নীল সাদার শহরে লাল যেন আজ অপ্রাসঙ্গিক!
এককালে কলকাতার অলিগলিতে বাড়ির দেওয়ালগুলিতে উজ্জ্বল লাল রঙে আঁকা থাকত কাস্তে-হাতুড়ি। এক দশক আগেও এই দৃশ্য কলকাতার অন্যতম পরিচিত রূপ হলেও আজ তা ম্লান। ২০০৮ সালে শুরু হয় সিঙ্গুর আন্দোলন।
এককালে কলকাতার অলিগলিতে বাড়ির দেওয়ালগুলিতে উজ্জ্বল লাল রঙে আঁকা থাকত কাস্তে-হাতুড়ি। এক দশক আগেও এই দৃশ্য কলকাতার অন্যতম পরিচিত রূপ হলেও আজ তা ম্লান। ২০০৮ সালে শুরু হয় সিঙ্গুর আন্দোলন। আর এরপর ক্রমে কলকাতার দেওয়াল লিখনে কাস্তে হাতুড়ির স্থান হাতিয়ে নেয় টাটা ন্যানো ও জোড়া ফুল। সেই স্থান দখল দেখা যায় ইভিএম-এর ভোটে। এরপরও যেই দেওয়ালগুলিতে কাস্তে-হাতুড়ি ছিল তাও মুছে যাচ্ছে গেরুয়া রঙে।

লালের বদলে আজ অন্য রঙে ছেয়েছে দেওয়াল
যেই কলকাতায় এক সময় দেওয়ালে দেওয়ালে লালের চিহ্ণ থাকত, সেই কলকাতা এখন নীল সাদার শহর। ১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত একটানা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকা বামদলগুলি আজ এই রাজ্যেই রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতার সন্ধানে। সদ্য শেষ হওয়া বিধানসভা উপনির্বাচনে তিনটির মধ্যে একটিতেই লড়ে সিপিআই(এম)। তবে করিমপুরেও তৃণমূল, বিজেপির নিচে শাষ করে তারা। চলতি বছরের লোকসভা নির্বাচনে তাদের অবস্থা আরও শোচনীয় ছিল। ৪২টি লোকসভা আসনের কোনওটিতে জেতা তো দূরের কথা দ্বিতীয় স্থানেও থাকতে পারেনি বামেরা। এমনকী যাদবপুরের বাম প্রার্থী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য ছাড়া কোনও বাম প্রার্থীই তাঁদের জামানত বাঁচাতে পারেননি।

চিরশত্রু কংগ্রেসের সঙ্গে মেলাতে হয়েছে হাত
আজকের এই জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকার দলটিতে এককালে জ্যোতি বসু, অনিল বিশ্বাস, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতো নেতারা ছিলেন। তবে সেই দলেরই মহম্মদ সেলিম, সুজন চক্রবর্তীরা আজ রাজনৈতিক ময়দানে সেই প্রতাপ দেখাতে ব্যর্থ। দলের রাজনৈতিক মতাদর্শ লোকার কাছে যেন আর পৌঁছে দিতে পারছেন না তাঁরা। অবস্থা এতটাই খারাপ যে ১৯৭৭ সালে যেই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়ে ক্ষমতায় আসা, যেই কংগ্রেস ছিল তাঁদের চিরশত্রু, সেই হাত শিবিরের সঙ্গেই হাত মেলাতে হয়েছে সূর্যকান্ত মিশ্রদের। এমন কী আলিমুদ্দিন ছেড়ে বাম নেতাদের দেখা যায় বিধানভবনে।

আজ আর সুরেশ কুটিরের মতো কমিউনগুলি কেউ চেনে না
১৯৬০-এর দশকে বামদলগুলি ক্যালকাটা কমিউন নামে ঘর ভাড়া নিত কর্মীদের কর্মসূচি স্থির করার জন্য। পরে দল ক্ষমতা আসার পর পাড়ায় পাড়ায় দল নিজেদের পার্টি অফিস গড়ে তোলে। কিন্তু বেশ কিছু কমিউন থেকে যায়। সেরকমই একটি কমিউন, সুরেশ কুটির। কংগ্রেসের রাজ্য সদর দফতরের অদূরেই অবস্থিত এই সুরেশ কুটির। ১৪০০ স্কয়্যার ফিটের এই বাড়িটিতে আজ বেশি হুলুস্থুলু নেই। বাম জামানার বেশির ভাগ মানুষ যারা এখানে থাকতেন তাঁদের অনেকেই আর বেঁচে নেই।

তবে এরকম কমিউনেই জন্ম নিতেন বাম নেতারা
বাড়িটি আজ আর তেমন ভাবে কেউ চেনে না। সামনে দিয়ে গেলেও আজ সুরেশ কুটিরের দিকে ফিরে তাঁকায় না কেউ। তবে এই বাড়িতেই ১৯৬৭ সাল থেকে আসতেন মুজফ্ফর আহমেদ, হাসি দত্ত, কমল সরকার, সমর মুখোপাধ্যায়, আবদুল্লা রাসুল, নিরোদ চক্রবর্তী, মহাদেব সাহাদের মতো কমিউনিস্টদের আনাগোনা ছিল এই বাড়িতে। এমন কী এই বাড়িরই একটি ঘরে ২০১৩ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত থাকতেন সমর মুখোপাধ্যায়। তৃণমূল ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত বাম রাজীতির খবর পেতে আলিমুদ্দিনের পাশাপাশি এই সুরেশ কুঠিরেও নিয়মিত ভাবে আসতেন তাবর সাংবাদিকরা।

সুরেশ কুটিরে থেকেছেন বিমান বসুও
১৭১/২বি, এজেসি বোস রোডের এই বাড়িতেই এককালে থেকেছেন বর্তমানের পশ্চিমবঙ্গ বাম ফ্রন্টের চেয়ারম্যান। তখন তাঁর বয়স ১৮ বছর। তিনি তখন সাধারণ কমরেড। এখন তিনি দলের পলিটব্যুরো সদস্য। ঠিকানাও বদলেছে। এখন তিনি আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের একটি ঘরে থাকেন। এর থেকেই সেই সময়কার কমিউনিস্ট নেতাদের দলের প্রতি একনিষ্ঠতা প্রকাশ পেত। একই রকম একনিষ্ঠতা দেখাতেন দলের সমর্থকরাও।

রাজ্যে ধিক ধিক করে জ্বলছে কমিউন কালচার
আজ কলকাতার সুরেশ কুটির ফাঁকা থাকলেও রাজ্যের অন্য জায়গাগুলিতে আজও কমিউনগুলিতে থাকেন দলের বিভিন্ন শাখার বেশ কয়েকজন নেতারা। পশ্চিম মেদীনিপুরের রবিন্দ্রনগরে রয়েছে সেরকমই একটি কমিউন। সিপিআই-এর জেলা কমিটির সদস্য সন্তোষ রানা আজ সেখানে থাকেন। প্রতিটি মুহূর্ত দলের হয়ে কাজ করার তাগিদ থেকেই এই কমিউনে থাকা। তবে শুধু সন্তোষ রানা না, এখানে থাকেন সিপিআই জেলা সচিব অশোক সেন, জেলার সহকারী সচিব বিপ্লব ভাট্টা। ভাট্টা এই রবিন্দ্রনগরের কমিউনে বিগত ২০ বছর ধরে থাকছেন। তবে এই কমিউনগুলিতে আজও যাঁরা থাকেন তাঁরা তাঁদের রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন ১৯৭০-৮০-র সময়কালে।
দলে এই হারিয়ে যেতে বসা কমিউন কালচারের মতো কী তবে লাল ও আজ হারিয়ে যাচ্ছে নীল-সাদা বনাম গেরুয়ার লড়াইয়ে?












Click it and Unblock the Notifications