এক দিনের দৌড়ে নয়াচরের রোকেয়া স্বপ্ন দেখেন হাজার স্বপ্ন পাড়ি দেওয়ার
দুজনের নাম রোকেয়া। নয়াচরের রোকেয়া। শাখাওয়াত রোকেয়ার নাম শোনেনি। শোনার কথা নয়। ভাগিরথী হুগলির এই প্রান্তিক অঞ্চলে এই নাম পৌঁছে পারে নি। ১৮, ১৯ বছরের রোকেয়া দুই বাচ্চার মা। রহিমের বিবি সে। মাছের ঝাঁকি নিয়ে সকালে রহিমের সাথে মাছ বিক্রি করে। রেজাবুল আর সাহিবুলের ভাত রাঁধে। রহিমের মায়ের পা টিপে দেয়। আবার ভাঙা একটা সাইকেল চালিয়ে রেজাবুলকে আমাদের বর্ণপরিচয় স্কুলে নিয়ে আসে। তার পৃথিবী চরের কিছু ঘর, ভেড়ির মাছ, সময়ে সময়ে পালটানো নদীর জল আর ঘোরতর অন্ধকার। বিদ্যুৎয়ের অভাবে অন্ধকার, শিক্ষার অভাবে অন্ধকার, আগামীর আশায় অন্ধকার।

এই রোজনামচায় একটা কোথাও চমক আসে বছরের একদিন। বর্ণপরিচয় স্কুলের স্পোর্টস ডে। রোকেয়া বিবি সব কাজ করে নিয়ে রেজাবুল আর সাহাবুলের সাথে শাশুড়িকে নিয়ে ভাঙা সাইকেলে চলে আসে মনসা মন্দিরের মাঠের সামনে। এরপর প্রতীক্ষা। বাচ্চাদের সব ইভেন্টের পর হয় মায়েদের দৌড়। সব মায়েরা শাড়ি কোমড়ে জড়িয়ে নিয়ে তৈরি। কোলের বাচ্চাগুলোকে কোন রকমে দূরে সরিয়ে সেই ক্ষণের প্রতীক্ষা। দৌড় শুরু করার আগে চোখদুটো চকচক করতে থাকে। বিবি, আম্মি ছেড়ে রোকেয়ারা এক আকাশে ডানা মেলে উড়ে যায়। কাজল কালো চোখ মেলে পায় - স্বাধীনতা। সব রোকেয়ার স্বপ্ন মিলে যায়।
কেন দুই রোকেয়া ? ইনি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক এবং নারী জাগরণের অগ্রদূত।। ১৯০২ সালে পিপাসা নামে একটি বাংলা গল্পের মধ্য দিয়ে তিনি সাহিত্যজগতে পদার্পণ করেন। ১৯০৯ সালে তাঁর স্বামী মৃত্যুবরণ করেন। এর পাঁচ মাস পর রোকেয়া সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল নামে একটি মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন ভাগলপুরে। ১৯১০ সালে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলার ফলে স্কুল বন্ধ করে তিনি কলকাতায় চলে যান। এখানে ১৯১১ সালের ১৫ই মার্চ তিনি সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল পুণরায় চালু করেন। প্রাথমিক অবস্থায় ছাত্রী ছিল ৮ জন। চার বছরের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪-তে। ১৯৩০ সালের মাঝে এটি হাই স্কুলে পরিণত হয়।রোকেয়ার অনুপ্রেরণায় ক্রমশ বাঙালি মেয়েরাও এগিয়ে আসে পড়াশোনার জন্য। ছাত্রীদের পর্দার ভিতর দিয়েই ঘোড়ার গাড়িতে করে স্কুলে আনা-নেওয়া করা হতো।সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে তফসিরসহ কুরআন পাঠ থেকে আরম্ভ করে বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফারসি, হোম নার্সিং, ফার্স্ট এইড, রান্না, সেলাই, শরীরচর্চা, সঙ্গীত প্রভৃতি বিষয়ই শিক্ষা দেওয়া হতো। স্কুল পরিচালনা এবং পাঠদানে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বেগম রোকেয়া বিভিন্ন বালিকা স্কুল পরিদর্শন করতেন। পর্যবেক্ষণ করতেন সেসব স্কুলের পাঠদান পদ্ধতি। এ ক্ষেত্রে তিনি কলকাতার শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ইংরেজ, বাঙালি, ব্রাহ্ম, খিস্টান সব শ্রেণীর মহিলাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন এবং তাঁদের আন্তরিক সহযোগিতা লাভ করেন। তিনি নিজেই স্কুলের শিক্ষিকাদের ট্রেনিং দিতেন। কলকাতায় উপযুক্ত শিক্ষয়িত্রী না পাওয়ায় রোকেয়া মাদ্রাজ, গয়া, আগ্রা প্রভৃতি স্থান থেকে ভাল শিক্ষয়িত্রী নিয়ে আসেন। তাঁর বারংবার আবেদনের ফলেই ১৯১৯ সালে সরকার কলকাতায় 'মুসলিম মহিলা ট্রেনিং স্কুল' স্থাপন করে। স্কুলের জন্য সরকারি সাহায্য এবং সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা আদায় ছিল রোকেয়ার জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এ কাজেও সামাজিক বিরুদ্ধতা আর কঠিন সমালোচনাকে উপেক্ষা করে তিনি সফলতা লাভ করেন।সাহিত্যিক হিসেবে তৎকালীন যুগের প্রেক্ষাপটে রোকেয়া ছিলেন এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা। নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী, নবপ্রভা, মহিলা, ভারতমহিলা, আল-এসলাম, নওরোজ, মাহে নও, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, 'The Mussalman', 'Indian Ladies Magazine' প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন। তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯০৩ সালে নবনূর পত্রিকায়। মতান্তরে, তাঁর প্রথম লেখা 'পিপাসা' (মহরম) প্রকাশিত হয় ইংরেজি ১৯০২ সালে, চৈত্র ও বৈশাখ ১৩০৮-১৩০৯ (যুগ্মসংখ্যা) নবপ্রভা পত্রিকায়। সমকালীন সাময়িক পত্রে মিসেস আর.এস হোসেন নামে তাঁর রচনা প্রকাশিত হতো। রোকেয়ার সমগ্র সাহিত্যকর্মের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে সমাজের কুসংস্কার ও অবরোধ প্রথার কূফল, নারীশিক্ষার পক্ষে তাঁর নিজস্ব মতামত, নারীদের প্রতি সামাজিক অবমাননা এবং নারীর অধিকার ও নারী জাগরণ সম্পর্কে তাঁর প্রাগ্রসর ধ্যানধারণা। বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধেও তাঁর লেখনী ছিল সোচ্চার।
পুরুষশাসিত সমাজে নারীর দুরবস্থা এবং দৈহিক-মানসিক জড়ত্ব থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় যে শিক্ষা এ ধারণাই রোকেয়া তুলে ধরেন তীক্ষ্ণ ভাষায় ও তীর্যক ভঙ্গিতে। এক প্রতিকূল সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের খন্ড খন্ড চিত্র ফুটে উঠেছে তাঁর রচনায়। সমাজের নিচুতলার মানুষের জীবনের দুর্দশার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে তাঁর বহু প্রবন্ধ ও নকশাজাতীয় রচনায়। ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও শেষাত্মক রচনায় বেগম রোকেয়ার স্টাইল ছিল স্বকীয় বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। উদ্ভাবনা, যুক্তিবাদিতা এবং কৌতুকপ্রিয়তা তাঁর রচনার সহজাত বৈশিষ্ট্য। তাঁর প্রবন্ধের বিষয় ছিল ব্যাপক ও বিস্তৃত। বিজ্ঞান সম্পর্কেও তাঁর অনুসন্ধিৎসার পরিচয় পাওয়া যায় বিভিন্ন রচনায়। সমকালীন যুগের বিদ্যানুরাগী সমাজহিতৈষী পুরুষ এবং মহিলাদের নিকট থেকে বেগম রোকেয়া নানাভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করেন। সওগাত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন তাঁকে উৎসাহিত করেন স্বাধীন মতামত প্রকাশের জন্য। সওগাতের সঙ্গে বেগম রোকেয়ার সম্পৃক্ততা ছিল নিবিড়। এ পত্রিকার প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যার (অগ্রহায়ণ ১৩২৫) প্রথম পৃষ্ঠায় রোকেয়ার 'সওগাত' কবিতাটি ছাপা হয়। এছাড়া তাঁর বহু প্রবন্ধ ও কবিতা সওগাতে প্রকাশিত হয়।রোকেয়ার উলেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে: মতিচূর (প্রবন্ধ, ২ খন্ড: ১ম খন্ড ১৯০৪, ২য় খন্ড ১৯২২), Sultana's Dream (নকশাধর্মী রচনা, ১৯০৮), পদ্মরাগ (উপন্যাস, ১৯২৪),অবরোধবাসিনী (নকশাধর্মী গদ্যগ্রন্থ, ১৯৩১) প্রভৃতি। এছাড়া আছে অসংখ্য প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা, ব্যঙ্গাত্মক রচনা ও অনুবাদ। Sultana's Dream গ্রন্থটি রোকেয়া নিজেই বাংলায় অনুবাদ করেন সুলতানার স্বপ্ন নামে। এটি একটি প্রতীকী রচনা এবং এতে বর্ণিত Lady Land বা নারীস্থান মূলত রোকেয়ারই স্বপ্নকল্পনার প্রতীক। স্কুল পরিচালনা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রোকেয়া নিজেকে সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে ব্যস্ত রেখেছিলেন।
-
কালবৈশাখীর দাপট অব্যাহত! বৃষ্টির সঙ্গে ধীরে ধীরে বাড়ছে গরম, কেমন থাকবে আজকের আবহাওয়া? জানুন -
মমতা বনাম শুভেন্দু লড়াইয়ে যোগ শাহের, ভবানীপুরে বাড়ছে রাজনৈতিক চাপানউতোর -
কেন্দ্রের তরফে আমলাদের রদবদল, প্রায় তিন ডজন শীর্ষ আধিকারিকের নতুন দায়িত্ব ঘোষণা -
বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনে ফের ব্যর্থ ইতালি, এই প্রথম কোনও চ্যাম্পিয়ন দল ফুটবলের সেরা আসরে নেই টানা তিনবার -
বাণিজ্যিক গ্যাসে ফের মূল্যবৃদ্ধি, শহর ভেদে বাড়ল সিলিন্ডারের দাম -
NASA-র বড় পরিকল্পনা! ৫০ বছর পর ফের চাঁদের পথে মানুষ, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই নতুন মিশন? জানুন -
বিশ্বকাপের আগে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নিল ব্রাজিল, জয় ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে -
কয়লা কেলেঙ্কারির তদন্ত! দেশের বিভিন্ন শহরে আই-প্যাকের দফতর ও ডিরেক্টরের বাসভবনে ইডি তল্লাশি -
কেউ নাম বাদের ভয়ে ভীত, কেউ চাইছেন এবারের 'গুরুত্বপূর্ণ' ভোটে অবদান রাখতে, নির্বাচনের আগে পরিযায়ী শ্রমিকরা যেকরেই হোক ফিরছেন বাংলায় -
নায়ক কনোলি, গুজরাত টাইটান্সকে হারিয়ে দিল পাঞ্জাব কিংস -
ভোটের আগে ফর্ম ৬ বিতর্কে উত্তপ্ত রাজ্য,অভিযোগ পাল্টা অভিযোগে দুই শিবির -
দেশের মাটিতে শেষ ম্যাচেও সপ্রতিভ মেসি, পাঁচ গোলে জয় আর্জেন্তিনার











Click it and Unblock the Notifications