সিঙ্গুর: শিল্পের জমি চাষে ফেরানোর উদ্যোগ যে অবান্তর, সেটা মমতা আজকেও বুঝছেন কি?
এক দশক আগে সিঙ্গুরের আন্দোলনকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাম-বধের মিশন। তৎকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারের মিশন শিল্পায়ন-এর হঠকারিতার ফল হাতেনাতে দিতে হয় বামেদের।
এক দশক আগে সিঙ্গুরের আন্দোলনকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাম-বধের মিশন। তৎকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারের মিশন শিল্পায়ন-এর হঠকারিতার ফল হাতেনাতে দিতে হয় বামেদের। জমি অধিগ্রহণ এবং ইচ্ছুক-অনিচ্ছুক রাজনীতির মধ্যে পড়ে শেষ পর্যন্ত নৈতিক এবং পরে রাজনৈতিকভাবে হার স্বীকার করতে হয় বুদ্ধবাবুর সরকার এবং দলকে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সে ছিল এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়।
কিন্তু ২০১৯ সালে এসে দেখা যাচ্ছে ঘটনার মোড় ফের ঘুরেছে এবং আবার ফাঁপরে পড়েছে সেই সময়ে যিনি শেষ হাসি হেসেছিল, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। ২০০৯ সালে হুগলি লোকসভা আসন, যার অন্তর্গত সিঙ্গুর, সেখানে তৃণমূল বামেদের বিশ বছরের ঘাঁটি দখল করে। আর এবারে সেই সিঙ্গুরই বিজেপির কাছে খোয়াল তারা, দলের দু'বারের সাংসদ রত্না দে ৭৩,০০০ ভোটে হারলেন লকেট চট্টোপাধ্যায়ের কাছে।

হুগলিতে পরাজয় বিরাট লজ্জার, সে কথা মমতাও স্বীকার করেন
রাজ্যের আর যে কেন্দ্রে যাই হোক না কেন, হুগলির ফল তৃণমূল নেত্রীর কাছে বিশেষ লজ্জার। কারণ সিঙ্গুরকে কেন্দ্র করেই তাঁর ক্ষমতায় আরোহন ২০১১ সালে। সিঙ্গুর বিধানসভা কেন্দ্রেও তৃণমূল এই মুহূর্তে পিছিয়ে রয়েছে আর তা ২০২১-এর আগে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এক বড় উদ্বেগ। তিনি আবেগপ্রবণও হয়ে পড়েছেন এই বিষয়ে সম্প্রতি কথা বলতে গিয়ে। বলেছেন তিনি নিজে এত লড়লেন সিঙ্গুর নিয়ে কিন্তু দলের ভিতরের কাজিয়াতে শেষ পর্যন্ত হারল দলই।
সিঙ্গুর নিয়ে মমতার আন্দোলনের কথা অনস্বীকার্য। রাজনৈতিকভাবে সিঙ্গুর ইস্যুর যতটা সদ্ব্যবহার করা যায় তা নেত্রী তখন করেছিলেন এবং সেই হাওয়ায় ঘুরে যায় বঙ্গীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটই। চৌত্রিশ বছর পরে ধূলিস্যাৎ হয় বামেদের রাজত্ব।
এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। পৃথিবীর অনেক দেশেই অনেক সময়ে একটি বিশেষ বড় ঘটনার উপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে বিপ্লবের অভিমুখ, নতুন সমীকরণ। সিঙ্গুরেও তাই ঘটেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক জয় পাওয়া মমতা একটি মোক্ষম কাজ করতে ভুলে গিয়েছিলেন এবং সেটা অর্থনৈতিক। দলীয় কোন্দল তো রয়েছেই, কিন্তু হুগলিতে হারের সবচেয়ে বড় কারণ নেত্রীর নিজের ব্যর্থতা, সিঙ্গুরের অর্থনৈতিক ভাগ্য ফেরানোর।

সিঙ্গুর থেকে টাটাদের তাড়ানোর পরে মমতার একটি জঙ্গি ভাবমূর্তি তৈরী হয়েছিল
সিঙ্গুর আন্দোলন চলার সময়ে টাটাদের ন্যানো গাড়ির কারখানা প্রত্যাহারের ঘটনায় মমতার রাজনৈতিক জয় হলেও সেই সময়ে তাঁর একটি জঙ্গি ভাবমূর্তিও প্রতিষ্ঠা পায়, বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সামনে। সিঙ্গুরে টাটা থাকলে স্থানীয় এবং রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা চাঙ্গা হত বলে অনেকেই আজও আক্ষেপ করেন। দল রাজনৈতিক পরাজয়ের মুখোমুখি হলেও ব্যক্তি বুদ্ধদেব আজকেও সেই ঘটনার জন্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে সমব্যাথী খুঁজে পান।

ইতিহাসের চাকা পিছন দিকে ঘুরিয়ে আগে যাওয়া যায় না
এই পরিস্থিতিতে মমতা যেটা করা উচিত ছিল, তার ধারকাছ মাড়ালেন না। বামেদের পরে তিনি সিঙ্গুরকে টাটাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার করলেন -- কর্পোরেটের বিরুদ্ধে গরিবদের হয়ে লড়াই করেন, সিপিএমকে উৎখাত করার পথে এমনই একটি বাম-ঘেঁষা ভাবমূর্তি তৈরী করলেন নিজের। এমনকি, ইতিহাসের চাকা পিছন দিকে তিনিই প্রথম চালাচ্ছেন এমন দাবি করে সিঙ্গুরের শিল্পের কাজে ব্যবহৃত জমিও ফেরানোর উদ্যোগ নিলেন। চাষের অযোগ্য জমিতে বীজ ছুড়ে প্রতীকী পদক্ষেপে গর্বের সঙ্গে বললেন এই মডেল ভবিষ্যতে বাকি পৃথিবী বরণ করে নেবে।

দু'টাকার চাল আর সমবেদনা, ও দিয়ে অর্থনীতি চলে না
কিন্তু এখন তিনি হয়তো বুঝছেন (আশাকরি) যে তাঁর পিছনে হাঁটার মডেলে লাভ আখেরে কিছুই হয়নি। পশ্চিমবঙ্গই বোধহয় ভারতের একমাত্র রাজ্য যেখানে সার্বিক উপকারের থেকে বেশি গুরত্ব পায় দলের বা ব্যক্তির রাজনৈতিক জয়। সিঙ্গুর আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন রাজ্যের তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীও হাজার চেষ্টা করে শাসক ও বিরোধীদের একসঙ্গে বসাতে পারেননি; রাজ্যের স্বার্থ পড়ে থেকেছে তিমিরেই। আর সিঙ্গুরে রাজনৈতিক জয় পেয়েও মমতা কোনও বিকল্প অর্থনৈতিক উন্নতির বন্দোবস্ত করতে পারেননি। সেই পুরোনো ভঙ্গুর কমিউনিস্ট ধাঁচের মতো সরকারি মদতে সিঙ্গুরের মানুষকে ধুঁকতে ধুঁকতে সাহায্য করার পথ নেন যা একসময়ে বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতোই। দু'টাকার চাল আর সমবেদনা দিয়ে মানুষের পেট চিরকাল চলে না; সেই মানুষ গর্জে একদিন উঠবেই। আর এবারে যা হওয়ার তাই হয়েছে। তৃণমূল নেত্রী ভাবছেন দলের মধ্যে খেয়োখেয়িই আসল কারণ, কিন্তু সমস্যা আরও গভীরে।

সিঙ্গুর শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনীতিও বটে
সিঙ্গুরের তাৎপর্য শুধু রাজনৈতিক ছিল না; তার মধ্যে এক বড় অর্থনৈতিক গুরুত্বও ছিল। শুধু ডিনামাইট দিয়ে কারখানার শেড উড়িয়ে দিলেই সিঙ্গুরের ন্যানো বৃত্তান্ত শেষ হয় না। কিন্তু মমতা ব্যস্ত থেকেছেন রাজনীতির দিকটি নিয়ে ভাবতেই। ২০১১-র পড়ে তাঁরই দায়িত্ব ছিল সিঙ্গুরে নতুন করে অর্থনৈতিক উদ্যম আনার। কিন্তু পূর্বসূরিদের জমিকাণ্ডের পরে তিনি আর জমিতে হাতই দেননি; ল্যান্ডব্যাঙ্ক ইত্যাদির অছিলায় আসল বিষয়কে এড়িয়ে গিয়েছেন। সিঙ্গুরের যে মানুষ কাজ পায়নি, জমিও হারিয়েছে, তাঁকে ভুলিয়ে রাখা বেশিদিন সম্ভব ছিল না। মমতাও পারেননি। তিনি যেই মডেল-এর খ্যাতির কথা বলছিলেন, আসলে তা এক রাজনৈতিক জয়ের উল্লাসমাত্র। তার 'এক্সপায়ারি ডেট' ছিল এবং বিজেপির জয়ের পরে তা যেন আরও এগিয়ে এসেছে।

আজ কোথায় সেই সিঙ্গুর-প্রেমী সুশীল সমাজ?
সবচেয়ে মজার কথা হল যেই সুশীল সমাজ এক দশক আগে মমতার পাশে দাঁড়িয়ে বামেদের নিশানা করেছিলেন, তাঁদের আজ ধারেকাছেও দেখা যাচ্ছে না। বুঝি বা তাঁরাও তলিয়ে দেখছেন, হাওয়া কোনদিকে শেষমেশ ঘোরে। ক্ষমতাবানের পূজারী হওয়া যে অনেক সহজ কাজ। বহু যুদ্ধের সেনানী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি অর্থনৈতিক মডেল তৈরী করে সিঙ্গুরের অসমাপ্ত কাজ শেষ কেন করলেন না, তা উনিই জানেন। স্তাবকদের চিল চিৎকারে দিগ্ভ্রষ্ট হলেন না কি আসল রোগটাকে ধরতেই পারলেন না?
সময়ই দেবে এর উত্তর।












Click it and Unblock the Notifications