অন্য ধরনের ভাবনার আমদানি, কিন্তু আশা জাগিয়েও বাঘ-বন্দি-খেলা-য় সংশয় থেকেই গেল
গত প্রায় এক দশক ধরে বাংলা ছবিতে অনেকখানি পরিবর্তন এসেছে। আর সেটা হল ছবির স্মার্টনেস। মানে ছবির ঝকঝকে প্রিন্ট। কালার-টোন ইউজিং।
গত প্রায় এক দশক ধরে বাংলা ছবিতে অনেকখানি পরিবর্তন এসেছে। আর সেটা হল ছবির স্মার্টনেস। মানে ছবির ঝকঝকে প্রিন্ট। কালার-টোন ইউজিং। কিন্তু, যে জিনিসগুলোর খামতি বারবার বড় হয়ে উঠছে সেটা হল চিত্রনাট্য, সম্পাদনা ও সিনেমাটোগ্রাফি। আর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বাংলা উচ্চারণ। যার ফলে 'বাঘ-বন্দি-খেলা' নিয়ে আশা তৈরি হলেও তা একটা জায়গায় গিয়ে আটকে পড়েছে।

কর্মাশিয়াল ছবি মানেই যে আবোল-তাবোল সংলাপ নয় তা বাংলা ছবি-র করিয়েরা কবে বুঝবেন তা জানা নেই। আজকাল জিৎ-এর ছবি মানেই গান-নাচ আর অ্যাকশনের মশালা। অনেকেই বলবেন জিৎ-এর ম্য়ানারিজমের সঙ্গেও এটা ভালো যায়। কিন্তু, তাই বলে তাঁর মুখ দিয়ে আবোল-তাবোল সংলাপ বলিয়ে নিলে তাতে ছবির সাফল্য কতটা আসবে সন্দেহ আছে। অথচ এই জিৎ একটা সময় এমন-এমন বাংলা ছবি করেছেন যাতে কঠিন-কঠিন সংলাপে তিনি অনায়াসে বলেছেন। তাঁর সেই সব ছবি প্রশংসিত হয়েছিল বলেই তিনি আজকের জিৎ হয়েছেন।

বাংলা ছবির স্বকীয়তা বহু বছর ধরেই প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কমার্শিয়াল ছবি করিয়েদের অন্ধ দক্ষিণী অনুকরণে এই প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি করে উঠছে। দক্ষিণী ছবির অনুকরণে বাংলা ছবির গ্ল্যামার বা চটক-কে বৃদ্ধি করা যেতে পারে, কিন্তু তা যে বাংলা ছবির বক্স-অফিসকে অক্সিজেন জোগানোর পক্ষে যথেষ্ট নয় তা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। 'বাঘ-বন্দি-খেলা'-তেও প্রমাণ মিলছে। ফলে লোকে হলে গিয়ে একটা ছবি দেখতে কেন দেখতে চাইবে তার কোনও উত্তর নেই। অথচ এই বাংলা ছবির বাজারে এমন কিছু পরিচালক রয়েছেন যারা শূন্য থেকে শুরু করে একটা নতুন দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন। এবং তাতে তাঁরা অনেকটাই সফল। এইসব ছবি দেখতে একটা শ্রেণির দর্শক দিনের পর দিন হলেও যাচ্ছেন।
বাঘ বন্দি খেলা’ রিলিজ ১৬ নভেম্বর। দেখতে থাকুন ছবির ট্রেলার। #BBK @prosenjitbumba @jeet30 @sayantika12 pic.twitter.com/UTXzoae3i8
— JalshaMovies (@Jalsha_Movies) November 9, 2018
'বাঘ-বন্দি-খেলা' নামটাও ১৯৭৫ সালে উত্তম কুমার, সুপ্রিয়া চৌধুরীর 'বাঘ-বন্দি-খেলা' থেকে অনুপ্রাণিত তাতেও সন্দেহ নেই। উত্তম-সুপ্রিয়ার সেই ছবি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছে। কিন্তু, নতুন এই 'বাঘ-বন্দি-খেলা' খেলার সঙ্গে উত্তম-সুপ্রিয়ার ছবির নাম-এর মিল থাকলেও আর কোনও মিল নেই। সুরিন্দর ফিল্মস-এর 'বাঘ-বন্দি-খেলা' ছবিটি তিনটি ভিন্ন-ভিন্ন কাহিনিকে ঘিরে। এই তিন কাহিনি-তে তিন জন নায়ক- জিৎ, সোহম এবং প্রসেনজিৎ। আর এঁদের সঙ্গে আছেন সায়ন্তিকা, শ্রাবন্তী এবং ঋতিকা। তিনটি ছবির পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তী, সুজিত মণ্ডল, রাজা চন্দ। ছবির সঙ্গীত পরিচালক জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়।
ছবির তিন কাহিনি-র মধ্যে বাঘ ও বন্দি- পার্ট দুটোতে কোনও নতুনত্ব ধরাই পড়েনি। বাঘ-এর কাহিনি আবর্তিত হয়েছে বিদেশে দুষ্কৃতি দমনে পাঠানো এক সিক্রেট এজেন্ট-কে ঘিরে। বন্দি-র কাহিনি এক জন-এর খুনের সাক্ষী হওয়া নিয়ে। এমন কাহিনি নিয়ে অসংখ্য ছবি তৈরি হয়েছে। চিত্রনাট্যের দূর্বলতায় কাহিনিগুলিতে কোনও নতুনত্বই ধরা পড়েনি। খেলা- কাহিনির পাঠে একটা পরিকল্পিত গল্পের আভাষ মিলেছে। কিন্তু দেখতে গেলে এমন কাহিনি-ও যে নতুন তা বলা যাবে না। তবে, এই অধ্যায়ে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় যেভাবে তাঁর অভিনয় দক্ষতায় পুরো খামতি ঢেকে দিয়েছেন তা প্রশংসাযোগ্য। প্রসেনজিৎ-এর পাশে ঋত্বিকাকেও বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়েছে।
আসলে বাংলা ছবির বেশকিছু কলাকুশলি এখনও মনে করেন যে গ্রামবাংলাই বাংলা ছবির বাজার। কিন্তু তারা হয়তো এটা ভুলে গিয়েছেন গত কয়েক বছরে গ্রাম বাংলা থেকে অধিকাংশ সিঙ্গল স্ক্রিনের সিনেমা হলগুলো প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে ভ্যানিস হয়ে গিয়েছে। যে কয়েকটি সিঙ্গল সিনেমা হল এখন গ্রামবাংলায় টিকে রয়েছে তারা টিম টিম করে জ্বলছে। আর এইসব হলগুলোর বেশিরভাগ আয় হয় ভোজপুরি আর ডাব করা দক্ষিণী সিনেমা দেখিয়ে। সেখানে বাংলা ছবি খুব একটা কল্কে পায় না। বরং বাংলা ছবি-কে ঘিরে মাল্টিপ্লেক্স কালচারে একটা আরবানাইজড ভিউয়ারশিপ তৈরি হচ্ছে। এই দর্শককুলকে নিশানা করতে গেলে বাংলা ছবির করিয়েদের আরও একটু ভাবতে হবে। আর সোহম, শ্রাবন্তী, সায়ন্তিকাদেরও বোঝাতে হবে অভিনেতা-অভিনেত্রী হিসাবে তাঁদের দায়বদ্ধতাকে।












Click it and Unblock the Notifications