দশ বছর দার্জিলিঙের প্রতিনিধিত্ব পেয়েও হতাশ করেছে বিজেপি; কোনও নীতিই নিতে পারেনি
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বেশ কিছু বছর ধরেই পশ্চিমবঙ্গকে পাখির চোখ করেছে। দেশের নানা রাজ্যে ক্ষমতায় এলেও পূর্ব ভারতের এই রাজ্যে তারা এখনও দাঁত ফোটাতে পারেনি সেভাবে।
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বেশ কিছু বছর ধরেই পশ্চিমবঙ্গকে পাখির চোখ করেছে। দেশের নানা রাজ্যে ক্ষমতায় এলেও পূর্ব ভারতের এই রাজ্যে তারা এখনও দাঁত ফোটাতে পারেনি সেভাবে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ভোট শতাংশ ১৭ ছুঁলেও আসনের নিরিখে তারা দুইয়ের বেশি এগোতে পারেনি। ২০১৬ সালেও নানা দুর্নীতির অভিযোগ তুলেও টলাতে পারেনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্রাজ্য। ২০১৯-এ আবার আটঘাঁট বেঁধে নেমে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ জুটি। দাবি জানাচ্ছেন রাজ্যে বিশটিরও বেশি আসনে জেতার।
গণতন্ত্রে হার-জিৎ থাকেই। বিকল্পই গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র। গত আট বছরে মমতা সরকার রাজ্যবাসীকে কতটা খুশি করতে পেরেছে আর কেন্দ্রে মোদীরাজ্ও কতটা সফল হয়েছে, তার সুদে-আসলে হিসেব মিলবে আগামী ২৩ মে। কিন্তু বাংলায় বিজেপির সম্ভাবনার কথা আলোচনা করতে গিয়ে একটা প্রশ্ন তুলতেই হয়: পদ্মবাহিনী কি শুধু নির্বাচনে জেতাকেই অন্তিম লক্ষ্য বলে মানেন নাকি সেই জয়কে ভিত্তি করে আরও ভাল কীভাবে করা যায়, সেটা নিয়েও ভাবেন?

দার্জিলিংকে ঘিরে বিজেপির বাংলা জয়ের নকশা তৈরী হতেই পারত
বিজেপি বাংলায় বিশেষ আসন সংখ্যা না জিতলেও একটি বড় সুযোগ পেয়েছিল দার্জিলিং কেন্দ্রে। ২০০৯ সালে তাদের হেভিওয়েট প্রার্থী যশবন্ত সিং, যিনি একসময়ে অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের প্রথম সারির মন্ত্রী ছিলেন, আড়াই লক্ষেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে ওই কেন্দ্র থেকে জেতেন। সেবার রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস এবং কংগ্রেসের মধ্যে জোট থাকা সত্বেও বিজেপির এই জয় কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। একজন বড় মাপের নেতার জয়তে পরিস্থিতি আরও অনুকূল ছিল বিজেপির পক্ষে, ওই সংবেদনশীল কেন্দ্রে কিছু করে দেখানোর এবং ভবিষ্যতে সমস্ত বাংলা জয়ের জন্যে একটি নীল নকশা তৈরী করা। নির্বাচনে জিতে এসে যশবন্ত অবশ্য বিশেষ উদ্যোগ কিছু নেননি কিছু বক্তব্য পেশ করা ছাড়া (যেমন "দার্জিলিং জেলার মানুষের সঙ্গে বাঙালিদের কোনও মিল নেই এবং জেলাটিকে কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চল ঘোষণা করা উচিত")। শেষ পর্যন্ত যশবন্ত সিং-এর উপরে রুষ্ঠহয়ে স্থানীয় মানুষ তাঁর বিরুদ্ধে একটি নিরুদ্দেশ হওয়ার নালিশও করে। কারণ: বর্ষীয়ান এই নেতা দীর্ঘকাল তাঁর কেন্দ্রে যাননি।

যশবন্ত সিং, সুরিন্দর সিং অহলুওয়ালিয়ার উপরে আশা রেখেছিল মোর্চা
পাহাড়ের তখনকার প্রধান শক্তি গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা বা জিজেএম ২০০৯ সালে যশবন্ত সিং এবং ২০১৪ সালে সুরিন্দর সিং অহলুওয়ালিয়াকে সমর্থন যোগায় তাদের গোর্খাল্যান্ড দাবি সফল করার লক্ষ্যে। ২০০৯ সালে তাও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ ক্ষমতায় আসে এবং বিজেপি বিরোধী আসনে বসে। কিন্তু ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসলে জিজেএম-এর প্রত্যাশা বৃদ্ধি পায় নতুন রাজ্য নিয়ে। কারণ, এর আগে বাজপেয়ী সরকারের আমলে ভারতে তিনটি নতুন রাজ্যের (উত্তরাঞ্চল যা পরে হয় উত্তরাখন্ড; ঝাড়খন্ড এবং ছত্তীসগঢ়) পত্তন হয় এবং বিমল গুরুং-এর দল আশা করে যে নতুন বিজেপি সরকারও সেই একই পথে হাঁটবে। দক্ষিণ ভারতে অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যকে ভেঙে তেলাঙ্গানা তৈরী হওয়ার ঘটনাও তখন তাজা আর তাই তেলাঙ্গানা হইল গোর্খাল্যান্ড কেন হবে না, সেই প্রশ্ন পাহাড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে।
কিন্তু আগের পাঁচ বছরের মতো এবারেও বিজেপির প্রার্থী গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনকারীদের নিরাশই করেন। অহলুওয়ালিয়া জিজেএম-এর সমর্থনে তৃণমূলের সেলেব্রিটি প্রার্থী বাইচুং ভুটিয়াকে প্রায় দু'লক্ষ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে আসেন কিন্তু তাঁর মেয়াদকালে তিনি দার্জিলিং নিয়ে প্রায় কিছুই করেননি। তাঁর পূর্বসূরির মতো অহলুওয়ালিয়াও অভিযুক্ত হয়েছেন নিজের কেন্দ্রে কম পদার্পন করার জন্যে। এমনকী, যখন ২০১৭ সালে পাহাড়ে আগুন জ্বলছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসন এবং গুরুং-এর সংঘাতকে কেন্দ্র করে, তখন পাহাড়ের দলগুলি কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে গেলেও নয়াদিল্লির তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া আসে না।
অপরদিকে, কলকাতার তরফে লৌহনীতি নেওয়ার ফলে মুখ থুবড়ে পরে গুরুং-এর আন্দোলন এবং তিনি নিজেও স্বয়ং। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তাদের তৃতীয় প্রার্থী রাজু সিং বিস্তকে দাঁড় করালেও এবারে গেরুয়াবাহিনী কতটা জিততে পারবে দার্জিলিং কেন্দ্র থেকে, তা বলা মুশকিল। একে তো জিজেএম এখন দ্বিখণ্ডিত দুর্বলতর এবং তার উপরে গত এক দশকে বিজেপির কাছ থেকে শুধুই হতাশা উপহার পেয়েছে পাহাড়ের মানুষ। তাই তৃতীয়বার তারা আর বিশ্বাস লাভ করবে কী না, তা জানা যাবে আগামী ২৩ মে।
আসলে বিজেপির যে দোষ সবটাই, তাও বলা চলে না। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নতুন রাজ্য গঠন হলেও দার্জিলিং একটি অতি সংবেদনশীল জায়গায় স্থিত। চীন সীমান্ত খুব দূরে নয়; সংকীর্ণ 'চিকেনস নেক'ও কাছেই। ভূ-কৌশলগত নিরিখে ওইরকম স্থানে একটি আলাদা রাজ্য তৈরী করা মানে জাতীয় নিরাপত্তার ব্যাপারে সমঝোতা করা আর সেটা যে-কোনও ক্ষমতাসীন দলই করতে দ্বিধাগ্রস্ত হবে। বিজেপির ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি।
তবে বিজেপি একেবারে মুখে কুলুপ না এঁটেও কিছু করতে পারত। কেন্দ্র এব্যাপারে এগিয়ে আসবে না বুঝে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন বাঙালি খণ্ডজাতীয়তাবাদকে উস্কে দিয়ে দমন করলেন পাহাড়ি আন্দোলনকে, সেই সময়ে তাঁকে আটকাতে সচেষ্ট হতেই পারত কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। কিন্তু গেরুয়া শিবিরের দ্বিচারিতার নীতি আদতে কোনও সাহায্যই করেনি হিংসার উপশমে। একদিকে দার্জিলিং-এর বিজেপি সাংসদরা যেমন গোর্খাল্যান্ডের সমর্থনে কথা বলেছেন, অন্যদিকে দলের রাজ্য নেতৃত্ব উল্টো সুরে গান গেয়েছেন, বলেছেন তাঁরা গোর্খাল্যান্ড নিয়ে কোনও কথাই বলেননি। কারণ বুঝতে অসুবিধে হয় না। সমতলে বসে "গোর্খাল্যান্ড হওয়া উচিত" অবস্থান নিলে বাকি বাংলাতে সমস্ত রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিমেষে কর্পূরের মতো উবে যাবে, বিশেষ করে যখন শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতাদেবী অবিভক্ত বাংলার হয়ে কড়া জিগির তুলেছেন।
বিজেপির যে দোষ সবটাই, তাও বলা চলে না। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নতুন রাজ্য গঠন হলেও দার্জিলিং একটি অতি সংবেদনশীল জায়গায় স্থিত। চীন সীমান্ত খুব দূরে নয়; সংকীর্ণ 'চিকেনস নেক'ও কাছেই। ভূ-কৌশলগত নিরিখে ওইরকম স্থানে একটি আলাদা রাজ্য তৈরী করা মানে জাতীয় নিরাপত্তার ব্যাপারে সমঝোতা করা আর সেটা যে-কোনও ক্ষমতাসীন দলই করতে দ্বিধাগ্রস্ত হবে। বিজেপির ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি।কিন্তু, গত পাঁচ বছরে দার্জিলিং-এ সেভাবে বিজেপির অতি-পরিচিত 'উন্নয়নের' স্লোগানও চোখে পড়ল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ন্যূনতম চ্যালেঞ্জও ছুঁড়ে দিতে পারল না তারা, দু'দুবার কেন্দ্রটি জেতার পরেও (তৃণমূল এখন একবারও নিজে দার্জিলিং জেতেনি)।

কাজটা কঠিন ছিল কিন্তু বিজেপি কিছু করতেও পারত
তবে বিজেপি একেবারে মুখে কুলুপ না এঁটেও কিছু করতে পারত। কেন্দ্র এব্যাপারে এগিয়ে আসবে না বুঝে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন বাঙালি খণ্ডজাতীয়তাবাদকে উস্কে দিয়ে দমন করলেন পাহাড়ি আন্দোলনকে, সেই সময়ে তাঁকে আটকাতে সচেষ্ট হতেই পারত কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। কিন্তু গেরুয়া শিবিরের দ্বিচারিতার নীতি আদতে কোনও সাহায্যই করেনি হিংসার উপশমে। একদিকে দার্জিলিং-এর বিজেপি সাংসদরা যেমন গোর্খাল্যান্ডেরসমর্থনে কথা বলেছেন, অন্যদিকে দলের রাজ্য নেতৃত্ব উল্টো সুরে গান গেয়েছেন, বলেছেন তাঁরা গোর্খাল্যান্ড নিয়ে কোনও কথাই বলেননি। কারণ বুঝতে অসুবিধে হয় না, সমতলে বসে "গোর্খাল্যান্ড হওয়া উচিত" বলা মানে বাকি রাজ্যে সমস্ত রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে জলাঞ্জলি দেওয়া, বিশেষ করে শাসকদল যেখানে বাংলাকে অবিভক্ত রাখার জিগির তুলেছেন জোরদার।
২০১৯-এ বিজেপি দার্জিলিং-সহ উত্তরবঙ্গে বিশেষ মনোনিবেশ করেছে পুরোনো গড় ধরে রাখতে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি এই অঞ্চলে ভালো ফল করার জন্যে এই কৌশল বুঝতে অসুবিধে হয় না। কিন্তু দার্জিলিং-এর রাজনীতির অভিমুখ যদি গোর্খাল্যান্ড থেকে না সরে, তাহলে এবারে জিতলেও গেরুয়া দল ওখানে বিশেষ কিছু সুবিধে করতে পারবে না রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার জন্যে। দার্জিলিং গেরুয়া শিবিরের কাছে কার্যত একটি হারানো সুযোগ।
[আরও পড়ুন:পশ্চিমবঙ্গ লোকসভা নির্বাচন ২০১৯-এর সব রকমের আপডেট পেতে ক্লিক করুন এই লিঙ্কে]
-
যুদ্ধ নয়, আলোচনায় সমাধান! হরমুজ ইস্যুতে বৈঠক ডাকল ব্রিটেন, যোগ দিচ্ছে ভারত -
'মালদহ কাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড' মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার, পালানোর সময় বাগডোগরা থেকে ধৃত -
আরও একটি সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশ করল নির্বাচন কমিশন, আর কত নাম নিষ্পত্তি হওয়া বাকি? -
বাংলায় ভোট পরবর্তী হিংসা রুখতে অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনী -
ভোটের আগেই কমিশনের কড়া নির্দেশ! অনুমতি ছাড়া জমায়েত নয়, নিয়ম ভাঙলেই গ্রেফতার, রাজ্যজুড়ে জারি কঠোর নির্দেশ -
দাগি নেতাদের নিরাপত্তা কাটছাঁট কতটা মানল পুলিশ? স্টেটাস রিপোর্ট চাইল নির্বাচন কমিশন -
যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই বড় রদবদল! মার্কিন সেনা প্রধানকে সরাল ট্রাম্প প্রশাসন, কারণ কী, জল্পনা তুঙ্গে -
আরও একটি মার্কিন F-35 যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি ইরানের, কী বলছে আমেরিকা? -
এপ্রিলে শক্তিশালী ত্রিগ্রহী যোগ, শনি-সূর্য-মঙ্গলের বিরল মিলনে কাদের থাকতে হবে সতর্ক? -
এপ্রিলেই বাড়ছে গরমের দাপট! আগামী সপ্তাহেই ৪-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়ার আশঙ্কা, কী জানাচ্ছে হাওয়া অফিস -
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব! শিল্পে ধাক্কা, একলাফে বাড়ল ডিজেলের দাম, কত হল? জানুন -
পুর-নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ভোটের আগে তৃণমূলের দুই হেভিওয়েট নেতাকে ইডির তলব












Click it and Unblock the Notifications