Exclusive লর্ডসে দাদাগিরির ২৫ বছর! কলম ধরলেন ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়
এই তো মনে হয় সেদিন। কত দ্রুত চলে গেল ২৫টা বছর। আজকের এই বিশেষ দিনে সেই কথাটাই বারবার মনে হচ্ছে। ১৯৯৬-এর ২২ জুন লর্ডসে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই শতরান শুধু একটা টেস্ট শতরান নয়। এই শতরানে নিহিত রয়েছে বিশ্ববাসীর প্রতি বাঙালির বার্তা। আমরাও পারি।

অভিষেকেই জোড়া উইকেট
১৯৯৬ সালের ২০ জুন লর্ডসে টেস্ট অভিষেক। টস জিতে ভারত ফিল্ডিং নেওয়ায় প্রথম দিন ব্য়াট হাতে নামতে হয়নি। কিন্তু সেই দিনেও দুটি মূল্যবান উইকেট তুলে নিয়েছিলেন সৌরভ। প্রথম বল করতে এসেছিলেন লাঞ্চের পর, ইংল্যান্ড ইনিংসের ৩৭তম ওভারে। ব্যাটসম্যান গ্রাহাম থর্প। প্রথম চার বলে কোনও রান হয়নি, পঞ্চম বলে দুই ও শেষ বলে চার। তবে টেস্ট কেরিয়ারের সপ্তম বলেই তুলে নিয়েছিলেন নাসের হুসেনকে। ক্যাচ ধরেছিলেন বিক্রম রাঠোর। এই ওভারটি মেডেন হয়। কেরিয়ারের ১৫তম বলে টেস্ট কেরিয়ারের দ্বিতীয় উইকেট। এবার আউট গ্রেম হিক, ক্যাচ গিয়েছিল জাভাগল শ্রীনাথের হাতে।

ফ্যাক্টর 'সাত'
২১ জুন টেস্টের দ্বিতীয় দিন ইংল্যান্ডের ইনিংস শেষ হয়। সৌরভের বোলিং ফিগার ছিল ১৫ ওভারে ২টি মেডেন ৪৯ রানে ২ উইকেট। ভারতীয় ইনিংসের দ্বাদশ ওভারে ব্যাট করতে নামেন সৌরভ। চা বিরতির পর, ১১.৩ ওভারে। কেরিয়ারের সপ্তম বলে প্রথম টেস্ট উইকেট পাওয়া মহারাজের প্রথম টেস্ট রানটিও আসে সপ্তম বলে। পিটার মার্টিনের বলে মারেন প্রথম চার। দিনের শেষে তিনে নামা সৌরভ অপরাজিত ছিলেন ২৬ রানে, ১৬ রানে তাঁর সঙ্গী ছিলেন সচিন।

ঐতিহাসিক শতরান
এরপরই সেই দিন। ২২ জুন। দিনটি ছিল শনিবার। দশম ভারতীয় হিসেবে টেস্ট অভিষেকে শতরান। অভিষেক টেস্টে শতরানকারী ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম ইনিংসে শতরান সৌরভ করেন সপ্তম ভারতীয় হিসেবে। এখানেও সেই সাত ফ্যাক্টর! বিশ্বের ৬১তম ব্যাটসম্যান হিসেবে অভিষেক টেস্টে শতরানের নজির গড়েন সৌরভ। ডমিনিক কর্কের বল মহারাজকীয় কভার ড্রাইভে বাউন্ডারিতে পৌঁছাতেই লর্ডসে রচিত হল নয়া ইতিহাস।

বিশেষ নজির
সৌরভের আগে লর্ডসেই অভিষেক টেস্টে শতরান করার নজির ছিল মাত্র দুইজনের। ১৮৯৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার হ্যারি গ্রাহাম এবং ১৯৬৯ সালে ইংল্যান্ডের জন হ্যাম্পশায়ারের। ৪৩৫ মিনিট ক্রিজে কাটিয়ে ৩০১ বলে ১৩১ রান করে অ্যালান মুলালির বলে লেগ বিফোর হন। সৌরভের কেরিয়ারের প্রথম টেস্ট ইনিংস সাজানো ছিল ২০টি বাউন্ডারি দিয়ে। ইংল্যান্ডের ৩৪৪ রানের জবাবে ভারত করেছিল ৪২৯। ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে সৌরভ ম্যাচের সেরা জ্যাক রাসেলকে লেগ বিফোর করেছিলেন। তিন ওভারে পাঁচ রান দিয়ে এক উইকেট।

দাদাগিরি-র ২৫ বছর
মনে হয় এই তো সেদিন টেস্ট অভিষেক হল। দেখতে দেখতে ২৫ বছর পেরিয়ে আজ সেদিনের অনুভূতি পুরোটা মনে না থাকলেও খুব ভালো যে লেগেছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সৌরভের কেরিয়ারে এই ইনিংসটা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতটাই উজ্জ্বল ও বর্ণময় সৌরভের ক্রিকেট কেরিয়ার, যা সচরাচর কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়। ভারতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে শুরু। সাফল্যের সঙ্গে দেশের অধিনায়কত্ব করেছেন। সিএবি-তে সচিব ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করে এখন বিসিসিআই সভাপতি। মাঝে ধারাভাষ্যকারের ভূমিকাতেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ২৫ বছর ধরে নানা ভূমিকায় অবিরাম ক্রিকেটের সেবা করার এমন সুযোগ পেয়েছেন খুব কম ক্রিকেটারই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের পরও আইপিএলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিসিসিআই সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগে দিল্লির ফ্র্যাঞ্চাইজিকে কোচিং করিয়ে কোথা থেকে কোথায় তুলে নিয়ে গিয়েছেন, সেটাও সকলেই জানেন। ভালো লাগে, এত বছর ধরে ক্রিকেটের সেবায় সৌরভকে নিয়োজিত থাকতে দেখে।

বদলে দেয় কেরিয়ার
লর্ডসে অভিষেক টেস্ট। আর তাতেই শতরান নিঃসন্দেহে বিশাল অবদান রেখেছিল তাঁর ক্রিকেটীয় কেরিয়ারে। সেদিন ব্যর্থ হলে হয়তো আর এত ক্রিকেট খেলা, এত সাফল্য নাও আসতে পারত। ফলে ক্রিকেটের জন্য সৌরভ যে এত কাজ করতে পারছেন সেটা নিশ্চিত করেছিল কিন্তু লর্ডসের ওই টেস্ট আর তার পরের টেস্টের শতরানই। এই সাফল্যে গর্বিত হই আমরাও। ভালো লাগছে ২৫ বছর পেরিয়ে এসে। ২০ জুন আমার শাশুড়িকে মনে করিয়ে বললাম, আজ সৌরভের টেস্ট কেরিয়ারের ২৫ বছর পূর্তি হল। মা শুনে বললেন, ওহ্, ২৫ বছর হয়ে গেল! সত্যিই সময় কত দ্রুত চলে যায়। লর্ডসের ঐতিহাসিক শতরানেরও যে আজ ২৫ বছর, বিশ্বাসই হতে চায় না!

মহারাজকীয় কামব্যাক
বেহালায় আমাদের পাশাপাশি বাড়ি, আমরা বন্ধু। তাই সৌরভ যখন ইংল্যান্ডে গেলেন আশা ছিল, ভালোই করবেন। করা উচিত। যদিও অস্ট্রেলিয়ায় সফরের অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা চার বছর ঘরোয়া ক্রিকেটে কঠোর পরিশ্রমের ফলেই ভারতীয় দলে ডাক এসেছিল। এটা কম কথা নয়। একদিনের আন্তর্জাতিক দল থেকে বাদ পড়ার পর চার বছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলা আর নিবিড় অনুশীলনে নিজেকে নিমগ্ন রেখে ক্রিকেটীয় সাধনার পুরস্কার সৌরভ পেয়েছিলেন জাতীয় দলে এই কামব্যাক সফরে। তাই আমিও চাইছিলাম, ইংল্যান্ড সফরে সব কিছু যেন ভালো হয়। তবে ভাবিনি এতটা ভালো হবে। যা বদলে দেবে কেরিয়ার। সেদিন লর্ডসে ৫০ করলেই খুশি হতাম, সেখানে ১৩১! সীমাহীন আনন্দ। পাড়ার সকলেই টিভিতে চোখ রেখেছিলেন, আমিও। তাঁদের মতো আমারও সেদিন খুব ভালো লেগেছিল। সকলে মিলে আনন্দ করেছিলাম পাড়ার ছেলে, পাশের বাড়ির ছেলের এই ঐতিহাসিক সাফল্যে।

ফোনে কথা
সেদিনের সেই শতরানের পর সৌরভের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। সৌরভ যে কতটা খুশি, তৃপ্তি, স্বস্তি পেয়েছিলেন তা অনুভব করেছিলাম। ফোনে সৌরভ কিছু বলার আগে আমিই অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। অস্ট্রেলিয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা কাটিয়ে দিয়েছিল লর্ডসের ওই ইনিংস। ক্রিকেট কেরিয়ার অন্য খাতে বইতে শুরু করায় সৌরভও যে খুশিই হয়েছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জীবনে ঘুরে দাঁড়াতে আজও তো অনেকেই সৌরভের কামব্যাকের ঘটনা থেকেই অনুপ্রেরণার রসদ সঞ্চয় করেন। সৌরভের অনুরাগীদের ভালোবাসা দেখেও খুব ভালো লাগে। এই তো সেদিন, সৌরভের লর্ডস অভিষেকের একটা ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলাম। ছবির কোয়ালিটি যে খুব একটা ভালো ছিল না, সেটা খেয়াল করি সৌরভেরই এক ভক্ত-র ফোনে। তিনিই আমাকে ওই ছবিটিরই ভালো কোয়ালিটির ছবি পাঠালেন। অনুরোধ করলেন, আগের ছবিটা বদলে ভালো কোয়ালিটির ওই ছবিটাই দিতে। সেটাই পরে পোস্ট করি। আইডলের প্রতি কতটা ভালোবাসা থাকলে এটা হয় সেটাও উপলব্ধি করলাম।

লর্ডসে দাদাগিরি
সৌরভের এই সেঞ্চুরির সঙ্গে অনেকের মনেই গেঁথে রয়েছে লর্ডসে জার্সি ঘোরানোর ঘটনাটিও। দুটিই সৌরভের কেরিয়ারে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটাও ঠিক, লর্ডসের এই টেস্ট শতরান না হলে পরে লর্ডসে জার্সি ঘোরানোর ওই সুযোগটাই তা আসত না। মনে আছে, আমি আর সৌরভ তখন লন্ডনে। সেখান থেকে লিসবনে গিয়েছিলাম রিয়াল মাদ্রিদ ও আতলেতিকো মাদ্রিদের খেলা দেখতে। তখন আইএসএলে কলকাতার দলের জন্য সঞ্জীব গোয়েঙ্কা আতলেতিকো মাদ্রিদের সঙ্গে চুক্তি করবেন। সেই প্রক্রিয়া চলাকালীনই আমি, সৌরভ, উৎসব পারেখ গিয়েছিলাম লিসবনে। পরিচয়পর্ব চলছিল। ওখানকার ক্লাবকর্তারা সৌরভ, উৎসব পারেখদের দেখিয়ে বলছিলেন, আমরা কলকাতার যে ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হতে চলেছি আইএসএলে এঁরা সেই দলের কর্ণধার। ফুটবল যেখানে জনপ্রিয়, সেখানে শিল্পোদ্যোগী, ফুটবলার, ক্লাবকর্তারা পরিচয়পর্ব চলার সময় সৌরভকে দেখেই চিনতে পারলেন। একজন তো উঠে দাঁড়িয়ে লর্ডসে জার্সি ঘোরানোর আদলে হাতটাকে মাথার উপর ঘুরিয়ে বললেন, বিগ ক্রিকেটার। অবাকই হয়েছিলাম। ফুটবলের নানা সেলিব্রেশন তো বিখ্যাত। হয়তো গুগলে জয়ের সেলিব্রেশনের ধরন খুঁজতে গিয়েই হয়তো তাঁরা লর্ডসের ব্যালকনিতে সৌরভের ওই ছবি বা ভিডিও দেখেছিলেন। তাই সহজেই চিনতে পারলেন। ফলে ফুটবল আর ক্রিকেটের মেলবন্ধনে লর্ডসের ব্য়ালকনিতে জার্সি ঘোরানো যেমন বিখ্যাত, তা সুনিশ্চিত করতে ১৯৯৬-এর ২২ জুনও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

বাঙালির জয়ধ্বজা
বাঙালি যে কারও চেয়ে পিছিয়ে নেই, মাথা উঁচু করে, চোখে চোখ রেখে লড়াই চালিয়ে জয়, অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারে, তা যত কঠিনই হোক না কেন ২২ জুনের লর্ডস এবং তারপরেও বারেবারে সেই বার্তা দিয়েছেন সৌরভ। আমাদের কন্যা সানা অবশ্য বাবার আইপিএল খেলা বা শেষ টেস্ট দেখেছে খুব ছোট বয়সে। খুব বেশি মনে নেই। তবে টিভিতে সৌরভের কোনও খেলা দেখানো হলে সানাকে ডেকে ওর বাবা বলেন, এই দেখ আমার কভার ড্রাইভ। আমি কিন্তু ভালোই খেলতাম। সানা দেখে বলে, হ্যাঁ সত্যিই তুমি ভালো খেলতে। তবে মজার কথা হলো, ক্রিকেট কেরিয়ারের প্রথম দিকে সৌরভের যে গোঁফ ছিল সেই লুক সানার পছন্দ নয়। আমাকে বলে এমন দেখে তুমি বাবাকে পছন্দ করেছিলে? সবমিলিয়ে লর্ডসের দাদাগিরি-র ২৫ বছর পূর্তিতে তাই ভালোই লাগছে। গর্বিত হই বারেবারেই।
ছবি- ইউটিউব, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ও ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সোশ্যাল মিডিয়া












Click it and Unblock the Notifications