifications